সফর মাসের আমল ও কিছু কথা

18

শিখো বাংলায়ঃ চন্দ্রবর্ষ বা হিজরীবর্ষের দ্বিতীয় মাস সফর। এ মাস নিয়ে জাহেলি যুগে আরবদের যথেষ্ট ভুল ভাবনা ছিল। সফর আরবি শব্দ। ‘সিফর’ মূল ধাতু থেকে উদ্ভূত হলে ‘সফর’ অর্থ হবে শূন্য, রিক্ত। আর ‘সাফর’ ক্রিয়া মূল থেকে উৎপন্ন হলে অর্থ হবে হলুদ, হলদেটে, তামাটে, বিবর্ণ, ফ্যাকাশে, ঔজ্জ্বল্যশূন্য, দীপ্তিহীন, রক্তশূন্য ইত্যাদি। (লিসানুল আরব, ইবনু মানযুর র.)।

মানুষ সাধারণত অবস্থার সঙ্গে মিলিয়ে সময়কে মূল্যায়ন করে। মানুষের অবস্থা শোচনীয় হলে বলে, আমার সময়টা ভাল যাচ্ছে না। বাংলাদেশে চৈত্র মাসে কৃষকদের হাত খালি থাকে। এ সময় কৃষকরা খরা এবং অভাবের একটা সময় পার করে। তেমনি আরবে তখনকার সময়ে সফর মাসে খরা দেখা দিত। খাদ্যাভাব, আকাল ও মঙ্গা সময় পার করত তারা। মাঠ-ঘাট শুকিয়ে বিবর্ণ হয়ে যেত। স্বাভাবিকভাবে আমাদের তুলনায় আরবের উত্তপ্ততা, রোদের প্রখরতা বেশি থাকে। সফর মাসে প্রচণ্ড উত্তপ্ততা এবং খরার ফলে, ক্ষুধার্ত মানুষের চেহারাগুলো রক্তশূন্য ও ফ্যাকাশে হয়ে পড়ত।

মরুভূমির দেশ হওয়ায় আরবরা নিজেদের দেশে তেমন কিছু উৎপন্ন করতে পারে না। ভোগ্য সামগ্রী অন্য দেশ থেকে আমদানি করতে হয়। তাদের বাণিজ্যিক সফর যদি কখনো সফর মাসে পড়ে যেত তাহলে তারা একে অমঙ্গল হিসেবে গণ্য করতো। অভাবের মাস হিসেবে নিজেদের অবস্থার সঙ্গে মিল রেখে একটি বিশেষণ যুক্ত করে বলত, “আস সাফারুল মুসাফফার” অর্থাৎ ‘বিবর্ণ সফর মাস’। জাহেল আরবদের কাছে এই মাসটি দুঃখের। এ মাসের চাঁদও দেখতো না তারা এবং দ্রুত মাস শেষ হওয়ার জন্য অপেক্ষা করত।

ইসলামি বিশ্বাস মতে, সময়ের সঙ্গে কোনো অকল্যাণ নেই। কল্যাণ-অকল্যাণ নির্ভর করে মানুষের বিশ্বাস ও কর্মের উপর। তাই ইসলাম আসার পর নেতিবাচক বিশেষণ পরিহার করে একটি সুন্দর ইতিবাচক বিশেষণ যুক্ত করে এর নামকরণ করল “আস সাফারুল মুজাফফার” অর্থাৎ ‘সাফল্যের সফর মাস’।

ইসলাম এতে একটি বর্ণ পরিবর্তনের সাথে সাথে একটি বিশ্বাস ও সংস্কৃতির পরিবর্তন করে। এতে ইসলামি সাহিত্যের মাহাত্ম্য ও তাৎপর্য ফুটে উঠে। ইতিবাচক চিন্তা ও সৃজনশীল কর্মকাণ্ড দ্বারা এই বিবর্ণ সফরকে বর্ণময় করে তোলাই ছিল ইসলামের অন্তর্নিহিত দর্শন।

আল্লাহর সৃষ্ট প্রতিটি দিন ও মাসই অত্যন্ত ফজিলতপূর্ণ। মানুষের জীবন, সময়েরই একটা সমষ্টি। আর সফর মাসও জীবনেরই অংশবিশেষ। সুতরাং সফর মাস কেন এই ফজিলত এবং বরকত শূন্য হবে? অতএব আল্লাহ তাআলার রহমত ও বরকত পেতে হলে এ মাসেও বেশি বেশি আমল করা। ফরজ, ওয়াজিব ও সুন্নত যথাযথভাবে আদায় করার পাশাপাশি নফল ইবাদতে মশগুল থাকা।

