Thursday, February 25, 2021
Home বাংলাদশে সংবাদ মুখে মদীনা রাষ্ট্র, বাস্তবে কী হচ্ছে!

মুখে মদীনা রাষ্ট্র, বাস্তবে কী হচ্ছে!

হামিদ মীর ।।

আব্বাসি খলিফা আবু জাফর মানসুর তার শাসনামলে সে যুগের প্রসিদ্ধ মুহাদ্দিস শারিক ইবনে আবদুল্লাহ রহ.কে কুফার বিচারকের দায়িত্ব নিতে বললেন। কিন্তু ইমাম আবু হানিফা রহ.-এর মতো শারিক ইবনে আবদুল্লাহ রহ.ও বিচারকের দায়িত্ব গ্রহণ করতে অপরাগতা প্রকাশ করেছিলেন।

খলিফা মানসুর ইমাম আবু হানিফা রহ.-এর অপারগতাকে মেনে নেননি; তবে তিনি শারিক ইবনে আব্দুল্লাহ রহ.কে দায়িত্ব গ্রহণে জোর জবরদস্তি না করে বারবার তাকে অনুরোধ করতে লাগলেন একথা বলে যে,  শরিয়ত অনুযায়ী জনগণের ন্যায়বিচার নিশ্চিতে আপনাদের মতো বিজ্ঞজনদের বিচারক হওয়া রাষ্ট্রের জন্য খুবই জরুরি।

খলিফা মানসুর বারবার অনুরোধ করায় শারিক ইবনে আবদুল্লাহ রহ. বিচারকের দায়িত্ব গ্রহণ করেন।

খলিফা মানসুরের ইন্তেকালের পর তার ছেলে মুহাম্মদ মাহদী রাষ্ট্রের দায়িত্ব পেলেন। মাহদী দায়িত্ব পেয়ে কুফার বিচারক পদে বাবার মনোনিত শারিক ইবনে আবদুল্লাহ রহ. কেই বহাল রাখলেন।

বিজ্ঞাপনImage is not loaded

শারিক ইবনে আবদুল্লাহ রহ. বিচারকের দায়িত্ব পালন করার সময়ে তার আদালতে কুফার গভর্নর মুসা ইবনে ঈসার বিরুদ্ধে অভিযোগ নিয়ে একজন মহিলা উপস্থিত হলেন।

মহিলাটি অভিযোগ করলেন, গভর্নর জোর পূবর্ক আমার খেজুরের বাগান কিনতে চেয়েছেন; কিন্তু আমি রাজি না হওয়ায় তিনি আমার বাগানের দেয়াল ভেঙে দিয়েছেন, যেন আমি অপারগ হয়ে তার কাছে বাগান বিক্রি করি।

ঘটনা ছিল মূলত এরকম- ফুরাত নদীর তীরে অভিযোগকারী মহিলার বাবার একটি খেজুরের বাগান ছিল। মহিলার বাবার ইন্তেকালের পর ভাইবোনদের মাঝে বাগানটির ভাগ-বাটোয়ারা হয়ে গেল। নিজের বাগানের সুরক্ষায় মহিলা তার অংশের আশপাশে দেয়াল উঠিয়েছিলেন।

কুফার গভর্নর মহিলার ভাইবোনের কাছ থেকে তাদের অংশের বাগান কিনে নিয়েছিলেন; কিন্তু অভিযোগকারী মহিলা তার অংশের বাগান গভর্নরের কাছে বিক্রি করতে রাজি হননি। তাই তিনি গভর্নরের দখল থেকে বাগান রক্ষা করতে বিচারক শারিক ইবনে আবদুল্লাহ রহ.-এর আদালতে মামলা দায়ের করেন।

মহিলার অভিযোগের ভিত্তিতে বিচারক শারিক ইবনে আবদুল্লাহ রহ. গভর্নর মুসাকে তার আদালতে তলব করেন।

বিচারকের তলবনামা গভর্নরের কাছে পৌঁছলে তিনি রেগে অগ্নিশর্মা হয়ে যান। নিজের এক রক্ষীকে এই বার্তা দিয়ে তিনি বিচারকের কাছে পাঠালেন- বিচারককে বলবে, তিনি যেন আমার পদমর্যাদার প্রতি সম্মান প্রদর্শন করেন এবং আমাকে এক মিথ্যাবাদী মহিলার সাথে কাঠগড়ায় দাঁড় না করান।

গভর্নরের বার্তাবাহক বিচারক শারিক ইবনে আবদুল্লাহ রহ.-এর দরবারে পৌঁছলে তিনি তাকে গ্রেফতার করে জেলে বন্দী করেন। গভর্নরের কাছে এ খবর পৌঁছলে তিনি আগের থেকেও বেশি রেগে যান এবং নিজের বার্তাসহ একজন বড় অফিসারকে বিচারকের কাছে পাঠান।

সেই অফিসার বিচারককে বললেন, বার্তাবহক তো শুধু গভর্নরের বার্তা নিয়ে এসেছিল আপনি তাকে গ্রেফতার করলেন কেন?

