Sunday, June 20, 2021
Home আজকের ফতোয়া কোন কাজের শুরুতে বিসমিল্লাহ বলা বৈধ এবং অবৈধ এবং বিসমিল্লাহর ফজিলত ও...

কোন কাজের শুরুতে বিসমিল্লাহ বলা বৈধ এবং অবৈধ এবং বিসমিল্লাহর ফজিলত ও উপকারিতা

 

মুফতি মাসউদুর রহমান ওবাইদী

কোন কোন কাজের শুরুতে ‘বিসমিল্লাহ’ বলা বৈধ আর কোন কাজের শুরুতে অবৈধ৷

প্রশ্ন: সকল প্রকার কাজের শুরুতে কি ‘বিসমিল্লাহ’ বলতে হয়? এমনকি হারাম কাজের শুরুতেও কি বিসমিল্লাহ বলা বৈধ?

উত্তর: সকল প্রকার দুনিয়াবী বৈধ কাজের শুরুতে বিসমিল্লাহ বলতে হয়। হারাম বা মাকরূহ কাজের শুরুতে বিসমিল্লাহ বলা হারাম বরং তা আল্লাহর সাথে ধৃষ্টতা প্রদর্শনের শামিল।

বিজ্ঞাপনImage is not loaded

বিসমিল্লাহ বলার অর্থ উক্ত কাজে আল্লাহর সাহায্য ও বরকত কামনা করা। সুতরাং কেউ যদি আল্লাহর নিষিদ্ধ বা ঘৃণিত কাজে তার নিকট সাহায্য চায় বা বরকত কামনা করে তাহলে তা মহামহিম আল্লাহর সাথে বেয়াদবী করা হল না?

যেখানে হারাম কাজ করার আগে আল্লাহ তাআলার কথা স্বরণ করে সেখান থেকে দূরে সরে আসা আবশ্যক সেখানে বিসমিল্লাহ বলে হারাম কাজ করা কোনভাবেই বৈধ হতে পারে না।

*কখন বিসমিল্লাহ্‌ বলা মুস্তাহাব?*

 ১) টয়লেটে প্রবেশের পূর্বে। ((بِسْمِ اللـهِ اللَّهُمَّ إنِّي أَعُوذُ بِكَ مِنَ الـخُبْثِ والـخَبَائِثِ)) তবে বিসমিল্লাহ ছাড়াও দুয়াটি বর্ণিত হয়েছে।

২) ওযুর শুরুতেبِسْمِ اللهِ

 ৩) খাওয়ার সময় بِسْمِ اللهِ

 ৪) প্রাণী যবেহ্‌ করার সময়।  بِسْمِ اللَّـهِ وَاللهُ أكْبرُ অনেকে এ সময় তা ওয়াজিব বলেছেন।

৫) স্ত্রী সহবাসের সময়। ইবনু আব্বাস (রা:) থেকে বর্ণিত হয়েছে। রাসূলুল্লাহ্‌ (ছাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লাম) বলেন:  

لَوْ أَنَّ أَحَدَكُمْ إِذَا أَتَى أَهْلَهُ قَالَ بِاسْمِ اللَّهِ اللَّهُمَّ جَنِّبْنَا الشَّيْطَانَ وَجَنِّبِ الشَّيْطَانَ مَا رَزَقْتَنَا فَقُضِيَ بَيْنَهُمَا وَلَدٌ لَمْ يَضُرُّهُ

“তোমাদের কোন ব্যক্তি যদি স্ত্রী সহবাসের সময় এই দু’আ পাঠ করে: 

(بِسْمِ اللهِ اللهمَّ جَنِّبْناَ الشَّيْطاَنَ وَجَنِّبِ الشَّيْطاَنَ ماَ رَزَقْتَناَ) 

