Wednesday, January 20, 2021
Home ইসলাম প্রতিদিন আচরণের ক্ষেত্রে সতর্কতা: একটি সহজ হিসাব

আচরণের ক্ষেত্রে সতর্কতা: একটি সহজ হিসাব

মুহাম্মাদ তাওহীদুল ইসলাম তায়্যিব ।।

শিখোবাংলায়.কম: অনেক দিন আগের কথা। আমাদের উস্তায পর্যায়ের এক সহকর্মী বড় শিক্ষণীয় একটি ঘটনা শুনিয়েছিলেন। ঘটনাটি তার নিজের। তিনি বলেন, একবার আমার সামনে আমাদের সিনিয়র এক সাথীর ফোন এলো। তার মোবাইলে রিংটোন হিসাবে মিউজিকের মতো একটা টোন বাজল। সেটা শুনে আমি বললাম, ‘বাজনাওয়ালা রিংটোন দিয়েছেন কেন? এটা পরিবর্তন করা যায় না!’

আমার মন্তব্য শুনে তিনি তৎক্ষণাৎ কিছু বললেন না। কিছুক্ষণ পর আমাকে একা পেয়ে বললেন, ‘কাউকে কোন বিষয়ে সতর্ক করতে হলে কিংবা সংশোধনমূলক কোন কথা বলতে চাইলে আগে খোঁজ নেওয়া উচিত এ ব্যাপারে তার কোন ওজর আছে কিনা!’ বললেন, ‘এই মোবাইলে এরচেয়ে সাধারণ কোন রিংটোন নেই।’ অর্থাৎ বাকি টোনগুলো এর চেয়েও মারাত্মক।

এটা সেই সময়ের কথা যখন স্মার্ট ফোন সচরাচর দেখা যেত না। সেইসব ফোনে নির্দিষ্ট রিংটোন ছাড়া অন্য কোনো টোন যুক্ত করাও যেত না।

আমাদের সহকর্মী এ ঘটনা শুনিয়ে বললেন, ‘সেদিন আমি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি শিক্ষা লাভ করেছি। কাউকে কোন বিষয়ে সতর্ক করা বা  ধমক দেওয়ার আগে খোঁজ নেওয়া উচিত, আসলেই এ ব্যাপারে তার কোনো ওজর আছে কিনা।’

বিজ্ঞাপনImage is not loaded

এই  নীতি জানা থাকা সত্ত্বেও কখনো দেখা যায়, একান্ত খামখেয়ালিতে কিংবা এই নীতির প্রতি খেয়াল না করে আমরা কাউকে কোন বিষয়ে সতর্ক করি। কিংবা কোনো বিষয়ে সংশোধনের কথা বলি। তখন সেইলোক ভদ্র হলে তো নীরব থাকে। ভদ্রতার ব্যাপারে যত্নশীল না হলে মুখের উপর জবাব দিয়ে দেয়। এতে লজ্জিত হওয়া ছাড়া উপায় থাকে না। কখনো বিষয়টি আরও অনেকদূর পর্যন্ত গড়ায়।

বাহ্যিক দৃষ্টিতে নীতিটা খুব সাধারণ হলেও বাস্তবিক ক্ষেত্রে বিষয়টি খুবই গুরুত্বপূর্ণ । বিষয়টি আত্মসম্মানমূলক ভদ্রতার অংশ।

দৈনন্দিন জীবনে দেখা যায়, আমরা আমাদের ঘনিষ্ঠ কিংবা অধীনস্থ কাউকে নিয়মিত বিভিন্ন কাজ কর্মের নির্দেশ দিই। এরপর যথাসময়ে কাজটি করা না হলে রেগে যাই। তাকে ধমকাতে শুরু করি। কিংবা কখনো মন খারাপ করে রাখি। এমনকি স্পষ্টভাবে বলারও প্রয়োজন মনে করি না যে, কী কারণে আমি তার প্রতি মন খারাপ করেছি। নিজের স্ত্রী সন্তানদের ক্ষেত্রেও এমন হয়। অধীনস্থ কর্মচারীদের ক্ষেত্রে তো হয়-ই।

হয়ত বলব, সে তার ওজরের কথা আমাকে বলুক!

