Monday, January 25, 2021
Home মুসলিম বিশ্ব সালতামামি-২০২০: মসজিদ কাঁদে মুসুল্লি শূণ্য

সালতামামি-২০২০: মসজিদ কাঁদে মুসুল্লি শূণ্য

শিখো বাংলায়.কম: দুই হাজার বিশ। করোনার বছর। বছরের শুরুটা ততটা বিষাদ না ছড়ালেও শেষটা সুখের ছিলো না। বলা যায়, অনেকটা বছরের শুরু থেকেই শুরু হয় বিষময় দিন। বিষ ছড়ানো বিশ সালকে তাই অনেকেই বলছেন ‘বিষ সাল’। এ বছর এক অদৃশ্য মহামারির কবলে পড়ে বিশ্ব। লকডাউনে থেমে যায় পুরো পৃথিবী। সুনসান নিরবতা বিরাজ করে বিশ্বজুড়ে। ব্যস্ততম সড়কগুলো হয়ে পড়ে  নিরব। কোলাহল থেমে যায় সবার। যানবাহনের চাকাগুলো অচল হয়ে পড়ে। না ঘুরতে ঘুরতে চাকায় জং পড়ে যায়। মানুষগুলো কেমন ভুতুড়ে রুপ ধারণ করে। কারো সাথে ছিলো না কারো সাক্ষাত। সবাই যার যার মতো নিজ ঘরে অবস্থান নেয়। এ যেনো এক অজানা পৃথিবী। দুনিয়ায় থেকেই কেয়ামাতের চিত্র দেখে বিশ্ববাসী।

করোনার থাবা শুধু রাস্তা-ঘাট কিংবা যানবাহনের গাঁয়েই লাগেনি। বরং আল্লাহর ঘর মসজিদ ও রাসূলের ঘর মাদরাসায়ও লেগেছিলো। সে এক বিষাদময় উপখ্যান। যা কখনো কারো কল্পনাতেও ছিলো না। সে অকল্পনীয় বিষয়টিই ঘটতে দেখলো বিশ্ববাসী।

করোনার দোহাই দিয়ে বন্ধ করে দেয়া হয় সব মসজিদ। মানুষ প্রতিদিন পাঁচবার হাজিরা দিতো  যে মসজিদে। সে মসজিদে লেগে যায় তালা। সাপ্তাহিক জুমাতেও মসজিদে প্রবেশের সুযোগ মিলেনি। রমজানে রাতের তারাবি, মাস শেষে ঈদুল ফিতরের নামাজ, নামাজ শেষে কোলাকুলি- এসব করার কোনো উপায়ই ছিলো না। কেউতো কারো কাছেই আসতো না। কোলাকুলি কিংবা মুসাফাহাতে ছিলো নিষেধাজ্ঞা। তাই ইসলামী এসব রীতিনীতি বা বিধানাবলি পালনের ব্যাপক সুযোগ ছিলো।

যে করোনা নামক ভাইরাসের থাবায় থমকে গেছে পৃথিবী সেটি সর্বপ্রথম ধরা পড়ে ২০১৯ সালের ২৭ ডিসেম্বর। চীনের উহান শহরে। এরপর এর রুপ প্রক্রিয়া সম্পর্কে বিস্তারিত জানা যায় চলতি বছরের ১৯ জানুয়ারি। আর বাংলাদেশে সর্বপ্রথম করোনাভাইরাস ধরা পড়ে গত ৮ মার্চ।

এরপর থেকেই দেশের স্কুল-কলেজ, মাদরাসা ও অন্যান্য সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো বন্ধের নোটিশ দেয় সরকার। কিন্তু তখনো মসজিদ খোলা ছিলো। অন্য সময়ের চেয়ে মসজিদে মানুষের উপস্থিতি তখন অনেক বেড়ে গিয়েছিলো।

বিজ্ঞাপনImage is not loaded

করোনার আগে যে মসজিদে ফজরের নামাজে মুসুল্লি হতো এক কাতার। সে মসজিদেই করোনাকালীন সময়ে মুসুল্লি হতো ১০ কাতার। মানুষ মসজিদমুখি হয়ে গিয়েছিলো বলা চলে। কিন্তু ইসলামবিদ্ধেষী শক্তির এটা পছন্দ হয়নি। তাই তারা কিভাবে মসজিদ বন্ধ করবে সে চিন্তায় শ্লোগান তুলে মসজিদে মানুষের জমায়েত বেশি হয়ে যাচ্ছে। মসজিদ থেকে ছড়াতে পারে করোনা। তাই যে করেই হোক, করোনা ছড়ানোর পুর্বেই মসজিদগুলো বন্ধ করে দিতে হবে।

