হাজী মোহাম্মদ দানেশ এর জীবনী

25

“হাজী মোহাম্মদ দানেশ”
প্রবীণরা হয়তো ভুলেই গেছেন, আর নবীনদের বেশিরভাগতো জানেই না দিনাজপুরে জন্ম নিয়েছিলেন কিংবদন্তি কৃষক নেতা হাজী মোহাম্মদ দানেশ। তার বাড়ি বা তার মাজার কোথায় তাও জানা নেই অনেকের।

অপরদিকে, দিনাজপুর গোর-এ-শহীদ বড় ময়দানে অবহেলা আর অযত্নে পড়ে আছে এ ঐতিহাসিক তেভাগা আন্দোলনের নেতা হাজী মোহাম্মদ দানেশের মাজারটি। এই মাজার চত্বরে নেই কোনো সাইন বোর্ড কিংবা নাম ফলক। পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতার অভাবে জঙ্গলে পরিণত হয়েছে মাজার চত্বরটি। অনেক সময় এ চত্বরে ঘটছে অসামাজিক কার্যকলাপ।

দিনাজপুরের তথা বাংলাদেশের রাজনীতিক গৌরব, পাক-ভারত উপমহাদেশের বৃটিশ বিরোধী আন্দোলনের নেতা, ঐতিহাসিক তেভাগা আন্দোলনের কিংবদন্তি প্রখ্যাত কমিউনিস্ট নেতা, ভাষা সৈনিক, মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক হাজী মো. দানেশ। যে নামটি মেহনতি, মুক্তিকামি, শোষিত মানুষের অনুপ্রেরণার প্রতিক। সেই কিংবদন্তিতুল্য এই মানুষটি শুধু দিনাজপুর নয়, এই নেতা দিনাজপুরের গণ্ডি পেরিয়ে সারা দেশ তথা সারা উপমহাদেশে শোষিত ও নির্যাতিত মানুষের মুক্তির প্রতীক হিসেবে আবির্ভুত হোন।
এই রাজনৈতিক নেতার নামে দিনাজপুরে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে হাজী মোহাম্মদ দানেশ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় ও গ্রামের বাড়ি বোচাগঞ্জ উপজেলার সুলতানপুর গ্রামে রয়েছে একটি কলেজ।

এতটুকুতে সন্তুষ্ট নন তার পরিবারের সদস্যরা ও দিনাজপুরের মানুষ। এই জেলার মানুষের দাবি মহান এই নেতার মুরাল স্থাপন করার।

বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়ন (বিএফইউজে) যুগ্ম মহা সচিব শাহাদৎ হোসেন শাহ জাগো নিউজকে বলেন, এই মহান নেতার নামে হাজী মোহাম্মদ দানেশ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হলেও বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ দেশ বরেণ্য এই নেতার জন্ম কিংবা মৃত্যু বাষির্কী কোনোটাই পালন করে না। বিশ্ববিদ্যালয় চত্বরে নেই কোনো ভাস্কর্য। তিনি আরো বলেন, এই বিশ্ববিদ্যালয়ে এখন পিএইচ ডি করছেন অনেকে। কিন্তু যার নামে এ প্রতিষ্ঠান তাকে নিয়ে কেউ কোনো গবেষণা করছে না। তিনি বিশ্ববিদ্যালয় চত্বরে হাজী দানেশের ভাস্কর্য স্থাপনের দাবি জানান।

হাজী মোহাম্মদ দানেশের নাতি ঠাকুরগাঁও সদরের সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান সুলতান ফেরদৌস ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, আমরা পরিবারের সদস্যরা দিনাজপুর গোর-এ-শহীদ বড় ময়দানে নানাকে কবর দেয়ার পক্ষে ছিলাম না। সে সময় সাবেক প্রেসিডেন্ট হোসাইন মোহাম্মদ এরশাদের সিদ্ধান্তেই নানার কবর সেখানে হয়। একটি সুন্দর মাজারও করা হয়েছে। কিন্তু এর রক্ষণাবেক্ষণ নেই।