‘শুরু করছি আল্লাহর নামে, হে আল্লাহ্‌! আমাদেরকে শয়তান থেকে দূরে রাখ এবং আমাদেরকে যে সন্তান দান করবে তাকেও শয়তান থেকে দূরে রাখ।’ তবে তাদের জন্য যদি কোন সন্তান নির্ধারিত হয়ে থাকে, তাহলে শয়তান কখনই তার কোন ক্ষতি করতে পারবে না।” (সহীহ বুখারী, অধ্যায়ঃ দু’আ, অনুচ্ছেদঃ স্ত্রী সহবাসের সময় যা বলতে হয়। হা/ ৫৯০৯। মুসলিম অধ্যায়ঃ বিবাহ অনুচ্ছেঃ সহবাসের সময় যা বলা মুস্তাহাব হা/ ২৫৯১)

 ৬) নৌযানে আরহণের সময়  بِسْمِ اللَّهِ مَجْرَاهَا وَمُرْسَاهَا ۚ إِنَّ رَبِّي لَغَفُورٌ رَّحِيمٌ (সূরা হূদ- ৪১)

৭) পত্র লিখার সময় بِسْمِ اللهِ الرَّحْمنِ الرَّحِيمِ (সূরা নমল- ৩০)

৮) রাস্তায় চলতে গিয়ে হঠাৎ পা পিছলে পড়ে গেলে বিসমিল্লাহ। যেমন এ মর্মে হাদীস বর্ণিত হয়েছে-

عَنْ أَبِي الْمَلِيحِ عَنْ رَجُلٍ قَالَ كُنْتُ رَدِيفَ النَّبِيِّ صَلَّى اللَّه عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَعَثَرَتْ دَابَّةٌ فَقُلْتُ تَعِسَ الشَّيْطَانُ فَقَالَ لَا تَقُلْ تَعِسَ الشَّيْطَانُ فَإِنَّكَ إِذَا قُلْتَ ذَلِكَ تَعَاظَمَ حَتَّى يَكُونَ مِثْلَ الْبَيْتِ وَيَقُولُ بِقُوَّتِي وَلَكِنْ قُلْ بِسْمِ اللَّهِ فَإِنَّكَ إِذَا قُلْتَ ذَلِكَ تَصَاغَرَ حَتَّى يَكُونَ مِثْلَ الذُّبَابِ.

আবূ মুলাইহ্‌ থেকে বর্ণিত, তিনি জনৈক ব্যক্তি (ছাহাবী) থেকে বর্ণনা করেন। তিনি বলেন: আমি একদা নবী (ছাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লাম) এর সাথে তাঁর আরোহীর পিছনে বসা ছিলাম। এমন সময় আরোহীটি পা ফসকে পড়ে গেল। তখন আমি বললাম, শয়তান ধ্বংস হোক। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লাম বললেন: “শয়তান ধ্বংস হোক এরূপ বলো না, কেননা এতে সে নিজেকে খুব বড় মনে করে এমনকি ঘরের মত হয়ে যায় এবং বলে আমার নিজ শক্তি দ্বারা একাজ করেছি; বরং এরূপ মূহুর্তে বলবে ‘বিসমিল্লাহ্‌’।  এতে সে অতি ক্ষুদ্র হয়ে যায় এমনকি মাছি সদৃশ্য হয়ে যায়।” [ মুসনাদে আহমাদ হা/ ১৯৭৮২। আবু দাঊদ, অধ্যায়ঃ আদব-শিষ্টচার, অনুচ্ছেদঃ এরকম বলবে না আমার প্রাণ খবিস হয়ে গেছে। হা/ ৪৩৩০। শায়খ আলবানী হাদীসটিকে সহীহ বলেন, সহীহ তারগীব তারহীব হা/ ৩১২৯। সহীহ আবু দাউদ হা/ ৪৯৮২।)

 ৯) যে কোন সুরা পড়ার শুরুতে। بِسْمِ اللهِ الرَّحْمنِ الرَّحِيمِ

১০) মসজিদে প্রবেশের সময় بسم اللهِ، وَالصَّلاةُ وَالسَّلامُ عَلَى رَسُولِ الله ، اللَّهُمَّ افْتَحْ لِي أبْوَابَ رَحْمَتِكَ 

