Wednesday, June 16, 2021
Home ইসলামের ইতিহাস স্বাধীনতা: খোদার দান

স্বাধীনতা: খোদার দান

ওয়ারিস রব্বানী ।।

শিখোবাংলায়.কম: স্বাধীনতা মানে হচ্ছে অপর কোনো শক্তির অধীনতায় না থাকা। মানুষ যেহেতু বিবেকবান, হৃদয় ও সুমস্তিষ্ক সম্পন্ন সবাক প্রাণী তাই স্বাধীনতার চেতনা তার মজ্জাগত। অপর কোনো সৃষ্টির কাছে সে নতি স্বীকার করবে না, অপর কোনো সৃষ্টির অধীনে তার জীবন ও অস্তিত্ব বাঁধা পড়বে না-এটাই তার স্বাভাবিক ও স্বতঃস্ফূর্ত আকাঙ্ক্ষা হওয়ার কথা। কিন্তু যেহেতু মানুষ নিজে স্রষ্টা নয়, বরং মহান স্রষ্টার এক অপূর্ব সৃষ্টি তাই তার স্বাধীনতার সকল সীমানা প্রশ্নাতীত রকমের ব্যাপক ও বিস্তৃত নয়। স্রষ্টার আনুগত্যের পর তার স্বাধীনতার চেতনা পাখা মেলবে। এটাই হচ্ছে মানুষের স্বাধীনতার চূড়ান্ত সীমানা।

যুক্তিসঙ্গত এই সীমানা ও নীতিকে গ্রহণ করার পর স্বাধীনতা মানুষের প্রতি মহান স্রষ্টা আল্লাহ তাআলার এক মস্তবড় দান। খোদা তাআলার এক মহা নেয়ামত। মানুষকে আল্লাহ তাআলা স্বাধীন করেই সৃষ্টি করেছেন। মানুষের আসল স্বভাবগত অবস্থা হচ্ছে তার স্বাধীন থাকা। এজন্য মানুষের ওপর একটি করণীয় বা দায়িত্ব অর্পিত হয়। সেটি হচ্ছে এই মহা নেয়ামতের শুকরিয়া আদায় করা, এই মস্ত দানের কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা। আর তার রূপ হলো, মানুষের স্রষ্টা এবং মানুষকে স্বাধীনতা দানকারী মহান আল্লাহর প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করা, কাজে-কর্মে, কথায় জীবনের সব ক্ষেত্রে। মানুষ যখন তার এই দায়িত্ব ও করণীয় ভুলে যায়, কৃতজ্ঞতা প্রকাশে কৃপণ হয়ে পড়ে তখনই তার উপর আসে পরাধীনতার শাস্তি। দাসত্ব, গোলামী ও পরাধীনতা মূলত মানুষের জন্য শাস্তিদায়ক একটি অবস্থা।

এখন প্রশ্ন হচ্ছে, স্বাধীনতার এই নেয়ামতের কদর, মূল্যায়ন ও কৃতজ্ঞতা প্রকাশ কীভাবে মানুষের পক্ষে সহজে সম্ভব হবে? এ প্রশ্নের উত্তর হলো, যারা স্বাধীনতার তাৎপর্য ও হাকীকত বুঝে, স্বাধীনতা-পরাধীনতার পার্থক্য বুঝে, স্বাধীনতা নেয়ামত হওয়ার জন্য যেসব নীতিমালার অনুসরণ অপরিহার্য সেগুলো সম্পর্কে জানে তাদের পক্ষেই স্বাধীনতার মূল্য দেওয়া এবং কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা সম্ভব। স্বাধীনতা-পরাধীনতার দ্বিমুখিতা ও স্বাধীনতার নীতিমালা ও নিয়ন্ত্রণ সম্পর্কে জরুরি ইলম থাকলেই কৃতজ্ঞতার আচরণ সংঘটন সহজে সম্ভব।

এ বিষয়ে ইসলামের প্রধান ও মৌলিক শিক্ষা হলো, মানুষের প্রকৃত স্বাধীনতা কেবল বাহ্যিক শৃংখল মুক্তির চিত্র কিংবা প্রত্যয় দ্বারা অর্জিত হয় না। দৃশ্যমান পরাধীনতার নাগপাশ ছিন্ন করলেই মানুষ স্বাধীন হয়ে যায় না। মানুষের স্বাধীনতার প্রথম ধাপ হচ্ছে রাববুল আলামীনের ইবাদত অবলম্বন। মানুষের স্রষ্টা আল্লাহর আবদ যখন মানুষ বনবে, যখন আল্লাহর আহকামের সে গোলামী করবে তখনই সে সঠিক অর্থে স্বাধীন হবে এবং সার্বিক স্বাধীনতা লাভের যোগ্য হবে।

