Sunday, June 20, 2021
Home সাময়িক প্রসঙ্গে দামি সিগারেটের বিশেষ গল্প

দামি সিগারেটের বিশেষ গল্প

শিখো বাংলায়.কম: পড়ন্ত বিকেল। দূর থেকে চিৎকারটা বেশ জোরেই শোনা গেল। কিন্তু বুঝতে পারলাম না কীসের চিৎকার। চারপাশে তাকিয়ে দেখি সব কিছু শান্ত, স্বাভাবিক।

যাক, চিৎকারটা কেউ দুষ্টমি করে দিয়েছে, কোনো অঘটন ঘটে নি।
নিশ্চিন্ত মনে এগিয়ে যেতে লাগলাম। কিছুদূর এগিয়ে যেতেই হঠাৎ আরেকটা চিৎকার। সামনের দিক থেকে এসেছে চিৎকারটা। সেদিকে তাকালাম। দূরে একটা গাড়ি থেমে আছে। তার চারপাশে অনেকগুলো মানুষ, দাঁড়িয়ে আছেন তারা গোল হয়ে।
কোন অ্যাক্সিডেন্ট! বুকের ভেতরটা কেঁপে উঠল। দ্রুত এগিয়ে যেতে লাগলাম সামনের দিকে। গাড়ির পাশে মানুষজন ক্রমান্বয়ে বাড়ছে।

আবার চিৎকার ভেসে এলো। বুকের ভেতরটাও কেঁপে উঠল আরো একবার। পা দু’টো আরো দ্রুত চালিয়ে এগুতে লাগলাম।
গাড়ির সামনে এসে বুঝতে পারলাম, কোন চোরটোর ধরা পড়েছে। তবে চোর বলে কাউকে সন্দেহ হচ্ছে না। গাড়ির পেছনে এসে নির্বাক হয়ে গেলাম।

আট-নয় বছরের এক কিশোরকে মধ্যযুগীয় কায়দায় বেঁধে রাখা হয়েছে। তাহলে জনসমাবেশ এই বাচ্চাটিকে কেন্দ্র করে। আর চিৎকারের উৎসও এই বাচ্চাটি।

লোকের ভিড় ঠেলে এক ব্যক্তি প্রবেশ করলো। বাচ্চাটিকে দেখেই চিৎকার দিয়ে উঠলো- হালার পুতেরে এইহানে গাইড়া হালা।
আরো কত কি বলল, এর কোনো ইয়াত্তা নেই। মানুষজনের কোনো ভাবান্তর নেই। সবাই দর্শকের গ্যালারিতে বসে যেন সার্কাস খেলা উপভোগ করছে।

বিজ্ঞাপনImage is not loaded

অতঃপর লোকটি যখন বাচ্চাটিকে নির্যাতন করার জন্য উদ্ধত হলেন, তখন আমার ধৈর্যের বাঁধ ভেঙ্গে গেল। আমি আর চুপ থাকতে পারলাম না। এই যে ভাইজান, বাচ্চাটির অপরাধ কি? এভাবে প্রহার করছেন কেন?

লোকটি রাগান্বিত স্বরে বলল, একটু শিক্ষা দিচ্ছি দেখেন না।

শ্লেষ মাখা কন্ঠে বললাম, আপনাকেও শিক্ষা দেওয়া উচিত!

এবার লোকটি আরো উত্তেজিত কন্ঠে বলল, মহল্লায় নতুন আইছেন বুঝি?

আমি প্রত্যুত্তর দেওয়ার আগেই মহল্লার মাতবর সাহেব ভীর ঠেলে প্রবেশ করেই বলল, আরে সাংবাদিক সাহেব, কিছু মনে কইরেন না, এরা আপনাকে হয়তো চিনতে পারে নাই, তয় কখন আইলেন মহল্লায়।

মাতবর সাহেবের প্রত্যুত্তর না করেই বললাম, এই বাচ্চার অপরাধ কী আর কেনই বা এই সভ্য সমাজে নির্মমভাবে পিটানো হচ্ছে?
পূর্বের লোকটাই বলল, যাকে বেঁধে রাখা হয়েছে সেই ছেলেটির নাম কাওছার। কাওছার মহল্লায় কোন বেকারীর গাড়ি আসলেই খাবারের জিনিস চুরি করে, যখন বেকারীর লোক দোকানে মাল দিতে যায়।

অনেকবার নিষেধ করেছি পোলাডারে কিন্তু পূর্বের বদ-অভ্যাস এখনও ত্যাগ করে নি। তাই ওরে একটু শিক্ষা দেওয়ার জন্য এই এন্তেজাম, যাতে করে কখনো এমন আর না করে।

লোকটি এবার বিজয়ীর ভঙ্গীতে আমার দিকে তাকিয়ে শয়তানী হাসি হাসতেছে। আমি এবার একটু ভালো করে তার দিকে তাকালাম। খুব পাতলা একটা শার্ট পরেছেন তিনি, সাদা ধরনের শার্ট। শার্টের নিচে পরা গেঞ্জিটা দেখা যাচ্ছে। বুকের কাছে দু’টো বোতাম খোলা, ভারী একটা সোনার চেইন দেখা যাচ্ছে সেখান দিয়ে। চেইনের নিচে গোল করে আরবী হরফে ‘আল্লাহ’ লেখা। খেদমতে খলক ফাউন্ডেশনের আরবী শিক্ষা কোর্স করে এখন আরবী ভালোই পড়তে পারি।