বিচারক শারিক ইবনে আবদুল্লাহ রহ. বললেন, তুমি একটি নাজায়েজ ও শরীয়ত পরিপন্থী কাজের পক্ষপাতিত্ব করতে এসেছো। তিনি সেই অফিসারকেও গ্রেফতার করলেন। গভর্নরের দ্বিতীয় বার্তাবাহককেও বিচারক গ্রেফতার করেছেন এই খবর শুনে গভর্নর আহত সাপের মতো ফুঁসে উঠলেন।

তিনি কুফার কিছু গণ্যমান্য লোকদের ডেকে বললেন, আপনারা কাজী সাহেবের কাছে যান এবং বলেন তিনি আমার পদমর্যাদার প্রতি কোন সম্মান দেখাননি বরং আমাকে অপমান করেছেন।  আমি কোন সাধারণ নাগরিক নই যে আদালত গিয়ে হাজিরা দিবো।

গভর্নরের কথা মতো শহরের গণ্যমান্য ব্যক্তিরা তার বার্তা নিয়ে বিচারকের দরবারে উপস্থিত হলেন। বিচারক শারিক ইবনে আবদুল্লাহ রহ. তাদের বললেন, আপনারা শরীয়তের বিধান ও ন্যায় বিচারের মাঝে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করতে এসেছেন।

বিচারক শহরের এই গণ্যমান্য লোকদেরও গ্রেফতার করলেন। গণ্যমান্য লোকদের গ্রেফতারের খবরে গভর্নর নিজের হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে ফেললেন।

ক্ষমতার নেশায় মত্ত কুফার এ গভর্নর তৎকালীন খলিফা মাহদীর চাচা ছিলেন। তিনি নিজের ঘোড়সওয়ারকে সাথে নিয়ে জেলে পৌঁছলেন এবং বিচারক যাদের বন্দী করেছিলেন তাদের সবাইকে নিজের ক্ষমতা বলে বের করে আনলেন।

পরের দিন কারারক্ষী বিচারককে জানালেন, গতকাল রাতে গভর্নর জেলে বন্দী থাকা তার সব বার্তাবাহককে জেল থেকে বের করে নিয়ে গেছেন। একথা শুনে শারিক ইবনে আবদুল্লাহ রহ. বিচরকের দায়িত্ব থেকে ইস্তিফা নিলেন এবং বললেন, আমি আমিরুল মুমিনীনের কাছে এটা প্রত্যাশা করিনি। তিনি আমাকে এই শর্তে বিচারকের দায়িত্ব দিয়েছিলেন যে, তিনি ও তার পরিবারের কেউ আদালতের কাজে হস্তক্ষেপ করবে না।

বিচারকের দায়িত্ব ছাড়ার পর খলিফাকে কারন জানাতে শারিক ইবনে আবদুল্লাহ রহ. বাগদাদের উদ্দেশ্যে রওয়ানা হলেন। গভর্নর মুসার কাছে বিচারক শারিক ইবনে আবদুল্লাহ রহ.-এর ইস্তিফা দেওয়ার খবর পৌঁছলে তার হুঁশ ফিরলো।

তিনি সাথে সাথে বিচারকের সাথে দেখা করে ক্ষমা চাইলেন। বিচারক তাকে বললেন, আপনি যেই লোকদের জেল থেকে বের করেছিলেন তাদের আবার বন্দী করুন। গভর্নর বিচারকের কথা মতো সব বন্দীদের জেলে বন্দী করলেন এবং আদালতে হাজির হলেন। গভর্নরকে তখন সেই অভিযোগকারী মহিলার সামনে কাঠগড়ায় দাঁড় করানো হল।

গভর্নর কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে স্বীকার করলেন মহিলার অভিযোগ সত্য। বিচারক সেই মহিলার দেয়াল পুনরায় ঠিক করে দেওয়ার নির্দেশ দিলেন। গভর্নর বিচারকের আদেশ অনুযায়ী মহিলার দেয়াল ঠিক করে দিলেন।

বিচারক শারিক ইবনে আবদুল্লাহ রহ.-এর এই ঘটনা ইসলামের ইতিহাসে ন্যায়-পরায়ণতা ও ইনসাফের উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হিসাবে স্বীকৃতি পেয়েছে।

বিচারক শারিক ইবনে আবদুল্লাহ রহ. ন্যায় বিচার প্রতিষ্ঠায় ক্ষমতাসীনদের সামনে এ কারনে দৃঢ় প্রতিজ্ঞ ছিলেন যে, আল্লাহ তায়ালার হাবিব নবীজী হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মদীনায় যে রাষ্ট্র ব্যবস্থা চালু করেছিলেন তা এই ন্যায় ও ইনসাফের ওপরই প্রতিষ্ঠিত ছিল।