এ বিষয়ে সর্বপ্রথম ১৯ মার্চ বিবিসি বাংলা একটি নিউজ প্রকাশ করে। যার শিরোনাম ছিলো, ‘করোনাভাইরাস: বাংলাদেশে মসজিদে নামাজ নিয়ে কী হবে?’ এরপরই আলেমদের সাথে বৈঠকে বসে ইসলামিক ফাউণ্ডেশন। বৈঠক শেষে করোনা থেকে বেঁচে থাকার জন্য সতর্কতামূলক বাংলাদেশে করোনা শনাক্তের মাত্র ১২ দিনের মাথায় একটি বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করে ইসলামিক ফাউণ্ডেশন। ২০ মার্চ প্রকাশিত সে বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, ‘মুসল্লিদের বাসা থেকে অজু করে নফল ও সুন্নত নামাজ পড়ে শুধু জুমার ফরজ নামাজ পড়তে আসতে পারবে। এ ছাড়া অসুস্থ ব্যক্তি, জ্বর, হাঁচি-কাশিতে আক্রান্ত এবং বিদেশফেরতদের মসজিদে না যাওয়ার জন্য অনুরোধ জানানো হয়।

সে সময় মাত্র ৫ জন মুসুল্লিকে মসজিদে আসার অনুমতি দেয়া হয়। যে মসজিদে সব সময় মানুষ থাকতো হাজার হাজার। সেখানে মাত্র ৫জন মানুষকে মনে হতো বিশাল জমিনে ৫টি দেহ। আর সে ৫জনকেও নির্দিষ্ট করে দেয়া হয়। ৫জনের মাঝে ছিলেন মসজিদের ইমাম সাহেব, খতিব সাহেব, মুয়াজ্জিন সাহেব ও দুজন মুসুল্লি।

তখন মুসুল্লি শূণ্যে কেঁদেছিলো পবিত্র মসজিদগুলো। সে সময আল্লাহর ঘর ছিলো লোকশূণ্য। এক ভয়াবহ পরিবেশ বিরাজ করছিলো মসজিদজুড়ে। মানুষ চাইলেও যেতে পারতো না মসজিদে। সে সময় ঘরই ছিলো মানুষের মসজিদ।

দেশে যে মসজিদে সর্বপ্রথম নামাজ স্থগিত করা হয় : ঢাকার অদূরে টাঙ্গাইল জেলার গোপালপুর উপজেলায় দুইশো গম্বুজ বিশিষ্ট মসজিদে শুক্রবারের জুম্মার নামাজ এবং পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ সাময়িক সময়ের জন্য স্থগিত করা হয়। সেই মসজিদ কমিটি নিজেরা করোনাভাইরাস সংক্রমণ ঠেকাতে এই সিদ্ধান্ত নেয়ার কথা ঘোষণা করে।

এভাবেই কেটে যায় টানা তিন মাস। এর মাঝে রমজান, ঈদুল ফিতর, পবিত্র হজ, ঈদুল আজহাসহ ধর্মীয় প্রধান প্রধান কাজগুলো একা একা জামাতবদ্ধ হওয়া ছাড়াই আদায় করে মানুষ।

কিন্তু এভাবে আর কত? জীবন কখনো থেমে থাকে না। সময় কখনো বসে থাকে না। ‘সময়’ এমন নিষ্ঠুর এক বস্তুর নাম। সে দেখে না কারো কাদন। শোনে কারো রোদন। মানে না কারো বারণ-বাঁধন। সময়ের সাথে সাথে পরিবর্তন হতে থাকে মানুষের চিন্তার। পাল্টাতে থাকে জীবনের গতিপথ। এরই ধারাবাহিকতায় ধীরে ধীরে খুলতে থাকে মসজিদ। নামাজের জন্য উন্মুক্ত করা হতে থাকে মসজিদগুলো। আর গত ১২ আগস্ট মাদরাসাগুলো খোলার অনুমতি দেয় সরকার। তবে দেশের স্কুল-কলেজ ও ইউনিভার্সিটিগুলো এখনো সরকারিভাবে খোলার অনুমতি দেয়া হয়নি।

জনপ্রিয় খবর