 ১১) মসজিদ থেকে বের হওয়ার সময় بِسْمِ اللَّهِ وَالصَّلاةُ وَالسَّلامُ عَلَى رَسُولِ اللَّهِ، اللَّهُمَّ إنِّي أَسْأَلُكَ مِنْ فَضْلِكَ، اللَّهُمَّ اعْصِمْنِي مِنَ الشَّيْطَانِ الرَّجِيم 

১২) এছাড়াও দুনিয়াবী যে কোন বৈধ কাজের শুরুতে।

 বৈধ কাজে ‘বিসমিল্লাহ’ বলাসবর উপকারিতা

‘বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম’। যার অর্থ হলো- পরম করুণাময় অসীম দয়ালু আল্লাহর নামে। সব বৈধ কাজের শুরুতে ‘বিসমিল্লাহ’ বলার ইসলামের অন্যতম এ রীতি আন্তরিকতার সঙ্গে পালনে রয়েছে অনিবার্য তিনটি সুফল বা উপকারিতা।

যে কোনো বৈধ কাজের শুরুতে বিসমিল্লাহ বলা প্রিয় নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের অন্যতম রীতি ও সুন্নাত। শুধু তা-ই নয়, সব বৈধ কাজের শুরুতে ‘বিসমিল্লাহ’ বলা ইসলামি সভ্যতা ও সংস্কৃতির অন্যতম পরিচায়কও বটে। বিসমিল্লাহ বলার সুফলগুলো হলো-

খারাপ কাজ থেকে মুক্তিকাজের শুরুতে ‘বিসমিল্লাহ’ বলার মাধ্যমে মানুষ অনেক খারাপ কাজ করা থেকে নিষ্কৃতি পাবে। আল্লাহর নামে শুরু করার বিষয়টি মুখে বলার মাধ্যমে মানুষ ভালো কাজের দিকে অভ্যস্ত হয়ে পড়ে। আর মন্দ কাজ থেকে দূরে সরে যায়। ‘বিসমিল্লাহ’ বলার কারণে মানুষের মনে এ চিন্তার উদ্রেক হয়, আমি যে কাজটি করছি এটি ন্যয়সঙ্গত ও সঠিক কিনা?

আর যদি কোনো বিবেকবান ব্যক্তি অন্যায় কাজের শুরুতে এ নাম উচ্চারণ করে তবে মনে এ বিষয়টি বারবার উঁকি দিতে থাকে যে, অন্যায় কাজের শুরুতে এ নাম উচ্চারণের অধিকার তার আদৌ আছে কিনা? বিসমিল্লাহ’ বলার পর এ চিন্তার ফলেই মানুষ অন্যায় ও খারাপ কাজ থেকে ফিরে থাকে। ০ ভালো কাজে মনোযোগী হতে সক্ষমসব বৈধ ও সৎকাজের শুরুতে আল্লাহর নাম নিয়ে আরম্ভ করার কারণে মানুষের মনোভাব এবং মানসিকতাও সঠিক কাজের দিকে মোড় নেয়। ফলে সবসময় সবচেয়ে নির্ভুল পয়েন্ট থেকে মানুষ তার কাজ শুরু করতে সচেষ্ট হয়।

আল্লাহর সাহায্য লাভ’বিসমিল্লাহ’ বলে কাজ শুরু করার সবচেয়ে বড় সুফল হলো- মহান আল্লাহ তাআলার সাহায্য লাভ করা। বান্দার জন্য এর চেয়ে বড় উপকারিতা বা সুফল আর কি হতে পারে? এ কথা চিরন্তন সত্য, যে কাজে মহান আল্লাহর সাহায্য থাকে সে কাজে কোনো প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করার ক্ষমতা জগতের কারও নেই। বিসমল্লিাহ বলে কাজ শুরু করার ফলে মহান আল্লাহ বান্দাকে দুনিয়ার সব অনিষ্টতা থেকে হেফাজত করেন। বিশেষ করে শয়তানের সব অনিষ্টতা, বিপর্যয় ও ধ্বংসকারিতা থেকেও হেফাজত করেন।

