মুফতী মাসউদুর রহমান ওবাইদী

প্রশ্নঃ  রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) মাটির তৈরি না নূরের তৈরি?

উত্তরঃ হুযূর (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) মাটির তৈরী ছিলেন,নূরের তৈরী নয়৷ তবে তার মাটির শরীরের মধ্যে যথেষ্ট নূরের সংমিশ্রণ ছিল৷এটা মাটির তৈরী মানুষ জাতের হওয়ার পরিপন্থী নয়৷

মানব জাতির প্রধান প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো, তারা পিতার ঔরসে মাতৃগর্ভে জন্মলাভ করে মাতৃদুগ্ধ পান করে, ধীরে ধীরে ছোট থেকে বড় হতে থাকে৷ পানাহার, নিদ্রা ও প্রস্রাব-পায়খানার ইত্যাদির মত স্বাভাবিক ক্রিয়া কর্মের পাশাপাশি তারা জৈবিক চাহিদার কারণে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হয় এবং এতে সন্তান-সন্ততির প্রজন্ম হয়ে থাকে৷ তারা সুখে যেমন হাসে, দুঃখে তেমন কাঁদে৷

রোগ, শোক ও দুঃখ যেমন তাদের কাতর করে, তেমনি যাদু ও বিশেষ ক্রিয়া তাদের চরম কষ্ট দেয়৷ এমনকি মৃত্যুর দুয়ারে পর্যন্ত ঠেলে দেয়৷ 

আর এ সমস্ত মানবীয় বৈশিষ্ট্য কেবল মাটির তৈরি মানুষের বেলায় প্রযোজ্য৷ এখন এমন কেউ কি আছেন, যিনি প্রমাণ করতে পারবেন যে, মানবীয় এ সমস্ত বৈশিষ্ট্যের কোন একটি থেকেও হযরত মুহাম্মদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) মুক্ত ছিলেন? কেউ পারবেন না৷ কারণ- তিনি তো মাটির তৈরী মানুষই ছিলেন৷ তার শরীরের ভিতর নূরের সংমিশ্রণ ছিল৷ কিন্তু তিনি নূরের তৈরী ছিলেন না৷ অধিকন্তু রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) ছিলেন সমস্ত নবীগণের সরদার? সর্বশ্রেষ্ঠ মহামানব৷

প্রমাণঃ

(1)পবিত্র কুরআনে ইরশাদ হচ্ছে- হে নবী আপনি বলে দিন যে, আপনি তোমাদের মত মানুষ জাতেরই একজন ৷ তবে আমার নিকট ওহী আসে৷ (এ ক্ষেত্রে আমি তোমাদের থেকে ব্যতিক্রম) সূরা কাহাফ আয়াত নং(110)৷

আল্লাহ পাক বলেন-  “আর আমি মানুষকে মাটির সারাংশ (খাদ্যসার)  হতে সৃষ্টি -করেছি৷ সূরা 

মুমিনুন আয়াত নং(12)

আর হুযুর( সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)কে যেহেতু মানুষ বলা জরুরী, তা না হলে, প্রথম আয়াত অস্বীকার করে কাফের হবে৷ আর যখন মানুষ বলা হলো তাহলে তৃতীয় আয়াত হিসেবে তার মাটির তৈরি হওয়া জরুরী ভাবে বিশ্বাস করতে হবে৷ তা না হলে দ্বিতীয় আয়াত অস্বীকার করে কাফের হতে হবে৷ তাছাড়া সে ক্ষেত্রে মানুষ যে আশরাফুল মাখলুকাত ,তার থেকে নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বহির্ভূত হয়ে যাবেন, যা কখনও বঞ্ছনীয় নয়৷ 

কাজেই তাকে যদি সর্বশ্রেষ্ঠ মানুষ হিসেবে স্বীকার করা হয়, তাহলে তাকে মাটির তৈরী মানুষ হিসেবে অবশ্যই স্বীকার করতে হবে৷

(2) সূরা আরাফ 69 নং আয়াত ৷ হুদ 27 নং আয়াত ৷মুমিনূন 33  নং আয়াত৷ শুয়ারা 23 নং আয়াত৷

উল্লেখিত আয়াতসমূহেও  রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর মাটির তৈরি হওয়ার প্রমাণ পাওয়া যায়৷

(3) মিশকাত শরীফ দ্বিতীয় খন্ড 250 পৃষ্ঠায় বর্ণিত আছেঃ  হযরত আয়েশা (রাঃ)বলেন রাসূল (সাঃ)একজন মানুষ ছিলেন৷

(4)বুখারী শরীফ প্রথম খন্ড 332 পৃষ্ঠায় বর্ণিত আছে রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেনঃ  নিশ্চয়ই আমি একজন মানুষ৷

আর মানুষ মাটিরই হয়, নূরের হয় না৷ মহানবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) এর শরীর মোবারক নূরের তৈরী ছিল এ ব্যাপারে কোন আয়াত বা সহীহ হাদীসের প্রমাণ পাওয়া যায় না৷

তাই একথা অস্বীকার করা যায় না যে, মাটির তৈরি ছিলেন এবং মানুষ জাতের ছিলেন, মানুষ জাতের বাইরে ছিলেন না৷ 

তবে রুহানিয়্যতের মত শারীরিক বিভিন্ন দিক দিয়েও তিনি সাধারণ মানুষ থেকে ব্যতিক্রম ছিলেন৷ যেমন হযরত আনাস ( রাঃ) থেকে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) এর শরীরে জান্নাতি 40 জন লোকের সমপরিমাণ শক্তি ছিল ইত্যাদি (সুবাহানাল্লাহ)৷ 

আর রাসূল হিসেবে তার মর্যাদা ও সকল নবী ও রাসুলের ঊধ্বেং ছিল৷ বিভিন্ন আয়াতে বা হাদিসে নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসালাম)-কে নূর বলা হয়েছে, এর দ্বারা উদ্দেশ্য হলো তিনি হেদায়েতের নূর ও পথ প্রদর্শনের জ্যোতি ছিলেন৷

নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-এর নূরকে যারা আল্লাহর জাতের নূরের অংশ মনে করে, তাদের এ আকীদা শিরিকের পর্যায়ভুক্ত৷

সুতরাং যে ব্যক্তি রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) নূরের তৈরী এ আক্বীদা পোষণ করবে সে আহলে সুন্নাত ওয়াল জামা’আত থেকে খারিজ হয়ে যাবে৷( খাইরুল ফাতাওয়া 1/137)৷