Tuesday, June 15, 2021
Home আজকের ফতোয়া ইসলামিক সন- চাঁদের হিসাব কখন থেকে শুরু হয়

ইসলামিক সন- চাঁদের হিসাব কখন থেকে শুরু হয়

মুফতি মাসউদুর রহমান ওবাইদী

প্রশ্নঃইসলামিক সন/ চাঁদের হিসাব কখন থেকে শুরু হয় ?

উত্তরঃহিজরী সন বা বছর (আরবি: سنة هجرية‎‎) বা যুগ (التقويم الهجري আত তাকিম আল-হিজরি) হল ইসলামী চন্দ্র পঞ্জিকায় ব্যবহৃত যুগ, যার গণনা ৬২২ খ্রিষ্টাব্দে ইসলামী নববর্ষ থেকে শুরু হয়।

মুহাম্মাদ (সা:) মক্কার কাফেরদের ষড়যন্ত্রের কারণে মক্কা ছেড়ে মদিনা চলে যান। যা হিজরত নামে পরিচিত। পরবর্তি আরবরা এই হিজরতের সময় থেকে হিজরি সাল গণনা শুরু করেন।

আনুষ্ঠানিকভাবে ৬৩৯ খ্রিস্টাব্দ থেকে হিজরি সন চালু হয়।মুসলিমবিশ্বে চন্দ্র পরিক্রমার সাথে সম্পর্কিত হিজরি সন অতি পবিত্র,মহিমান্বিত ও মর্যাদাপূর্ণ সন।প্রায় দেড়শত কোটি মুসলিমের কাছে এই হিজরি সনের গুরুত্ব অপরিসীম।মুসলিম উম্মাহর ঐতিহাসিক সাল গণনায় হিজরি সন এক মহান ঘটনার স্মারক।ইসলামের বিভিন্ন বিধিবিধান হিজরি সন তথা আরবি তারিখ ও চন্দ্রমাসের সঙ্গে সম্পর্কিত।ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান, আনন্দ-উৎসবসহ সব ক্ষেত্রেই মুসলিম উম্মাহ হিজরি সনের উপর নির্ভরশীল।তারিখ শব্দটি আরবি যার প্রচলিত অর্থ ইতিহাস, বছরের নির্দিষ্ট দিনের হিসাব।আল্লামা ইবনে মানজুর (রহ.) তাঁর বিখ্যাত আরবি অভিধান ‘লিসানুল আরবে’ লিখেছেন,-তারিখ হলো সময়কে নির্দিষ্ট করা, সময়ের চিত্র তুলে ধরা, সময়ের ঘটনাপ্রবাহকে শব্দবদ্ধ করা।আবার কেউ কেউ বলেছেন তারিখ শব্দটি অনারবি।‘মা’ ও ‘রোজ’ থেকে পরিবর্তন করে একে আরবিতে রুপান্তর করা হয়েছে যার অর্থ-দিন, মাস ও বছরের হিসাব।

বিজ্ঞাপনImage is not loaded

হিজরি সন গণনা কোনো ব্যক্তির জন্ম বা মৃত্যু তারিখ থেকে  শুরু হয়নি-বরং ইহা বিশেষ মর্যাদাপূর্ণ হিজরতের সঙ্গেই সম্পর্কিত।হিজরতের ঐতিহাসিক ঘটনাকে স্মারক বানিয়ে ইসলামের দ্বিতীয় খলিফা হজরত ওমর (রা.) হিজরি নববর্ষের গোড়াপত্তন করেন। তিনিই সর্বপ্রথম মুসলমানদের জন্য পৃথক ও স্বতন্ত্র চান্দ্রমাসের পঞ্জিকা প্রণয়ন করেন। হিজরি সন যদিও  দ্বিতীয় খলিফা হজরত ওমর (রা.)-এর নির্দেশে তাঁরই যুগ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে প্রচলিত হয়ে আসছে কিন্তু প্রকৃতপক্ষে এর গণনা শুরু হয়েছে মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সাঃ)-এর হিজরতের সময় এবং হিজরতের পরিকল্কনাকে ও নির্দেশনাকে কেন্দ্র করেই।

হিজরি সন গণনার সূত্রপাতঃ

ইসলামী বিধিবিধান প্রতিপালন ও পরিকল্পিত সন গণনার প্রয়োজনেই মূলত হিজরি সনের উদ্ভব ঘটে।জীবন  সময়ের সমষ্টি।সময়কে মানুষের প্রয়োজনে ব্যবহারোপযোগী করে মহান আল্লাহতায়ালা প্রাকৃতিকভাবে বিভিন্ন ভাগে বিভক্ত করেছেন।যেমন-দিন, রাত,মাস, বছর ইত্যাদি।বছরকে আমরা সাল বা সন বলি।বছর শব্দটির মূল হলো বরস যা একটি উর্দু শব্দ।সাল শব্দটি ফারসি এবং সন শব্দটি আরবি।বাংলায় বর্ষ, বৎসর ও অব্দ ব্যবহৃত হয়।মহান আল্লাহ পাক এরশাদ করেন,“তিনিই সূর্যকে তেজস্কর ও চন্দ্রকে জ্যোতির্ময় করেছেন এবং উহাদের মঞ্জিল নির্দিষ্ট করেছেন,যাতে তোমরা বৎসর গণনা ও সময়ের হিসাব জানতে পার”।“আল্লাহ ইহা নিরর্থক সৃষ্টি করেননি।জ্ঞানী সম্প্রদায়ের জন্য তিনি এসমস্ত নিদর্শন বিশদভাবে বিবৃত করেন।”(সুরা ইউনুস,আয়াত-৫)।“আর সূর্য ভ্রমন করে উহার নির্দিষ্ট গন্তব্যের দিকে, ইহা পরাক্রমশালী সর্বজ্ঞের নিয়ন্ত্রণ।এবং চন্দ্রের জন্য আমি নির্দিষ্ট করেছি বিভিন্ন মঞ্জিল; অবশেষে উহা শুষ্ক বক্র পুরনো খর্জুর শাখার আকার ধারণ করে।”(সুরা ইয়াসিন, আয়াত:৩৮-৩৯)

