‘রুহানী সাহাবা’ বিতর্ক : কলরব নয় বরং এর ব্যবহার নিয়ে আলোচনা দরকার

21

শিখো বাংলায়ঃ জাতীয় ইসলামী সাংস্কৃতিক সংগঠন ‘কলরব’ শিল্পীগোষ্টি কর্তৃক গত২১ আগষ্ট তারিখে প্রকাশ হওয়া ‘রুহানী সাহাবা’ শিরোনামে কওমী মাদরাসার ছাত্রদের নিয়ে একটি সংগিত সম্পর্কে সম্প্রতি সোশ্যাল মিডিয়ায় আলোচনা-সমালোচনা শুরু হয়েছে।

আলোচনাটি ব্যাপকভাবে বিস্তৃত হয়েছে শায়খুল হাদিস আল্লামা আজিজুল হক রহ. এর সাহেবজাদা বাংলাদেশ খেলাফত যুব মজলিসের সভাপতি মাওলানা মামুনুল হকের একটি আলোচনায় বিষয়টি আসার পর। তিনি তার আলোচনায় বলেছেন – ‘রুহানী সাহাবা’ বলতে কোনো পরিভাষা ইসলামে নেই। আলোচনাটি শুনতে ক্লিক করুন এখানে

অপরদিকে বাংলাদেশের প্রতিথযশা দু’জন আলেম আল্লামা আহমদ শফী ও আল্লামা মাহমূদুল হাসানের বরাতে অনেকে দাবি করেছেন – তারা মাদরাসার ছাত্রদের ব্যাপারে ‘রুহানী সাহাবা’ শব্দের ব্যবহার করেছেন। তবে পাবলিক ভয়েসের পক্ষ থেকে তাদের কাছ থেকে বিষয়টি নিশ্চিত হওয়া যায়নি।

আলোচিত এ বিষয়টি নিয়ে তরুণ প্রতিনিধিত্বশীল আলেম, ঢাকার প্রশিদ্ধ ইসলামী শিক্ষাকেন্দ্র জামিয়া সাঈদিয়া কারিমীয়ার শিক্ষক মুফতী রেজাউল করীম আবরার একটি বিশদ বিশ্লেষণ লিখেছেন।

বিশ্লেষণে তিনিও রুহানী সাহাবি শব্দের ব্যবহারে আপত্তি করেছেন তবে কলরবকে এ বিষয়ে দোষারোপ করার পক্ষে তিনি নন বলেও জানিয়েছেন।

এ বিষয়ে তার বিশ্লেষণটি পাঠকের জন্য হুবহু তুলে ধরা হলো –

…. এবার আসি কলরব প্রসঙ্গে। এ গানটির কারণে কেউ কেউ কলরবকে ধুয়ে দিচ্ছেন। এখানে কলরবকে দোষারোপ করা ঠিক না। সংগীত রিলিজ হওয়ার সাথে সাথে আমি বদরুজ্জামান ভাইয়ের সাথে যোগাযোগ করি। তিনি স্পষ্ট বললেন, আমারও খটকা লেগেছিল। গীতিকারকে জিজ্ঞাসা করলে তিনি মাহমুদ সাহেব, আহমদ শফি সাহেবদের রেফারেন্স দিয়েছেন। এজন্য তারা সংগীতটি গেয়েছেন।

আমরা ইলমে নববীর ‘রুহানী সাহাবা’। সাহাবা ইসলামি শরিয়তের একটি বিশেষ পরিভাষা। রয়েছে এর নিজস্ব সংজ্ঞা। প্রথমত আমাদের জানতে হবে সাহাবা কাদের বলা হয়? যারা রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে দেখেছেন এবং ঈমানের অবস্থায় মৃত্যুবরণ করেছেন।

যদি কেউ পুরো জীবনে মাত্র একবার  রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে দেখেন, তিনিও সাহাবি। এখানে খুব ভাল করে একটি জিনিস খেয়াল রাখতে হবে। সাহাবি হওয়ার জন্য রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে কোন হাদিস বর্ণনা করা শর্ত নয়।

রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন ইন্তেকাল করেন, আবু জুরআ রাযি,  হাফিজ ইবনে হাজার আসকালানি সহ সকলের মতে সাহাবাদের সংখ্যা ছিল লাখের অধিক। ইবনুল আছির রাহি. এর গণনামতে এর থেকে আনুমানিক ১৮ শত সাহাবি রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে হাদিস বর্ণনা করেছেন।

এর বাহিরে হাজার হাজার সাহাবি এমন আছেন, যারা একটি  হাদিসও বর্ণনা করেননি, কিন্তু তারপরও তারা সাহাবি। এর থেকে একটি বিষয় স্পষ্ট হয়েছে যে, সাহাবি হওয়ার সম্পর্ক ইলম বা  হাদিস বর্ণনার সাথে নয়। অবশ্য সাহাবাদের মাঝে  মর্যাদার ক্ষেত্রে বিভিন্ন স্তর রয়েছে।