শার্টের পকেটের ফাঁক দিয়ে দামি সিগারেটের একটা প্যাকেট বের হয়ে আছে। আমি খুব বিনয়ী গলায বললাম, মফস্বলের এটা ——-।

কথাটা শেষ করতে হলো না। তার আগেই পকেট থেকে একটা সিগারেট বের করে এগিয়ে দিলেন তিনি।

একটা জিনিস আমি অনেকদিন ধরে খেয়াল করেছি- কারো কাছে যদি দু’টো টাকা চাওয়া হয়, তাহলে সাধারণত দিতে চায় না সে। পথে-ঘাটে অনেক অসহায় ফকিরকে দেখতে পাওয়া যায় দু’টাকার জন্য আধা ঘন্টা ধরে ফিরিস্তি দিতে হয়।

কিন্তু সে যদি সিগারেটখোর হয় এবং কার কাছে যদি সিগারেট চাওয়া হয়, তাহলে সিগারেটটা দিয়ে দেয় নির্বিঘ্নে। এটা কি একজন নেশাখোরের প্রতি আরেকজন নেশাখোরের সহমর্মিতা!

অনেকদিন ব্যাপারটা নিয়ে ভেবেছি, কিন্তু কিছুই বুঝতে পারি নি। সিগারেটটা হাতে নিয়ে আগের চেয়েও বিনয়ী গলায় বললাম,

একটা কথা জিজ্ঞেস করি ভাইজান- দিনে আপনি কত প্যাকেট সিগারেট খান?

কিছুটা কর্কশ গলায় লোকটা প্রত্যুত্তর করলেন, তা দিয়ে আপনার দরকার কী?

না, দরকার তেমন নাই।

তাহলে?

না, একটু জানতে ইচ্ছে করছে আর কী?
আড়াই থেকে তিন প্যাকেট।
এক প্যাকেট সিগারেটের দাম কত?
দুইশত টাকা।

এক প্যাকেট সিগারেটের দাম দুইশত টাকা হলে তিন প্যাকেট সিগারেটের দাম হয় ছয়শত টাকা। সর্বনাশ!
সর্বনাশের কী হলো?

এত বড় এক দোকানের মালিক হয়ে ——–। কথাটা শেষ করার আগেই লোকটা বললেন, না, আমি মালিক না, আমি এই দোকানের ম্যানেজার।

একজন সামান্য ম্যানেজার হয়ে আপনি ছয়শত টাকা কেবল সিগারেটের পিছনে খরচ করেন! একদিনে ছয়শত টাকা মানে মাসে আঠারো হাজার টাকা। অন্য খরচ বাদই দিলাম। আপনি জানেন, এই টাকা দিয়ে মধ্যবিত্ত পরিবারের সাত-আটজন মানুষ পুরো মাস খেতে পারবে।

আর এই কাওসারের মতো বাচ্চা পেটের ক্ষুধার জ্বালায় চুরি করতে হবে না। মাত্র দশ টাকার জন্য এভাবে নির্যাতিত হতে হবে না। আপনি তাকে শাস্তি দিয়ে শিক্ষা দিচ্ছেন, কিন্তু আপনি নিজে এখনও অশিক্ষিতই আছেন।

কথাটা বলেই তার দিকে সিগারেটটা এগিয়ে দিলাম আমি। কিছুটা অপ্রস্তুত হয়ে গেলেন তিনি। তাকে আরো অপ্রস্তুত করার জন্য আমি বললাম, যারা প্রতিাদিন এতগুলো টাকা টাকা অপব্যয় করে, স্রেফ আগুন দিয়ে সিগারেট পুড়িয়ে ফেলে, তাদেরকে আমার মানুষ মনে হয় না। প্রতিদিন এদেশে অনেক মানুষ না খেয়ে থাকে, স্রেফ পানি খেয়ে থাকে।

এবার জনাকয়েক ব্যক্তি প্রতিবাদ করলো, কাওসারকে কাজ দিলে তো সে এভাবে অন্যায় করে বেড়াতো না। লোকটি কাওসারের বাঁধন আগেই খুলে দিয়েছিল। এখন কাওসারকে কাছে টেনে নিয়ে বললো, ও আজ থেকে আপনাদের খেদমতে খলক ফাউন্ডেশনের নৈশ মাদরাসা ‘দারুল উলুম’-এ রাতে পড়বে। আর দিনে আমার ফুটফরমাইশ শুনবে।

মনের অজান্তেই চোখের কোন ভিজে ওঠে লোকটির মহানুভবতা দেখে। সত্যি আজ আমাদের মাঝে ‘আলোকিত মানুষ’ অনুপস্থিত। সবাই স্বার্থ অন্বেষী। কিন্তু এর মাঝেও কিছু মানুষের দেখা মেলে যারা আলোর অভাবে দিকভ্রান্ত হচ্ছে। কিন্তু একটু আলো জ্বেলে দিলেই তাদের মনুষত্ব জেগে ওঠে।

লেখক সাংবাদিক, মানবাধিকার কর্মী।

জনপ্রিয় খবর