প্রাচীন আরবে সুনির্দিষ্ট কোন সন প্রথা প্রচলিত ছিল না।বিশেষ ঘটনার নামে বছরগুলোর নামকরণ করা হতো।যেমন-বিদায়ের বছর,অনুমতির বছর, ভূমিকম্পের বছর,হস্তীর বছর ইত্যাদি।মহানবী সাঃ যখন ইসলাম প্রচার করতে শুরু করেন, আরববাসী তখন ‘হস্তীর বছর’ থেকে কাল গণনা করছিল।।ইসলামের দ্বিতীয় খলিফা হজরত ওমর (রা.)যখন খেলাফতের দায়িত্বভার গ্রহণ করেন, তখন বহু দূর-দূরান্ত পর্যন্ত নতুন নতুন রাষ্ট্র ও ভূখন্ড ইসলামী খেলাফতের অন্তর্ভুক্ত হয়।রাষ্ট্রের জরুরী দলিল,কাগজপত্র ইত্যাদিতে কোন সন তারিখ উল্লেখ না থাকায় অসুবিধার সৃষ্টি হতো।প্রখ্যাত ইসলামী চিন্তাবিদ আল্লামা শিবলী নোমানী (র.) হিজরি সনের প্রচলন সম্পর্কে তাঁর সুপ্রসিদ্ধ ‘আল ফারুক’ গ্রন্থে উল্লেখ করেন:-হজরত ওমর (রা.) এর শাসনামলে ১৬হিজরি সনের শাবান মাসে খলিফা ওমরের কাছে একটি দাপ্তরিক পত্রের খসড়া পেশ করা হয়,পত্রটিতে মাসের উল্লেখ ছিল: সনের উল্লেখ ছিল না।তীক্ষ্ণ দূরদৃষ্টিসম্পন্ন খলিফা জিজ্ঞাসা করেন, “পরবর্তী কোন সময়ে তা কিভাবে বোঝা যাবে যে, এটি কোন সনে তাঁর সামনে পেশ করা হয়েছিল?” এপ্রশ্নের কোন সদুত্তর না পেয়ে হজরত ওমর (রা.) সাহাবায়ে কেরাম ও অন্য শীর্ষ পর্যায়ের জ্ঞানী-গুণীদের নিয়ে এক আলোচনা সভার আয়োজন করেন।এই ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত গৃহীত হয় হিজরতের ১৬বছর পর ১০জুমাদাল উলা মুতাবেক ৬৩৮খ্রিস্টাব্দে।মহানবী (সা.)-এর জন্ম, নবুয়ত, হিজরত ও ওফাত—এ চারটি ঐতিহাসিক ও গুরুত্বপূর্ণ ঘটনার যেকোন একটি হতে হিজরি সন গণনা করা যেত। কিন্তু জন্ম ও নবুয়তের তারিখ নিয়ে মতপার্থক্য আছে। আর মৃত্যু শোকের স্মারক। অতএব হিজরতের মাধ্যমেই সন গণনা শুরু করা যুক্তিযুক্ত। তাই হিজরতের বছর থেকে সন গণনার পরামর্শ দেন হজরত আলী (রা.)।কারণ বস্তুতপক্ষে ঐদিন থেকে আমাদের প্রিয়নবী হজরত মুহাম্মদ (সাঃ)শাসনক্ষমতা গ্রহণ করতে শুরু করেন এবং সেজন্যই দিনটি মুসলিমজাহানের কাছে চিরস্মরণীয়।।তৎকালে আরবে অনুসৃত প্রথা অনুযায়ী পবিত্র মহররম মাস থেকে ইসলামী বর্ষ বা হিজরি  সনের শুরু করার এবং জিলহজ মাসকে সর্বশেষ মাস হিসেবে নেওয়ার পরামর্শ প্রদান করেন হজরত উসমান (রা.)।(বুখারী ও আবু দাউদ)।

এছাড়াও আল বিরুনি কর্তৃক উদ্ধৃত একটি বিবরণীতে আছে, হজরত আবু মূসা আল-আশয়ারি (রাঃ) হজরত ওমর (রা.) এর কাছে লিখিত এক পত্রে বলেন, “আপনি আমাদের কাছে চিঠিপত্র পাঠাচ্ছেন কিন্তু তাতে কোনো তারিখের উল্লেখ নেই”। খলিফা বিষয়টি তাঁর অধীনস্থদের সাথে আলাপ-আলোচনা করেন এবং গ্রিস ও পারস্যে প্রচলিত বর্ষপঞ্জি পদ্ধতি পরীক্ষান্তে কাল গণনায় দিনপঞ্জি প্রতিষ্ঠার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন।হিজরতের বছরটি হিজরি অব্দের আরবী প্রথম বছর নির্ধারিত হয়েছিল। মাসগুলো যেমন প্রচলিত ছিল তেমনই রইল এবং মহররমকে বছরের প্রথম মাস হিসেবে ধরা হলো।

জনপ্রিয় খবর