তিনি জাগো নিউজকে বলেন, মাজার চত্বরে কোনো সাইনবোর্ড না থাকা এবং নাম ফলক ফাঁকা থাকা কোনোভাবেই মেনে নেয়া যায় না। সাম্প্রতিক সময়ে তিনি দিনাজপুরে এসে নানার মাজারে সাইনবোর্ড ও নাম ফলক লাগিয়ে যাবেন। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ গত দু বছর আগে একটি ম্যাগাজিন প্রকাশ করেছে। যাতে হাজী মোহাম্মদ দানেশের এক ছেলেও দুই মেয়ে লেখা হয়েছে। প্রকৃত পক্ষে হাজী মোহাম্মদ দানেশর এক ছেলে ও তিন মেয়ে হবে। এটি সংশোধন চেয়ে তিনি বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষকে লিখিত চিঠি দিলেও সংশোধন করা হয়েছে কি না তা তাকে জানানো হয়নি।
তিনি বরেণ্য এ নেতার জন্ম ও মৃত্যুবার্ষিকী বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষকে আনুষ্ঠানিকভাবে প্রতি বছর পালন করার অনুরোধ জানান।

হাজী মোহাম্মদ দানেশ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস চ্যান্সেলর প্রফেসর রুহুল আমিন জাগো নিউজকে বলেন, হাজী মোহাম্মদ দানেশের নামে ওয়েব সাইট রয়েছে। আমরা তার প্রতি সম্মান রেখে তাকে স্মরণ করে থাকি।

অ্যাফ্রো এশিয়ার আরেক নেতা স্বাধীন বাংলাদেশের স্বপ্নদ্রষ্টা মজলুম জননেতা মাওলানা আব্দুল হামিদ খাঁন ভাষানীর অন্যতম ঘনিষ্ঠ সহচর হাজী মোহাম্মদ দানেশের জন্ম তদানিন্তন বৃটিশ ভারতের প্রাচীনতম জেলা দিনাজপুরের বোচাগঞ্জ উপজেলার সুলতানপুর গ্রামে ১৯০৩ সালে। বাবার নাম ছিল মৌলভী সালামত উদ্দীন। ১৯২৩ সালে তিনি প্রথম বিভাগে প্রবেশিকা পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হোন। রাজশাহী কলেজ থেকে বি.এ পাশ করার পর তিনি এক বছর দিনাজপুর জুনিয়র মাদ্রাসায় প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব পালন করেন। পরে তিনি উচ্চ শিক্ষার্থে আলীগড় গমন করেন। সেখানকার মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ১৯৩১ সালে এম,এ ও ১৯৩২ সালে এল,এল,বি ডিগ্রি লাভ করেন। ১৯৩৩ সালে দিনাজপুর জজ কোর্টে আইন ব্যবসা শুরু করেন।

১৯৩৮ সালে হাজী মোহাম্মদ দানেশ সক্রিয় রাজনৈতিক জীবনে প্রবেশ করেন। ওই বছর তিনি ন্যাপ এর প্রথম সহ-সভাপতি ও পাকিস্তান ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টির সিনিয়র সহ সভাপতি নির্বাচিত হোন। ১৯৫৮ সালে সামরিক আইন জারি ও রাজনৈতিক তৎপরতায় গ্রেফতার করা হয় তাকে। বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামে তিনি সক্রিয় ভূমিকা রাখেন। ১৯৭২ সালে তিনি বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টিতে (লেলীন বাদী) যোগদান করেন। তিনি পূর্বেও কমিউনিস্ট আন্দোলনকে মনে প্রাণে ধারণ করেছিলেন।

১৯৭৩ সালের ডিসেম্বর মাসে তিনি অন্যান্য বাম পন্থীদের একত্রিত করে জাতীয় গণমুক্তি ইউনিয়ন গঠন করেন এবং এই সংগঠনের সভাপতি নির্বাচিত হোন। ১৯৭৫ সালে দেশে সকল রাজনৈতিক দল নিষিদ্ধ করে বাকশাল গঠন করা হলে তিনি বাকশালে যোগদান করেন। এর পূর্বে হাজী দানেশ যখন প্রথম সক্রিয় রাজনৈতিক জীবনে প্রবেশ করেন তখন তিনি কমিউনিস্ট পার্টির উদ্যোগে গঠিত জেলা কৃষক সমিতির সদস্য হোন।

ভারতের কমিউনিস্ট পার্টির প্রতিষ্ঠাতা কমরেড মুজাফফর আহাম্মদের দ্বারা তিনি গভীরভাবে প্রভাবিত হয়েছিলেন। ১৯৩৮ ও ১৯৪২ সালে কৃষক আন্দোলন গড়ে তোলার অপরাধে দুইবার তাকে কারাবন্দি করা হয়। এসময়ে হাট বাজারে টোল আদায় করে ও জমিদারি প্রথা উচ্ছেদের দাবিতে তিনি তুমুল আন্দোলন গড়ে তোলেন।