আরেকটি মূলনীতি মাথায় রাখা চাই। শরিয়তের যে সমস্ত পরিভাষা খায়রুল কুরুন থেকে বর্ণিত হয়ে আসছে, উদাহরণস্বরুপ   নবী, রাসুল, সাহাবা  ইত্যাদির কথা বলতে পারি। সেগুলোতে কিন্তু শাব্দিক অর্থ বিবেচনা করে নতুন পরিভাষা আবিষ্কারের সুযোগ নেই। উদাহরণস্বরুপ নবী এর শাব্দিক অর্থ সংবাদদাতা। কেউ কোন কিছুর সংবাদ দিলেই শাব্দিক অর্থ বিবেচনা করে নবী বলা যাবে না। কারণ, এটি শরিয়তের একটি বিশেষ পরিভাষা।

সাহাবি শরিয়তের একটি বিশেষ পরিভাষা। সাহাবি হওয়ার সাথে ইলম বা তালাবুল ইলমের কোন সম্পর্ক নেই। এর সম্পর্ক হলো রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে সরাসরি দেখা এবং ঈমানের সাথে মৃত্যুবরণের সাথে। সুতরাং রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর ইন্তেকালের পর আর কেউ সাহাবি হওয়ার সম্ভাবনা নেই। রতন আল হিন্দি সহ কেউ কেউ সাহাবি হওয়ার দাবি করেছিল। কিন্তু তারা মিথ্যুক হয়ে ইতিহাসের আস্তাকুড়ে নিক্ষিপ্ত হয়েছে।

‘রুহানী সাহাবা’ একটি নতুন পরিভাষা। মূলত যারা হাদীস পড়ে,  কেউ কেউ বিভিন্ন ব্যাখ্যা করে তাদের রুহানী সাহাবা’ বলে থাকেন।  প্রথম কথা হলো, হাফিজুল হাদিস, জরাহ তাদিলের ইমামগণ কেউই এ ধরণের স্পর্শকাতর পরিভাষা ব্যবহার করেন নি।

এছাড়া ‘রুহানী সাহাবা’ এর শাব্দিক অর্থ হলো, আত্মিক সাহাবা। এরপর ব্যাখ্যা করা হচ্ছে যে, হাদিস বা ইলম অর্জন করলে তাদের রুহানী সাহাবা বলা যাবে। প্রথমত, সাহাবির সংজ্ঞার দিকে তাকালে এ ব্যাখ্যার অসারতা সহজেই বুঝে আসে। কারণ, হাদিস পড়া বা ইলম অর্জনের সাথে সাহাবি হওয়ার কোন সম্পর্ক নেই।

এছাড়া এটি একটি ব্যাখ্যা সাপেক্ষ ব্যাপার। অনেক জনসাধারণ এমন আছে, যারা এত ব্যাখ্যা বিশ্লেষণের দিকে না গিয়ে মনে করবে, দাওরা হাদিস পড়লেই মানুষ রুহানী সাহাবি হয়ে যাবে! এরদ্বারা শরিয়তের একটি স্পর্শকাতর পরিভাষা সহজেই বিকৃত হয়ে যাচ্ছে!

যেহেতু ব্যাপারটি ইবাদত সংক্রান্ত নয়, এজন্য হারাম বলতে হলে অকাট্য নসের প্রয়োজন। বাকি হাদিসের কয়েকটি কিতাব পড়লেই রুহানী  সাহাবা হয়ে যাওয়ার দাবি করা একেবারেই অনূচিত বিষয়। এছাড়া  নতুন পরিভাষাটি জনসাধারণের অন্তরে নানা প্রশ্নের জন্ম দিবে, এজন্য এটি পাবলিক প্লেসে ব্যবহার না করাই উচিত।

এবার আসি কলরব প্রসঙ্গে। এ গানটির কারণে কেউ কেউ কলরবকে ধুয়ে দিচ্ছেন। এখানে কলরবকে দোষারোপ করা ঠিক না। সংগীত রিলিজ হওয়ার সাথে সাথে আমি বদরুজ্জামান ভাইয়ের সাথে যোগাযোগ করি। তিনি স্পষ্ট বললেন, আমারও খটকা লেগেছিল। গীতিকারকে জিজ্ঞাসা করলে তিনি মাহমুদ সাহেব, আহমদ শফি সাহেবদের রেফারেন্স দিয়েছেন। এজন্য তারা সংগীতটি গেয়েছেন।

এখন যেহেতু আলোচনা শুরু হয়েছে, তাই কলরব কর্তৃপক্ষ আশা করি শাস্ত্রজ্ঞ আলেম যারা আছেন, প্রয়োজনে তাদের মতামত নিবেন। মাওলানা আবদুল মালেক সাহেব এবং মুফতি দিলাওয়ার সাহবদের মতামত নিয়ে তারা শব্দ পরিবর্তনের কথা  বললে সেটাই করা উত্তম।

কলরবের গজলটি দেখুন :

 

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here