বিজ্ঞাপনImage is not loaded

ইসলাম বিভিন্ন দিক থেকে স্বাধীনতার সবক ও চেতনার শিক্ষা দিয়েছে। স্বাধীনতার প্রথম সবক হচ্ছে নফস ও শয়তানের প্ররোচনা ও দাসত্ব থেকে মুক্ত থাকা, স্বাধীন থাকা। সূরায়ে ইয়াসীনের ৬০, ৬১ ও ৬২ নম্বর আয়াতের আলোকে এ শিক্ষার মর্ম অনুধাবন করা যায়। আয়াতগুলোর তরজমা হলো-

‘‘হে বনী-আদম! আমি কি তোমাদেরকে বলে রাখিনি যে, শয়তানের ইবাদত করো না, সে তোমাদের প্রকাশ্য শত্রু।’’ ‘‘আর আমারই ইবাদত কর, এটিই সরল পথ। [৬১] শয়তান তো তোমাদের বহু দলকে বিভ্রান্ত করেছিল, তবুও কি তোমরা বুঝোনি? [৬২]

স্বাধীনতার দ্বিতীয় সবক হচ্ছে, বিজাতিদের গোলামী থেকে স্বাধীন থাকা। এ গোলামী কেবল ভৌগোলিক দখল-বেদখলেরই নয়, বরং এর মধ্যে সাংস্কৃতিক দাসত্বও অন্তর্ভুক্ত। ইসলাম সূক্ষ্ম সে সাংস্কৃতিক দাসত্বকেও ঘৃণা করে। হাদীসে রাসূলে উল্লেখ হয়েছে ‘‘যে ব্যক্তি যে জাতির সাদৃশ্য গ্রহণ করবে সে তাদের অন্তর্ভুক্ত হবে।’’ -আবু দাউদ, হাদীস ৪০২৭

স্বাধীনতার তৃতীয় সবক হচ্ছে, অমূলক রুসম-রেওয়াজ ও বেদআত থেকে মুক্ত থাকা, স্বাধীন থাকা। মূলত আল্লাহর আনুগত্যের পাশাপাশি দেহের ও চিত্তের সব ধরনের শৃঙ্খল থেকে মুক্তি ও আযাদির নামই স্বাধীনতা।

তবে আলোচনার এ পর্যায়ে বিশেষভাবে উল্লেখ করা প্রয়োজন যে, স্বাধীনতা ও লাগামহীনতা একবন্তু নয়। স্বাধীনতার সাথে দায়িত্ব ও সীমানার একটি মাত্রা বিদ্যমান। স্বাধীনতার সাথে সাথে বিভিন্ন বিধান ও শৃঙ্খলার আনুগত্য করা ভদ্রতা ও সৌজন্যের অপরিহার্য্য বৈশিষ্ট্য। আল্লাহর ইবাদত-বন্দেগিকে স্বাধীনতার পরিপন্থী মনে করা, পরাধীনতা নাম দেওয়া মূলত স্বাধীনতার মূল স্বরূপ ও তাৎপর্যেরই বিকৃতি। কারণ আল্লাহ তাআলা হচ্ছেন মানুষের খালেক [সৃষ্টিকর্তা] মালেক [মালিক] রহমান [পরম করুণাময়] রহীম [দয়াশীল]। মানুষ নিজের জন্য যাকে উপযোগী বুঝে থাকে, তিনি তার চেয়েও সেটা বেশি বুঝেন। তিনি মানুষের জন্য মানুষের নিজ থেকেও আপন। তাই ইবাদতকারী বান্দা সহীহ অর্থে স্বাধীন, পরাধীন নয়। যারা এমন মনে করেন স্বাধীনতার মানে তাদের কাছে সর্বাত্মক লাগামহীনতা। তার অর্থ হচ্ছে শয়তান ও নফসের দাসত্ব। দৃশ্যত স্বাধীনতা থাকলেও তার মধ্যে পরাধীনতার বৈশিষ্ট্যই প্রকট। অপরদিকে স্বাধীনতার মানে অপরের স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ না করা। স্বাধীনতার অপব্যবহার না করা। তেমনটি করলে সেটি হবে জুলুম। নিশ্চয়ই স্বাধীনতার চর্চা এমন হতে পারে না, যার দ্বারা অন্যের হক নষ্ট হয়, অন্যের ওপর জুলুম করা হয়। লাগামহীন ও স্বেচ্ছাচারিতাপূর্ণ আচরণ স্বাধীন আচরণ হতে পারে না। সেটা হয় শয়তান ও নফসের কাছে পরাধীন মানুষের আচরণ।

