Thursday, February 25, 2021
Home বাংলাদশে সংবাদ পুঁজিবাদী মিডিয়া যে জন্য ইসলামকে বর্বর, সন্ত্রাসী, জঙ্গি ধর্ম হিসাবে প্রচার করতে...

পুঁজিবাদী মিডিয়া যে জন্য ইসলামকে বর্বর, সন্ত্রাসী, জঙ্গি ধর্ম হিসাবে প্রচার করতে চায়

সাদুদ্দীন সাদী ।।

শিখোবাংলায়: বাস্তব ময়দানে তেমন কিছু না ঘটলেও মিডিয়ার ময়দান জুড়ে গোটা বিশ্বেই ইসলাম ও মুসলমানকে সন্ত্রাসী ও জঙ্গিবাদী হিসেবে উপস্থাপন করা পশ্চিমা ও সাম্রাজ্যবাদীদের আগ্রাসনের একটি বিশেষ অংশ। সাম্রাজ্যবাদীদের সংস্কৃতিক আগ্রাসনের একটি অংশ হল তারা মিডিয়ায় ইসলাম ও মুসলমানদের বিরূপভাবে উপস্থাপনের পাশপাশি তথাকথিত শিল্পের নামে নাটক সিনেমা মুভিতেও ইসলাম ও ইসলামের বিভিন্ন নিদর্শনকে হেয় করে থাকে।

কমিউনিজমের পতনের পর সাম্রাজ্যবাদীরা  ইসলামের বিরুদ্ধে লড়াই শুরু করেছে। নোয়াম চমস্কি বলেছেন, কমিউনিজমের পর সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধের আড়ালে ইসলামবিরোধীতাকে পশ্চিমা জগত আজ জাতীয় ধর্মে পরিণত করে ফেলেছে। স্বাভাবিকভাবেই পশ্চিমের প্রযুক্তি শাসিত শক্তিশালী মিডিয়া পুঁজিবাদ সাম্রাজ্যবাদের একান্ত অনুগত খেদমতগার হিসেবে ইসলামকেই এই মুহূর্তে তার বড় শত্রু হিসেবে নিশানা করেছে।

কমিউনিজমের পতনের পর ইসলামকে এই নিশানা করা কেন? কারণ এটি একটি সুগঠিত আদর্শ। এটি কর্পোরেট পুঁজিকে সমর্থন করে না। সমর্থন করে না বাজার অর্থনীতি, বিশ্বায়নের নামে নতুন কালের অর্থনৈতিক শোষণের দাপাদাপি। পশ্চিমের অবাধ কনজুমারিজম, ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবাদ ও আত্মস্বার্থপরতা ইসলামের কাম্য নয়। ইসলাম চায় না একজনের শোষণে আর একজনের অগ্রগতি; ইসলাম চায় আদল, ইহসান ও ইনসাফভিত্তিক সমাজ ব্যবস্থা যেখানে শোষণ ও বঞ্চনা থাকবে না।

এজন্য পুঁজিবাদী মিডিয়া ইসলামকে বর্বর, সন্ত্রাসী, জঙ্গি ধর্ম হিসাবে অনবরত প্রচার করে। মৌলবাদ ও সামপ্রদায়িকতার অভিযোগে তাকে অবিরত নিন্দিত হতে হয়। উদ্দেশ্য, কোনো কিছুকে নিন্দিত না বানাতে পারলে তাকে ধরাশায়ী করা যাবে কেমন করে! কেবল শক্তিশালী মিডিয়ার সাহায্যে সাম্রাজ্যবাদীরা ইসলামের সঙ্গে শত্রুতাকে আজ জায়েয করে নিচ্ছে। ইসলাম ও ইসলাম প্রধান জনগোষ্ঠী নিয়ে পশ্চিমা সাম্রাজ্যবাদীদের দৃষ্টিভঙ্গি ভালোভাবে বোঝা দরকার।

বিজ্ঞাপনImage is not loaded

বেশী আগে যাওয়ার দরকার নেই, ইরাক ও আফগানিস্তানের কথা স্মরণ করুন। সাদ্দামকে খলনায়ক নির্মাণের আগে গণমারণাস্ত্র ভাণ্ডারের গল্পকাহিনী নিয়ে বুশ-ব্লেয়ার ও তাদের অনুগত মিডিয়া যেভাবে লাফিয়ে বেড়িয়েছে, তা পৃথিবীর মানুষ দেখেছে। গণধ্বংসের অস্ত্র জমা করার জন্য সাদ্দামের ইরাক বিপজ্জনক রাষ্ট্র হয়ে উঠার গল্পটা যে কতখানি অন্তঃসারশূন্য তা এতদিনে সবাই হাড়ে হাড়ে টের পেয়েছে। ওটা যে আগাগোড়াই মিথ্যা প্রচার ছিল, ইরাক আগ্রাসনের ছল বা অজুহাত ছিল-সেসব কথা আজ দিনের আলোর মতো পরিষ্কার। অথচ এই গল্পকাহিনীই আমাদের পশ্চিমা মিডিয়া বিশ্বাস করতে বাধ্য করেছে।