মনে রাখতে হবেবান্দা যখন মহান আল্লাহর নামে তার কাজ শুরু করে তখন আল্লাহ তাআলা ওই বান্দার সব কাজের জামিন্দার হয়ে যান। কেননা কুরআনুল কারিমের একাধিক আয়াতে আল্লাহ তাআলা এ কথারই ইঙ্গিত দিয়েছেন। তাহলো-

– فَاذْكُرُونِي أَذْكُرْكُمْ وَاشْكُرُواْ لِي وَلاَ تَكْفُرُونِসুতরাং তোমরা আমাকে স্মরণ কর, আমিও তোমাদের স্মরণ রাখবো এবং আমার কৃতজ্ঞতা প্রকাশ কর; অকৃতজ্ঞ হয়ো না।’ (সুরা বাকারা : আয়াত ১৫২)

– وَقَالَ رَبُّكُمُ ادْعُونِي أَسْتَجِبْ لَكُمْ إِنَّ الَّذِينَ يَسْتَكْبِرُونَ عَنْ عِبَادَتِي سَيَدْخُلُونَ جَهَنَّمَ دَاخِرِينَ‘আর তোমাদের পালনকর্তা বলেন, তোমরা আমাকে ডাক, আমি তোমাদের ডাকে সাড়া দেব। যারা আমার ইবাদতে অহংকার করে সত্বরই তারা লাঞ্ছিত হয়ে জাহান্নামে প্রবেশ করবে।’ (সুরা মুমিন : আয়াত ৬০)

উল্লেখিত আয়াতে কারিমায়ও প্রমাণিত যে, আল্লাহ নামে কাজ শুরু করলে মহান আল্লাহ সে কাজে সাহায্য করবেন। বান্দা যখন মহান আল্লাহ দিকে ফেরে তখন আল্লাহও বান্দার দিকে ফেরেন। আর এটাই মহান আল্লারহ রীতি।

সুতরাং মুমিন মুসলমানের উচিত, সব বৈধ কাজ ‘বিসমিল্লাহ’ বলা তথা মহান আল্লাহর নামে শুরু করা। আর তাতে মিলবে সরাসরি মহান আল্লাহর সাহায্য ও বিজয়।

আল্লাহ তাআলা মুসলিম উম্মাহকে সব বৈধ কাজে ‘বিসমিল্লাহ’ বলার মাধ্যমে উল্লেখিত অনিবার্য তিনটি সুফল বা উপকারিতা লাভের তাওফিক দান করুন। আমিন।

যেকোন  ভালো কাজের শুরুতে ‘বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম’ বলতে ভুলে গেলে এই দোয়াটি পড়তে হয়!

বিসমিল্লাহর গুরুত্ব ও বরকত অপরিসীম। বিসমিল্লাহ না বলার কারণে একটি হালাল খাদ্য আমাদের জন্য হারাম হয়ে যায়, আবার বিসমিল্লাহ না বলার কারণে নেক নিয়ত থাকলেও অনেক কর্মে বরকত না হওয়ায় অসন্মানিত হতে হয়।

আয়েশা (রা:) বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা:) বলেছেন, ‘যখন তোমাদের কোনো ব্যক্তি খাদ্য খাবে সে যেন বিসমিল্লাহ বলে। যদি বিসমিল্লাহ বলতে ভুলে যায় তাহলে সে যেন বলে, বিসমিল্লাহি আওয়ালাহু ওয়া আখিরাহু’ (আবু দাউদ হা-৩৭৬৭, ইবনু মাজাহ হা-৩২৬৪)।

কাজের শুরুতে বিসমিল্লাহ বলা হলে সে কাজে আল্লাহর রহমত ও বরকত অবতারিত হতে থাকে। শয়তান সেখানে অবস্থান নিতে পারে না। আমাদের প্রিয় নবী হজরত মুহাম্মদ সা:-এর কাছে প্রথম ওহি নাজিলের সময়ও এই উত্তম বাক্য পড়ানো হয়েছিল।

জনপ্রিয় খবর