১৯৪২ সালে রংপুরের (বর্তমান নীলফামারী) ডোমারে বঙ্গীয় কিষাণ সম্মেলন অনুষ্ঠানের তিনি ছিলেন প্রধান উদ্যোক্তা। এই সম্মেলনে তিনি নিখিল ভারত কিষাণ সভার সভাপতি নির্বাচিত হোন।
দ্বিতীয় বিশ্ব যুদ্ধে হাজী মোহাম্মদ দানেশ দিনাজপুর-রংপুর ও জলপাইগুড়িসহ সারা উত্তরাঞ্চলে কৃষকদের এক জঙ্গি আন্দোলনের নেতৃত্ব দেন। উপমহাদেশে এ আন্দোলন ঐতিহাসিক তেভাগা আন্দোলন নামে বিখ্যাত হয়ে আছে। পূর্বে ১৯৪৫ সালে হাজী দানেশ মুসলীম লীগে যোগ দিয়েছিলেন।

১৯৪৬ সালে তেভাগা আন্দোলনে নেতৃত্ব দেয়ার কারণে মুসলিম লীগ থেকে বহিষ্কৃত হোন। সঙ্গে সঙ্গে তাকে গ্রেফতার করা হয়। ১৯৪৭ সালে তিনি মুক্তি পান। ওই বছরই তিনি দিনাজপুর এস, এন কলেজে ইতিহাসের অধ্যাপক হিসেবে যোগদান করেন। ১৯৫৩ সালে পাকিস্তানের গণতান্ত্রিক দল গঠিত হলে তিনি ওই দলের সভাপতি নির্বাচিত হোন। এ কারণে তাকে গ্রেফতার করা হয়। একই বছরে তিনি মুক্তি পান। ওই বছরই তিনি দিনাজপুর এস, এন কলেজে যোগদান করেন।

১৯৫৪ সালে যুক্তফ্রন্টের অংশীদার হিসেবে তার দল তদানীন্তন পূর্ব পাকিস্তান প্রাদেশিক পরিষদে ১৪টি আসন লাভ করে। তিনি নিজেও নির্বাচিত হোন। পরর্তীতে যুক্তফ্রন্টের মন্ত্রিসভা ভেঙে দিলে অন্যান্যদের সঙ্গে তাকেও গ্রেফতার করা হয়। ১৯৫৬ সালে তিনি মুক্তি লাভ করেন এবং ১৯৫৭ সালে মাওলানা ভাসানীর ন্যাপ’এ যোগ দেন। তিনি পূর্ব পাকিস্তান ন্যাপ এর সভাপতি নির্বাচিত হোন। ১৯৭৫ সালে বাকশাল সরকারের পতন হলে জাতীয় গণমুক্তি ইউনিয়ন পুনরূজ্জীবিত করেন। তিনি গণতান্ত্রিক পার্টির অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা। গণতান্ত্রিক পার্টি জাতীয় ফ্রন্টের শরিক ছিল। এই ফ্রন্ট পরে জাতীয় পার্টিতে রূপান্তরিত হলে তিনি জাতীয় কৃষক পার্টির প্রধান উপদেষ্টা মনোনীত হন। একবার তিনি জাতীয় পার্টির টিকিটে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। বর্ণাঢ্য রাজনৈতিক জীবনের অধিকারী এই মানুষটি ২৮ জুন ১৯৮৬ সালে ভোর ৪টা ২৫ মিনিটে ঢাকার পিজি হাসপাতালে ইন্তেকাল করেন। তিনি মৃত্যুকালে ১ ছেলে ও ৩ মেয়ে রেখে যান।

পূর্ণ সামরিক মর্যাদায় এ নেতাকে দিনাজপুরে দাফন করা হয়। বর্তমানে দিনাজপুর বড় ময়দানে এ কিংবদন্তি নেতার মাজার বিদ্যমান।

হাজী মোহাম্মদ দানেশ সারাটা জীবনই শোষিত ও মেহনতি মানুষের অনুপ্রেরণার উৎস হয়ে থাকবেন। দিনাজপুরের বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়টি প্রথমে হাজী মোহাম্মদ দানেশের নামে `হাজী মোহাম্মদ দানেশ কৃষি কলেজ` হিসেবে যাত্রা শুরু করে। বর্তমানে এটি তার নামেই বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে। এ ছাড়াও তার নামে দিনাজপুরের বোচাগঞ্জ উপজেলার সুলতানপুরে একটি কলেজও রয়েছে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here