হামিদ আবদুল করিম তার প্রবন্ধ দি হিপোক্রেসি অব ওয়েস্টার্ণ মিডিয়াতে লিখেছেন : লন্ডন থেকে প্রকাশিত একটি খবরের কিছু অংশ দেখা যাক, ‘একদল আমেরিকান উগ্রপন্থী হিজ ম্যাজেস্টির শান্তিরক্ষী বাহিনীকে আক্রমণ করে অনেক ব্রিটিশ সৈন্যকে হত্যা করেছে।  এই সন্ত্রাসী হামলার খবরে প্রধানমন্ত্রী সব ধরনের সন্ত্রাসী কার্যকলাপ বন্ধ করার প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন এবং মহামান্য রাজাকে এই বলে আশ্বস্ত করেছেন-যতদিন পর্যন্ত না আমেরিকান সন্ত্রাসীরা তাদের দুষ্কর্ম বন্ধ করে আত্মসমর্পণ করছে,ততদিন তিনি শান্তিতে বিশ্রাম নেবেন না। এই খবর একটু অদ্ভূত শোনাতে পারে : কিন্তু সাম্রাজ্যবাদী প্রভু ব্রিটেনের বিরুদ্ধে আমেরিকার স্বাধীনতা সংগ্রাম চলাকালে হোয়াইট হল থেকে এরকম খবরই পরিবেশন করা হতো। স্বাভাবিকভাবেই এখবর শুনে সেই সময়ের আমেরিকাবাসীরা হেসেছিল। কিন্তু আজকে তারা হুবহু একই ধাঁচে ইসলামী সন্ত্রাসবাদ ও মুসলিম চরমপন্থী নামে অপপ্রচার চালাচ্ছে এবং বিশ্বকে তা বিশ্বাসও করাতে চাচ্ছে। প্রচারণার এই ধরণটা চিরকাল একই রকম। হয় আমাদের সঙ্গে থাক না হলে ভাগাড়ে গিয়ে মরো। পেন্টাগন, হোয়াইট হাউস এবং স্টেট ডিপার্টমেন্টের পছন্দসই হলে টিকবে, নইলে ধ্বংস হয়ে যাবে। স্বাধীনতা সংগ্রামী, মতাদর্শিক যোদ্ধা এতে কিছু আসে যায় না। আমেরিকার জিঘাংসার বিরুদ্ধে, ক্যাপিটালিজমের বিরুদ্ধে, বিশ্বায়ন-বাজার অর্থনীতির বিরুদ্ধে যে-ই দাঁড়াবে, মোকাবিলা করার কথা বলবে, সে-ই রাতারাতি সভ্যতার শত্রু, জঙ্গি, বর্বর, সন্ত্রাসী বনে যাবে।

এ কথা বলার অপেক্ষা রাখে না, মুসলিম রাষ্ট্র ও জনগণ আজও পাশ্চাত্যের পুঁজিপতিদের নিয়ন্ত্রিত মিডিয়ার উপর ভয়ানকভাবে নির্ভরশীল। এই নির্ভরশীলতা আন্তর্জাতিক দুনিয়ায় প্রতিযোগিতার ক্ষেত্রে মুসলিম জনগণের অবস্থানকে প্রতিনিয়ত দুর্বল করে দিচ্ছে। পুঁজিপতি মিডিয়াগুলোর অবিরত প্রচারণা মুসলিম জনগণের মাঝে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করে। তাদের মধ্যে নৈরাজ্য উৎপাদন করে। এসবের ফলে স্থানীয় ঐতিহ্যবাহী সাংস্কৃতিক ধারণাগুলোর অবলুপ্তি ঘটে। এগুলো ধীরে ধীরে ভিনদেশী ধারণা দ্বারা প্রতিস্থাপিত হয়। এই অবস্থা থেকে উত্তরণের পথ হচ্ছে মিডিয়াকে ব্যবহার করা। মিডিয়ার প্রচারণাকে মিডিয়া দিয়েই প্রতিহত করতে হবে। এই কৌশল আজ মুসলমানদের আয়ত্ত করতে হবে।

যদি মিডিয়াকে পরিবর্তন করতে হয়, তাহলে মানুষকে বুঝাতে হবে; ইসলাম রাজনৈতিক এবং সাংস্কৃতিক দিক দিয়ে একটি শক্তি। কিভাবে মিডিয়াকে ব্যবহার করতে হবে এবং মিডিয়াতে নিজেদের কিভাবে উপস্থাপন করতে হবে তা মুসলমানদের জানতে হবে। মুসলিম উম্মাহকে এই নবতর চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করার বিকল্প কোনো পথ নেই।

জনপ্রিয় খবর