আল্লাহ রাব্বুল আলামিন পবিত্র কোরআন মাজিদে বলেছেন, ‘মহাকালের শপথ, মানুষ অবশ্যই ক্ষতিগ্রস্ত; কিন্তু তারা নয়, যারা ইমান আনে ও সৎকর্ম করে এবং পরস্পরকে সত্যের উপদেশ দেয় ও ধৈর্যের উপদেশ দেয়।’ (সুরা-১০৩ আসর, আয়াত: ১-৩)।

এই সুরার শুরুতে আল্লাহ তাআলা সময়ের শপথ করেছেন। আর আল্লাহ তাআলা কোন বিষয়ের কসম খাওয়ার একটি ব্যাখ্যা হলো আল্লাহর কাছে এর অনেক গুরুত্ব রয়েছে। সুতরাং বোঝাই যাচ্ছে সময় আল্লাহ তাআলার কাছে খুবই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।

অতঃপর আয়াতের মাঝে বিশ্বাস, সৎকর্ম, সদুপদেশ ও ধৈর্যকে সাফল্যের নিয়ামক রূপে বর্ণনা করেছেন। এই হলো ইসলামি সফলতা-ব্যর্থতার মূল কারণ। যাতে কোনো সময়কে অমঙ্গল রূপে চিত্রায়িত করা হয়নি। বরং সময়কে সফলতার সিঁড়ি হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

হাদিসে আছে, আম্মাজান উম্মে সালমা রা. বলেন, একদা রাতে নবীজি সা. জাগ্রত হয়ে বললেন, সুবহানাল্লাহ! এ চমৎকার সুন্দর রাত! এতে কত-না বিপদ আপতিত হয়; আর এতে কত-না রহমতের ধনভান্ডার খুলে দেওয়া হয়। (বুখারি, প্রথম খণ্ড, হাদিস নম্বর ১১৬)।

রাত আল্লাহরই সৃষ্টি, এতে মঙ্গল-অমঙ্গল উভয় নিহিত। অর্জিত ফলাফল নির্ধারিত হবে মানুষের কর্মের ওপর ভিত্তি করে। এ রাতের সুবাদে মানুষের জীবনে ভালো বা মন্দ দুটোই ঘটতে পারে। মানুষ ইচ্ছা করলে মঙ্গল কর্ম সম্পাদন করতে পারে অথবা অমঙ্গল। হাদিসে আছে। কোনো অশুভ-অযাত্রা নেই, কোনো ভূতপ্রেত বা অতৃপ্ত আত্মার অশুভ ক্ষমতা নেই এবং সফর মাসের অশুভ কোনো কিছুর অস্তিত্ব নেই।’ (বুখারি, পঞ্চম খণ্ড, হাদিস নম্বর ২১৫১,২১৬১, ২১৭১ ও ২১৭৭)।

সফরের কিছু আমল: প্রতি চন্দ্রমাসে নির্দিষ্ট কিছু আমল থাকে। সে আমলগুলো সফর মাসে করা যেতে পারে। ১৩, ১৪ ও ১৫ তারিখে আইয়ামে বিদের তিনটি রোজার ইহতিমাম করা।

প্রতি মাসে ৩টি সিয়াম পালন করার কথা হাদিসে উল্লেখ রয়েছে। হাদিসের ভাষ্য, আব্দুল্লাহ ইবনে আ’মর ইবনে আ’স রা. হতে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সা. বলেছেন, “প্রতি মাসে তিনটি করে সিয়াম পালন, সারা বছর ধরে সিয়াম পালনের সমান” (বুখারীঃ ১১৫৯, ১৯৭৫

প্রতি সপ্তাহে সোমবার ও বৃহস্পতিবার রোজা রাখার অভ্যাস করা। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ দুই দিন বিশেষ রোজা রাখতেন। সর্বোপরি ফরজ, ওয়াজিব ও সুন্নতে মুয়াক্কাদা যথাযথ পালন করার সাথে সাথে নফল দান সদকার প্রতি মনোযোগী হওয়া। নতুন মাসে বরকতের চাঁদ দেখে দোয়া পাঠ করা। আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে আমলগুলো যথাযথ আদায় করার তৌফিক দান করেন। আমিন।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here