একবার কুরাইশের এক মহিলা চুরি করেছিলেন। কুরাইশ সম্প্রদায়ের সম্মান রক্ষার্থে কেউ কেউ ওই মহিলার ক্ষমার জন্য হযরত উসামা বিন যায়েদ রা.-এর মাধ্যমে হুজুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে সুপারিশ করালেন।

হুজুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, গরিবের ওপর আইন প্রয়োগ এবং ধনীদের ক্ষেত্রে অন্যায় খাতিরদারির কারণেই বনী ইসরাইল ধ্বংস হয়েছিল।

হুজুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছিলেন, যদি ফাতেমা বিনতে মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামও চুরি করতো আমি তার ওপরও আইন প্রয়োগ করতাম। হুজুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সেই মহিলার হাত কাটার নির্দেশ দিলেন।

ইনসাফ কায়েমের ক্ষেত্রে ইসলাম বংশ মর্যাদা, পদ, ধর্ম ও বর্ণের খাতির করে না।

কাইয়ুম নিজামী তাঁর মুয়ামালাতে রাসূল গ্রন্থে আবু বকর হিসাসের রেফারেন্সে বর্ণনা করেছেন যে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের যুগে এক মুসলমান কারো শস্য চুরি করেছিলেন। যখন তিনি বুঝতে পারলেন তার চুরির কথা সবাই জেনে যাবে তখন তিনি চুরির মালগুলো এক ইহুদির ঘরে রেখে আসলেন। ইহুদির বাসা থেকে চুরির সেই মাল পাওয়া গেলে ইহুদি চুরির কথা অস্বীকার করলো।

আসল চোর ইহুদিকে ফাঁসাতে অনেক মুসলমানকে নিজের দলে ভিড়ালো। তখন আল্লাহ তায়ালা ওহী নাজিল করে সেই ইহুদিকে নিরাপরাধ ঘোষণা করলেন।

কুরআন শরীফে জায়গায় জায়গায় ইনসাফ কায়েমের কথা বলা হয়েছে। আর ইসলামের ইনসাফের এই বাণীই মদীনায় মুসলমান ও অমুসলমানদের অধিকার নিশ্চিত করেছিল।

ইসলামে ইনসাফের এই নির্দেশনাই শারিক ইবনে আবদুল্লাহসহ ইতিহাসে ন্যায় বিচারের ক্ষেত্রে সাক্ষর রাখা বিচারকগণ তাদের বিচারের ভিত্তি হিসেবে গ্রহণ করেছিলেন।

ভেবে দেখার বিষয় হলো বর্তমানে যারা মদীনার বিচার ব্যবস্থা অনুযায়ী রাষ্ট্র পরিচালনার বুলি আওড়ান তাদের কথা ও কাজে শারিক ইবনে আবদুল্লাহ রহ.-এর ছায়া দেখা যায় নাকি কুফার গভর্নর মুসা ইবনে ঈসার কার্যকালাপের ছায়া দেখা যায়?

নিজের আশপাশে নজর বুলিয়ে দেখুন। নিম্ন আদালত থেকে উচ্চ আদালত- কোথাও কি বিচারকদের থেকে ন্যায় বিচার পাচ্ছেন নির্যাতিত ও নিপীড়িত জনগণ? বর্তমানে আইনজীবীদের পেছনে টাকা না ঢাললে বিচার পাওয়ার কোন আশা করা যায় কি?

ন্যাব (NAB- National Accountability Bureau) থেকে শুরু করে পাকিস্তানের নির্বাচন কমিশন- কোথাও সাথে সাথে ন্যায় বিচার মেলে না। ন্যাব (জাতীয় জবাবদিহি ব্যুরো) কে তো শুরু থেকেই রাজনৈতিক বিরোধীদের শায়েস্তা করতে ব্যবহার করা হচ্ছে। সুপ্রিম কোর্টের বিচারকরাও এর সাক্ষ্য দিয়েছেন।

২০১৪ সাল থেকে তাহরিকে ইনসাফের বিরুদ্ধে বিদেশী তহবিলের মামলা বিচারাধীন আছে নির্বাচন কমিশনের অধীনে।

মদীনার বিচার ব্যবস্থা অনুযায়ী রাষ্ট্র চালানোর দাবিদার তাহরিকে ইনসাফের উচিত ছিল বিচারাধীন মামলাকে স্থগিত না করে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব মামলার ব্যাপারে ফয়সালা করতে নির্বাচন কমিশনকে অনুরোধ করা; কিন্তু এই মামলাকে ৬ বছর ধরে স্থগিত রেখে নির্বাচন কমিশন নিজের সাথে সাথে পাকিস্তানকে মদীনার রাষ্ট্র ব্যবস্থা অনুযায়ী চালানোর দাবিদারদেরকেও কুফার গভর্নর মুসার সাথে মিলিয়ে ফেললেন।

জিও নিউজ অবলম্বনে  নুরুদ্দীন তাসলিম।

জনপ্রিয় খবর