শায়খ ড. আবদুর রহমান সুদাইস।।

শিখোবাংলায়.কম: রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নবুয়ত লাভের পর ১৪ শতাব্দীরও বেশিকাল ধরে রাসুলকুল শিরোমণির আলোকিত মনোহর চরিত্রমাধুরী দিকে দিকে দেশে দেশে সুবাস ছড়িয়ে আসছে। সবাই বিমোহিত যার মহিমা ও মাধুর্যে, প্রভাব ও প্রতিপত্তিতে এবং কথা ও কাজে প্রজ্ঞার ঝলকে।

আল্লাহ তাঁর নবী (সা.) কে যেসব গুণ, মর্যাদা, শ্রেষ্ঠত্ব, মনোনয়ন ও উজ্জ্বল চয়নের মাধ্যমে বিশিষ্ট করেছেন, কলম, কালি ও কাগজে তা লিখে শেষ করতে পারবে না। বরং এসব গায় ও অনুরণিত করে সর্বদা মিনারগুলো। এসবে কম্পিত হয় মিম্বরের কাঠিগুলো। এ ব্যাপারে আমাদের রবের একটি বাণীই যথেষ্ট : ‘আমি আপনার আলোচনাকে সমুচ্চ করেছি।’ (সুরা শারহ : ৪)।

কবি বলেন,
‘তাঁর চরিতালেখ্য আলোচনায় হৃদয় জীবন্ত হয়,
যেমন বৃষ্টিতে প্রাণ ফিরে পায় বসুন্ধরা।
তাঁর স্বভাব পবিত্র, মর্যাদা সমুচ্চ,
তাঁর সবই সুন্দরম, সবই মুক্তোসম।’

তাঁর চরিত্রমাধুরীগুলো কল্যাণ, ছোট-বড় পুণ্য, পূর্ণতর হেদায়েত, সুষম ইনসাফের ধারক। তিনি (সা.) ছিলেন গঠনে-আচরণে ও চেহারা-চরিত্রে অনন্য সুন্দর। গঠনে তিনি ছিলেন উজ্জ্বল বর্ণ, নির্মল ও দীপ্তিময়। সুদর্শন ও কমনীয়। তাঁর দুই চোখ ছিল কালো ও ডাগর। চোখের পাতার প্রান্তদেশ ছিল ঘন ভ্রবিশিষ্ট। কণ্ঠ ছিল স্বরভাঙা। কাঁধ ছিল প্রশস্ত। চুল ছিল মিশমিশে কালো।

নীরব থাকলে গাম্ভীর্য ফুটে উঠত। কথা বললে সৌন্দর্য ঝরে পড়ত। দূর থেকে দেখলে মানুষের মধ্যে সবচেয়ে উজ্জ্বল ও মনোহর। কাছে থেকে দেখলে সবচেয়ে উত্তম ও চিত্তাকর্ষক। মিষ্টভাষী; একেবারে নিখুঁত একটু কমও নয়, বেশিও নয়।

ঘন শ্মশ্রুম-িত, পুরু কাঁধবিশিষ্ট, হাত ও পায়ের দুই তালু চওড়া, লিকলিকে লম্বা নন, দৃষ্টিকটু খাটোও নন। সিঁথি চুলবিশিষ্ট। যখন কথা বলতেন, মনে হতো তাঁর সামনের দাঁতগুলো থেকে আলো বের হচ্ছে।

ইমাম বোখারি (রহ.) বারা বিন আজেব (রা.) থেকে বর্ণনা করেন, তাকে জিজ্ঞাসা করা হলো, নবী (সা.) এর চেহারা মোবারক কি তরবারির মতো (চকচকে) ছিল? তিনি বললেন, ‘না, বরং চাঁদের মতো (স্নিগ্ধ ও মনোরম) ছিল।’ তিনি আরও বলেন, ‘নবী (সা.) মাঝারি গড়নের ছিলেন। তাঁর উভয় কাঁধের মধ্যবর্তী স্থান প্রশস্ত ছিল। তাঁর মাথার চুল দুই কানের লতি পর্যন্ত প্রসারিত ছিল।’ (বর্ণনায় বোখারি)।

