শিখোবাংলায়.কম: গতকাল শুক্রবার (৬নভেম্বর) উদ্বোধন করা হলো ‘দাওয়াতুল কুরআন তৃতীয় লিঙ্গের মাদরাসা’। এটি বাংলাদেশে হিজরাদের জন্য প্রথম মাদরাসা হিসেবে যাত্রা শুরু করেছে। বলা যেতে পারে এটিই হিজরাদের প্রথম শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। এর আগে কোথাও শুধু হিজারাদের নিয়ে আলাদা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের চিন্তা কেউ করেনি। রাজধানীর কামরাঙ্গীরচর লোহার ব্রিজ পেরিয়ে একটু এগোলেই ‘দাওয়াতুর কুরআন তৃতীয় লিঙ্গের মাদরাসা’ নামের সাইনবোর্ডটি চোখে পড়বে দর্শকদের।

গতকালের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে পবিত্র কোরআন তিলাওয়াত করেন ৩০ থেকে ৩৫ জন হিজড়া। এরপর কেমন কেটেছে সারাদিন। জানতে চেয়েছিলাম মাদরাসার একজন শিক্ষকের কাছে।

তিনি জানান, ‘মাদরাসাটির বয়স প্রায় ৬ মাস। তবে গতকাল শুধু  উদ্বোধন হয়েছে। ক্লাস চলছে আর আগে থেকেই। যার কারণেই গতকাল হিজরারা সুরা ফাতিহা মুখাস্থ শোনাতে পেরেছে। না হয় তারা ধরেই এতো সুন্দর করে পড়তে পারতো না। আর মিডিয়ায় প্রচারিত হয়েছে গতকাল।’

সে হিসেবে গতকাল আগের মতোই হিজরা শিক্ষার্থীরা তাদের পড়ায় মনোযোগ দেয়। তাদের জন্য যেসব প্রশিক্ষক ও শিক্ষকগণ রয়েছেন তারা তাদের সুরা মশক করান। এরপর প্রতিদিনের মতো তারা তাদের থাকার জায়গায় (আস্তানা) ফিরে যান। মূলত মাদরাসা প্রতিষ্ঠা হয়েছে পরে। এর আগে হিজরাদের বাসায় গিয়ে তাদের পড়ানো হতো।’

তিনি আরও জানান, ‘আজ থেকে ফরমের মাধ্যমে আনুষ্ঠানিক ভর্তির কাজ শুরু হবে। ভর্তির পর আবাসিক-অনাবাসিক, ডে-কেয়ার সিস্টেম হিজরাদের সুবিধামতো সময়ে চালু করা হবে।’

গতকালের উদ্ধোধনী অনুষ্ঠানে হিজরারা সাংবাদিকদের তাঁদের যাপিত জীবনের কষ্টের কথা তুলে ধরে বলেন, আমরাদের কষ্ট এখন অনেকাংশে কমে যাবে বলে আমরা মনে করি।

মাদরাসার প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক মুফতি মুহাম্মাদ আবদুর রহমান আজাদ। গণমাধ্যমকে দেয়া সাক্ষাতকারে বলেন, ‘‌হিজড়ারা স্কুলে যেতে পারে না, কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় তো অনেক দূরের কথা। তাদের কেউ কোনো কাজও দেয় না। অনন্যোপায় হয়ে যখন তারা ‌বিশৃঙ্খলা করে, তখন সবাই তাদের উৎপাত মনে করে। এই দোষ আমার নিজের, সমাজের, রাষ্ট্রের।’ মূলত এই চিন্তা থেকেই হিজড়াদের জন্য তিনি মাদরাসা চালুর উদ্যোগ নেন।

দেশের প্রথমসারির একটি গণমাধ্যমকে দেয়া সাক্ষাতকারে মাদরাসার শিক্ষক মাওলানা আবদুল আজিজ হোসাইনী বলেন, ‘ছয়-সাত মাস ধরে তাঁরা হিজড়াদের সংগঠনের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করছিলেন। একদিন খবর পান বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউতে হিজড়া কল্যাণ ফাউন্ডেশন আছে। ওই ফাউন্ডেশনের সভাপতি আবিদা সুলতানার সঙ্গে কথা বললে তিনিই যোগাযোগের ব্যবস্থা করে দেন। এরপরই উত্তরা, বাড্ডা, গুলিস্তান, যাত্রাবাড়ী, কামরাঙ্গীরচর, কেরানীগঞ্জ ও বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউয়ের কয়েকটি কেন্দ্রে আবদুর রহমান আজাদ ও মাদ্রাসার অন্য শিক্ষকেরা পবিত্র কোরআন পড়াতে শুরু করেন। গতকাল থেকে তাঁরা মাদ্রাসা চালু করলেন। তৃতীয় লিঙ্গের যে কেউ এখানে ভর্তি হতে পারবেন।’

উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে সভাপতিত্বও করেন আবিদা সুলতানা। উপস্থিত ছিলেন ৫৭ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর সাইদুল ইসলাম মাতবর ও স্থানীয় পুলিশ ফাঁড়ির সদস্যরা।

মাদরাসার অর্থায়ন কে করছেন, জানতে চাইলে মুফতি আবদুর রহমান আজাদ বলেন, মরহুম আহমেদ ফেরদৌস বারী চৌধুরী ফাউন্ডেশন তাঁদের অর্থায়ন করেছে। তাঁরা সরকার বা বেসরকারি অন্য কোনো প্রতিষ্ঠান থেকে আর্থিক সহায়তা চাননি। এ উদ্যোগ থেকে তাঁরা কোনো লাভ চান না। তাঁদের ভাষায়, একমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য তাঁরা কাজটা করতে চান। কেউ সহায়তা করতে চাইলে করতে পারেন। মাদরাসায় এই মুহূর্তে দশজন শিক্ষক আছেন।

বাংলাদেশে সরকারি হিসাবে, হিজড়ার সংখ্যা ১০ হাজার। যদিও হিজড়াদের সংগঠনগুলো বলছে, তাঁদের সংখ্যা লাখ দেড়েক। সাম্প্রতিক বছরগুলোয় হিজড়াদের সমাজের মূল ধারায় সম্পৃক্ত করার দু-একটি উদ্যোগ চোখে পড়ে। কিন্তু মোটের ওপর হিজড়াদের বড় অংশের শিক্ষণ-প্রশিক্ষণের দিকে নজর নেই রাষ্ট্রের, এমন অভিযোগ রয়েছে!