ইসলামের নীতি ও নিয়ন্ত্রণ বজায় রেখে স্বাধীনতাকে ব্যাপকভাবে উৎসাহিত করা হয়েছে। ইসলাম মূলত ‘হুররিয়্যত’ বা স্বাধীনতারই ঝান্ডাবাহী। মানুষের স্বাধীন জীবনযাত্রা অক্ষুণ্ণ রাখার স্বার্থেই মানুষের রক্ত, সম্পদ, সম্ভ্রমকে অপর মানুষের জন্য সম্মানিত করে দেওয়া হয়েছে। এই তিনটির উপর যেকোনো আঘাতকে হারাম ঘোষণা করা হয়েছে। মানুষের অভিযোগ ও কষ্ট দূর করার ক্ষেত্রগুলোতে ‘গীবত’এর মতো নিকৃষ্ট বিষয়কেও জায়েয আখ্যা দেওয়া হয়েছে। অপরের আরাম ও নিরাপত্তায় যেন সামান্য পরিমাণও বিঘ্ন না ঘটে সে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। ইসলামে ঘোষণা করা হয়েছে ‘নিশ্চয়ই হকের প্রাপকের জন্য কথার সুযোগ রয়েছে।’ এ ঘোষণা দিয়ে যৌক্তিক পর্যায়ে ব্যাপক বাক-স্বাধীনতাও দেওয়া হয়েছে। ব্যক্তি, সমাজ, রাষ্ট্র এবং ব্যক্তির অন্তর ও বাহ্যিক জগতের সব পর্যায়ে ইসলাম স্বাধীনতার নিশান উড়িয়ে দিয়েছে। সে স্বাধীনতায় স্রষ্টার আনুগত্য এবং অপরের হক ক্ষুণ্ণ না করার পর্বটিকেও উজ্জ্বল রাখাকে স্বাধীনতার অংশ সাব্যস্ত করা হয়েছে। নফস-শয়তানের পরাধীনতামুক্ত থাকা অপরিহার্য। সে স্বাধীনতার জন্য কৃতজ্ঞতার মৌখিক ও আচরণগত ভাষা প্রকাশিত হওয়া অনিবার্য। তবেই সে স্বাধীনতা হবে সার্থক ও সফল।

শেষ কথা হলো, আল্লাহ তাআলা যখন কোনো ভূখন্ড কাউকে বা কোনো জাতিকে দান করেন, তখন সে ভূখন্ড-প্রাপকদের উচিত তার জন্য শুকরিয়া আদায় করা। আর সে শুকরিয়া আদায়ের রূপ হলো, ক. সমাজের সর্বস্তরে ইনসাফ কায়েম করা খ. সমাজে দ্বীন ও শরীয়ত কায়েম করা। সূরায়ে হজ্বের ৪১ নম্বর আয়াতে আল্লাহ তাআলা এ বিষয়টিরই ইরশাদ করেন-

‘‘আমি তাদেরকে পৃথিবীতে প্রতিষ্ঠা দান করলে তারা নামায কায়েম করবে, যাকাত দেবে এবং সৎ কাজের আদেশ দেবে, অসৎকাজের নিষেধ করবে; আর সকল কাজের পরিণাম আল্লাহর ইখতিয়ারে।’’

সুতরাং স্বাধীন একটি ভূখন্ডের প্রাপক হিসেবে এ আয়াত থেকে আমরাও আমাদের দায়িত্ব ও কৃতজ্ঞতা প্রকাশের ধরন জেনে নিতে পারি। এদেশের স্বাধীনতা অটুট রাখতে এবং পরাধীনতার শৃংখল থেকে মুক্ত থাকতে আমাদের সে দায়িত্ব পালন করে যাওয়া আমাদের স্বার্থেই জরুরি। দেশের সাধারণ নাগরিক, চিন্তাশীল পথ-নির্দেশক এবং দেশের কর্তা ব্যক্তিরা সে দায়িত্ব নিয়ে যত দ্রুত ভাববেন ও সক্রিয় হবেন ততই দেশের মঙ্গল হবে।

জনপ্রিয় খবর