আলী বিন আবি তালেব (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, ‘রাসুলুল্লাহ (সা.) না অতি লম্বা ছিলেন আর না (অতি) বেঁটে ছিলেন। তাঁর দুই হাত ও দুই পা ছিল গোশতবহুল, মাথা ছিল আকারে বড় এবং হাড়ের গ্রন্থিগুলো ছিল স্থূল ও শক্তিশালী। তার বুক থেকে নাভি অবধি প্রলম্বিত ফুরফুরে পশমের একটি রেখা ছিল। চলার সময় তিনি সম্মুখের দিকে ঝুঁকে হাঁটতেন, যেন তিনি ঢালবিশিষ্ট জায়গা দিয়ে হেঁটে চলেছেন। আমি তাঁর আগে কিংবা তাঁর পরে আর কাউকে তাঁর মতো দেখিনি।’ (বর্ণনায় তিরমিজি)।

জাবির বিন সামুরা (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, ‘আমি একবার পূর্ণিমা রাত্রির স্নিগ্ধ আলোতে রাসুলুল্লাহ (সা.) কে লাল চাদর ও লুঙ্গি পরিহিত অবস্থায় দেখলাম। তখন আমি একবার তাঁর দিকে ও একবার চাঁদের দিকে তাকাতে থাকলাম। মনে হলো তিনি আমার কাছে পূর্ণিমার চাদের চেয়ে অধিক সুন্দর।’

নবীজি (সা.) এর সভা কবি হাসসান বিন সাবেত তাঁর সৌন্দর্য বর্ণনা করতে গিয়ে কী চমৎকার কাব্যই না রচনা করেছেন :

‘তোমার চেয়ে সুন্দর কোনো চোখ পৃথিবীতে দেখেনি
তোমার মহৎ কোনো মাতা প্রসব করেনি।
তুমি এমন দোষমুক্ত হয়ে সৃষ্টি হয়েছ
যেন তুমি যেভাবে চেয়েছ সেভাবেই জন্ম নিয়েছ।’

ইসলামের ভাইয়েরা, সৃষ্টির সেরা মানবের প্রিয় উম্মতিরা, নবী (সা.) এর বাচন ও বাকরীতি সম্পর্কে যদি বলতে যাই, তাহলে আমরা দেখি : তিনি ছিলেন দীর্ঘ নীরবতার অধিকারী, প্রয়োজন ছাড়া কথা বলতেন না। কথা শুরু ও শেষ করতেন ‘বিসমিল্লাহ’ দিয়ে। সারগর্ভ ও সুস্পষ্ট কথা বলতেন। উম্মুল মোমিনিন আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) তোমাদের মতো চটপটে তথা অস্পষ্টভাবে তাড়াতাড়ি কথা বলতেন না, বরং তাঁর প্রতিটি কথা ছিল সুস্পষ্ট। শ্রোতারা খুব সহজেই তা হৃদয়ঙ্গম করতে পারত।’ (বর্ণনায় তিরমিজি)।

নবীজি (সা.) তাঁর সাথি-সঙ্গীদের সঙ্গে অধিকাংশ সময় মুচকি হাসিতে কথা বলতেন। আবদুল্লাহ বিন হারিস (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, ‘রাসুলুল্লাহ (সা.) এর চেয়ে বেশি মুচকি হাসি দিতে আমি আর কাউকে দেখিনি।’ তিনি আরও বলেন, ‘রাসুলুল্লাহ (সা.) শুধু মুচকি হাসিই দিতেন।’ জারির বিন আবদুল্লাহ (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, ‘আমি ইসলাম গ্রহণ করার পর রাসুলুল্লাহ (সা.) তাঁর গৃহে প্রবেশ করতে কোনোদিন আমাকে বাধা প্রদান করেননি এবং যখনই আমাকে দেখেছেন মুচকি হাসি দিয়েছেন।’ (বর্ণনায় বোখারি)।

আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, লোকেরা বলল : ইয়া রাসুলাল্লাহ! আপনি আমাদের সঙ্গে কৌতুকও করেন, তিনি বললেন : ‘আমি সত্য ব্যতীত কিছু বলি না।’

রাসুলুল্লাহ (সা.) ছিলেন মানুষের মধ্যে সর্বাধিক বিনয়ী। আনাস (রা.) বিন মালেক (রা.) থেকে বর্ণিত, এক মহিলা নবীজির কাছে এসে বলল, ইয়া রাসুলাল্লাহু! আপনার সঙ্গে আমার কিছু প্রয়োজন আছে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বললেন : ‘হে অমুকের মা! তুমি যে কোনো গলিতে ইচ্ছে বস, আমি তোমার কাছে গিয়ে বসব।’ বর্ণনাকারী বলেন, ‘অতঃপর ওই মহিলা গিয়ে বসল। তখন রাসুলুল্লাহ (সা.)ও গিয়ে বসলেন। এমনকি সে তার প্রয়োজন সেরে নিল।’ (বর্ণনায় আহমাদ)।