কথা ঠিক। কিন্তু কখনো তো এমনও হয় যে, সে বলার সাহস পাচ্ছে না। কিংবা ওজরটা বলার জন্য যে পরিবেশ দরকার সেটা পাওয়া যাচ্ছে না। কখনো তো ওজর বলার সাহস পরিবেশ পাওয়া যায় ঠিক, কিন্তু লোকটি হয় নিতান্ত ভদ্র কিসিমের। যে নিজ থেকে ওজর বলবেই না। আমি জিজ্ঞেস করলে বলবে।

এসব ছাড়াও কখনো তো আমরা ওজর শোনার জন্য কাল ক্ষেপণ না করেও ধমক শুরু করি। তখন বেচারা/বেচারী লজ্জায় অভিমানে আর বলেই না কিছু। কিংবা পরে যখন ওজরের কথা বলে, তখন আমরা পূর্বের ধমকের কারণে নিজেই লজ্জিত হই। সেক্ষেত্রে যদি আগেই ওজর বিষয়ে জিজ্ঞাসা করতাম, আমাকে লজ্জিত হতে হতো না।

কারও কারও ক্ষেত্রে এমনও দেখা যায় যে, গ্রহণযোগ্য ওজর শোনার পরও ধমকাতে থাকে। আর বেচারা/বেচারীর কাছে তার ধমকগুলো মনে হয় একেকটি চাবুকের আঘাত!

জানা কথা, তার এই মনোকষ্টি আগেোগাড়া আমার অকল্যাণ। তার এ মনোবেদনা প্রকৃত অর্থেই আমার ক্ষতির কারণ।

এমন কত ঘটনা নিত্যদিন ঘটে থাকে, যার কারণে আমরা পেরেশান হই। আমরা দেখি আমাদের সময়ে বরকত নেই। কাজে বরকত নেই। এদিক সেদিকের নানা অস্থিরতা। ছোট ছোট কত বালা মুসিবত।

আমরা ভাবিনা, হয়ত এর প্রতিটিই একেকটি মনোবেদনার ফল। হয়ত প্রতিটিই আমার অসচেতন বাক্যাঘাতের পরিণাম। আমার ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র অন্যায়ের পরিণতি।

সচেতন দ্বীনদার লোকেরা কিন্তু এসব ব্যাপার খুব যত্নের সাথে খেয়াল রাখে।

এমন মানুষ আমার দেখার সুযোগ হয়েছে, যিনি নির্দিষ্ট কাজ ও দায়িত্ব পালনে অবহেলা দেখেও তাৎক্ষণিক কিছু বলেননি। পরে জিজ্ঞাসা করেছেন কিংবা নিজে নিজেই বুঝতে চেয়েছেন, কেন আমি তা করতে পারিনি। এরপর যখন আমি আমার ওজর পেশ করতে গিয়েছি, তিনি আমার বক্তব্য শোনার আগেই আরও গভীর ও উপলব্ধিময় ভাষায় বিষয়টি উপস্থাপন করেছেন। তখন আবেগে মুগ্ধতায় যেন হৃদয় সঁপে দিয়েছি তাঁকে। মনের গভীরে জমা করেছি তাঁর জন্য বেহিসাব দুআ। সেই দুআ নিশ্চয়ই আল্লাহর দরবারে পৌঁছেছে। অন্তত পৌঁছবার মতো তো মনে হয়েছে। এমনকি কখনো ঈর্ষা হয়েছে। ভেবেছি, আহা এমন দুআ যদি আমিও পেতাম কারও কাছ থেকে।

মোটকথা, কাউকে কোনো শাসন ধমক বা সতর্কবাক্য বলার আগে একটু ভাবা উচিত, সত্যিই সে এই শাসন ধমকের উপযুক্ত কি না। খোঁজ নেওয়া উচিত, এক্ষেত্রে তার কোনো ওজর আছে কি না। এ বিষয়ে না ভেবে, খোঁজ খবর না নিয়ে কাউকে কিছু বললে তা আমার জন্যই ক্ষতি হয়ে দেখা দেয়। আমার জন্যই অকল্যাণ বয়ে আনে। সে হয়ত ধৈর্য ধরে বিশাল সওয়াব পায়। কিংবা ওজর পেশ করে নিজেকে নির্দোষ প্রমাণ করে। কিন্তু কখনো তো সে আমাকেও কড়া কথা বলতে পারে। তখন পরিবেশ উত্তপ্ত হতে পারে। যার পুরো দায়ই আমার। হিসাবটা মাথায় রাখা উচিত। এবং এ বিষয়ে সতর্ক হওয়া উচিত। আল্লাহ তাআলা তাওফীক দান করুন। আমীন।

জনপ্রিয় খবর