আনাস বিন মালিক (রা.) থেকে আরও বর্ণিত হয়েছে, তিনি বলেন, ‘রাসুলুল্লাহ (সা.) রুগ্ণ ব্যক্তিকে দেখতে যেতেন, জানাজায় হাজির হতেন, গাধায় আরোহণ করতেন। গোলামের দাওয়াতও কবুল করতেন। বনু কুরায়যার যুদ্ধের দিন তিনি একটি গাধায় সওয়ার ছিলেন, খর্জুর ছাল নির্মিত লাগাম ছিল এর মুখে আর তাতে ছিল খর্জুর ছাল নির্মিত একটি আসন।’ (বর্ণনায় তিরমিজি)।

এ হলো বর্ণাঢ্য আদর্শ ও আলোকিত চরিত্রসম্পন্ন পবিত্র রাসুল (সা.) এর আলো ও চরিতমালার সমৃদ্ধ সাগরের সামান্য ঝলক এবং সুমিষ্ট ভারী মেঘমালার এক পশলা। আল্লাহ যার সমুচ্চ মর্যাদা ও সুউচ্চ মাহাত্ম্য বর্ণনায় কথা বলেছেন।

অতএব, আপনারা নিজেদের নবীর জীবনচরিত অনুসরণ করুন। এটিই তাঁর ভালোবাসার প্রমাণ, যা সর্বোচ্চ শোভা ও মহত্তম লক্ষ্য। নিছক প্রদর্শনী, আকৃতি, সমাবেশ, অনুষ্ঠান, বিরামহীন গল্প-উপন্যাস, স্তুতি বা গান নয় তাঁর ভালোবাসা। এসব তো তাঁর ভালোবাসা প্রকাশের অসার ধরন-প্রকরণমাত্র। কবি বলেন :

‘তাদের জিজ্ঞেস কর বিশুদ্ধ ভালোবাসা ও বিবরণ সম্পর্কে,
অচিরেই তুমি সত্য সংবাদদাতাকে বলতে শুনবে
রাসুলের ভালোবাসা হলো আঁকড়ে ধরায়
তাঁর দৃশ্য-অদৃশ্য সমৃদ্ধ শরিয়ত।’

এর চেয়ে আরও পরিষ্কার ও জোরাল মহান মাওলার কথা: ‘বলে দিন, যদি তোমরা আল্লাহকে ভালোবাসো, তাহলে আমাকে অনুসরণ কর, যাতে আল্লাহও তোমাদের ভালোবাসেন এবং তোমাদেরকে তোমাদের পাপ মার্জনা করে দেন। আর আল্লাহ হলেন ক্ষমাকারী দয়ালু।’ (সুরা আলে ইমরান : ৩১)।

মোমিন ভাইরা, উম্মতের সঙ্গে তাদের রাসুলের, তাদের প্রিয়তম ও সুপারিশকারী মহামানবের এবং তাঁর সুবাসিত জীবন ও চরিত্রমাধুরীর সঙ্গে সম্পর্ক ও ভালোবাসা কোনো সময় বা উপলক্ষের সঙ্গে সম্পৃক্ত নয়, বরং এ গভীর সম্পর্ক সব প্রয়োজনে, সব অনুষঙ্গে এবং আমৃত্যু প্রতিটি অবস্থার সঙ্গে।

আমরা এই পবিত্র মিম্বর থেকে, কল্যাণ, সত্য ও শান্তির মঞ্চ থেকে বিভিন্ন দেশ ও ভূখণ্ডে অবস্থানরত সব বিশ্ববাসীর উদ্দেশে আহ্বান জানাচ্ছি : সবাই সম্মানিত রাসুলদের চরিত্রে সুশোভিত হোন, যাদের পুরোভাগে রয়েছেন বিভিন্ন ধর্মের মাঝে ব্যাপকতর শান্তি ও পূর্ণতর দয়ার আহ্বায়ক আমাদের নবী ও আমাদের প্রিয়তম রাসুল (সা.)। সবাই যেন সব ধরনের ধর্মীয় প্রতীকের অসম্মান, সাংঘর্ষিকতা, বিদ্রুপ ও ছিদ্রান্বেষণ থেকে বিরত থাকেন। যে ধর্মীয় প্রতীকগুলোর শিরোভাগে রয়েছেন নবী-রাসুলদের পবিত্র সত্তা। ‘আমরা তাঁর পয়গম্বরদের মধ্যে কোনো তারতম্য করি না।’ (সুরা বাকারা : ২৮৫)।

আমরা ১৮০ কোটি মুসলমানের পক্ষ থেকে নবী-রাসুলদের সম্মানে আঘাতের তীব্র নিন্দা জানাচ্ছি। তীব্রভাবে আমরা এসবের প্রতিবাদ করছি। বিশেষত নবীদের মধ্যে সর্বশেষজন, সরলপথ ও সৌহার্দ্যরে নবী, আমাদের নেতা, নবী, প্রিয়তম, সুপারিশকারী ও আদর্শ মুহাম্মদ (সা.) এর শানে ধৃষ্টতার। এসব ব্যঙ্গ-কার্টুন ও নিকৃষ্ট কর্মকা- আসলে এক ধরনের সন্ত্রাস। এসব ঘৃণা ও জঘন্য বর্ণবাদ উস্কে দেওয়া উগ্রতা। আর ধর্মীয় নিদর্শনাদি ও পবিত্র বস্তুগুলোকে অসম্মান ও বিদ্রুপ করা কোনোভাবেই মতপ্রকাশের স্বাধীনতার মধ্যে পড়ে না। এটা বরং শিষ্টাচার লঙ্ঘন ও সম্মানে আঘাত, যা তার ওপরই পতিত হয়। মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ভোগ করতে গিয়ে অবশ্যই মানবিক মূল্যবোধ রক্ষা করতে হবে, যা অন্যের অনুভূতিকে সম্মান দানের ওপর প্রতিষ্ঠিত। কেউ যখন এই মূল্যবোধ থেকে বের হয়ে যায়, তখন তা স্বাধীনতা, সংস্কৃতি ও ধর্মের নৈতিকতার মর্মমূলে আঘাত করে। এ ধরনের অবমাননা আসলে উগ্রবাদী চিন্তাধারীদের সেবা করে। যারা চায় মানবসমাজের ঘৃণার আবহাওয়া ছড়িয়ে দিতে। ইসলাম এটি এবং ওইসব থেকে মুক্ত। সন্ত্রাসের তকমা তার গায়ে লাগা থেকে মুক্ত। ইসলাম তো পরস্পর উদারতা, দয়া ও সম্প্রীতির ধর্ম। ইসলামে সন্ত্রাস, উগ্রবাদ ও নাশকতা এবং আল্লাহর নবীদের (আ.) প্রতি বিদ্রুপ, বিষোদ্গার বা বিভেদ সৃষ্টির কোনো সুযোগ নেই।

আমরা একইভাবে আহ্বান জানাই আবেগ ও প্রতিক্রিয়া নিয়ন্ত্রণের। প্রতিক্রিয়া ও প্রতিবাদে অনিয়ন্ত্রিত ও অপরিকল্পিত উত্তেজনা ও ঝুঁকি পরিহারের। আহ্বান জানাই পরিণতিতে দৃষ্টি দেওয়া এবং ভবিষ্যত নিয়ে ভাবার। কেননা বাস্তবতা হলো, এসব ব্যঙ্গ-বিদ্রুপ নবী-রাসুলদের এতটুকু মানহানি ঘটাতে পারবে না। আল্লাহ তায়ালা বলেন : ‘আল্লাহ আপনাকে মানুষের কাছ থেকে রক্ষা করবেন।’ (সুরা মায়িদা : ৬৭)।

অতএব, মুসলিমরা যেন এসব বিলীয়মান বুদ্ধুদের সামনে নিশ্চিত ও স্থিরচিত্ত থাকেন, এসবের মাধ্যমে তারা নিজেদের ছাড়া আর কারও ক্ষতি করছে না। ‘যদি তোমরা তাঁকে (রাসুলকে) সাহায্য না করো, তবে মনে রেখ, আল্লাহ তাঁর সাহায্য করেছিলেন।’ (সুরা তওবা : ৪০)। ‘বিদ্রুপকারীদের জন্য আমি আপনার পক্ষ থেকে যথেষ্ট।’ (সুরা হিজর : ৯৫)। ‘আর আল্লাহ নিজ কর্ম সম্পাদনে প্রবল-অপ্রতিরোধ্য; কিন্তু অধিকাংশ মানুষ তা জানে না।’ (সুরা ইউসুফ : ২১)।

১৩ রবিউল আউয়াল ১৪৪২ হিজরি মক্কার মসজিদে হারামে প্রদত্ত জুমার খুতবার ভাষান্তর আলী হাসান তৈয়ব

সূত্র: হারামাইন শরিফাইন পেইজ