মুহাম্মাদ তাওহীদুল ইসলাম তায়্যিব ।।

একজন মুমিন প্রতিদিন সকালে ঘুম থেকে উঠে—ফজর আদায়ের স্বপ্ন নিয়ে। কেউ কেউ উঠে রাতের শেষ প্রহরে—তাহাজ্জুদ পড়ার আকাঙ্ক্ষায়। তাই শুরু রাতে ঘুমানোর সময়ও তার ধ্যান ও ভাবনায় থাকে ফজর ও তাহাজ্জুদ। যেন দীর্ঘ ঘুমের নদী পাড়ি দিয়ে সে পৌঁছতে চায় সেখানে। যেখানে তার পরম প্রাপ্তি। কাঙ্ক্ষিত সব আয়োজন। সেক্ষেত্রে কোনো হেলা অবহেলা যেন তাকে কাবু করতে না পারে, এজন্য সবসময় থাকে তার প্রেমময় আকুলতা। থাকে অস্থিরতা- না জানি, এই মহা প্রাপ্তি থেকে বঞ্চিত হয়ে যাই! না জানি কোনো কারণে আমি মাহরূম হয়ে যাই!

দৈনিক পাঁচ ওয়াক্ত নামায ফরয। এ নামায আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে নির্ধারিত। তাই প্রত্যেক নামাযের আগে একজন ঘোষক ঘোষণা করে—

حَيَّ عَلَى الصَّلاَةِ

নামাযের দিকে এসো

حَيَّ عَلَى الفَلاَحِ

কল্যাণের দিকে এসো

দুনিয়ার হাজারো ব্যস্ততায় জড়ানো মানুষ যদি ভুলে যায় নামাযের কথা! যদি হাতছাড়া হয়ে যায় এই মহা কল্যাণ! তাই স্মরণ করিয়ে দেওয়া হয়। এসো নামাযের দিকে। এসো কল্যাণের দিকে।

দূর মিনার থেকে যখনই এই ঘোষণা আসে, মুমিন প্রস্তুতি নিতে শুরু করে। সৌভাগ্যময় আমলের জন্য সে নিজেকে গুছিয়ে নেয়। পরিচ্ছন্নতা ও পবিত্রতা অর্জন করে। পবিত্র পোশাকে সাজে। এরপর কল্যাণ, সৌভাগ্য ও সফলতা লাভের আশায় ছুটে মসজিদের দিকে।

সারাদিনের সব কর্মব্যস্ততা শেষে মুমিন রাতের নামায পড়ে। এরপর পূর্ণ বিশ্রামের উদ্দেশ্যে কর্মবিরতি দেয়। দেহমনকে দেয় একটু জিরোবার সুযোগ। আল্লাহর নাম নিয়ে, আয়াতুল কুরসি পড়ে সে নিজেকে সঁপে দেয় তার রবের কাছে। বলে, ‘হে আল্লাহ! আপনি যদি আমাকে এই রাতেই মৃত্যু দেন, তাহলে আমার প্রতি দয়া করবেন। আমার পাপরাশি ক্ষমা করে দিবেন। আর যদি আমাকে পুনরায় সজাগ করেন, তাহলে আপনার প্রিয় বান্দাদেরকে যেভাবে হেফাযত করেন আমাকেও তেমনি হেফাযত করবেন।’-সহীহ বুখারী, হাদীস নং : ৬৩২০

এরপর দীর্ঘ রাত পাড়ি দিয়ে দিবসের প্রথম প্রহরে সে আবার শুনে এই আহবান।

এসো নামাযের দিকে এসো।

এসো কল্যাণের দিকে এসো।

তখন মনে হয়, এই আহবানের প্রতীক্ষয়ই সে ঘুমিয়েছিল। এই আহবানের কথা মনে করে করেই সে জেগেছে বারবার! তাই এ ডাক শোনামাত্রই সে আকুল হয়ে উঠে। মহা সৌভাগ্য লাভের আশায় দ্রুত নিদ্রা ত্যাগ করে। এরই মাঝে শুনতে পায়-

اَلصَّلَاةُ خَيْرٌ مِنْ النَّوْمِ

ঘুম থেকে নামায উত্তম

উত্তরে সে বলে, হ্যাঁ। তুমি সত্য বলেছো। সত্যিই ঘুম থেকে নামায উত্তম।

স্নিগ্ধ ভোর। ঝিরঝিরে হাওয়া চারদিকে। হালকা মোলায়েম আলো ছড়ানো। এই পবিত্রতম পরিবেশে মুমিন ঘর থেকে বেরিয়ে পড়ে। দ্রুত হেঁটে যায় মসজিদের দিকে। মুখে বলতে থাকে-

اَللَّهُمَّ اجْعَلْ لِي فِي قَلْبِي نُورًا، وَفِي لِسَانِي نُورًا، وَفِي سَمْعِي نُورًا، وَفِي بَصَرِي نُورًا، وَمِنْ فَوْقِي نُورًا، وَمِنْ تَحْتِي نُورًا، وَعَنْ يَمِينِي نُورًا، وَعَنْ شِمَالِي نُورًا، وَمِنْ بَيْنِ يَدَيَّ نُورًا، وَمِنْ خَلْفِي نُورًا، وَاجْعَلْ فِي نَفْسِي نُورًا، وَأَعْظِمْ لِي نُورًا

হে আল্লাহ, আপনি আমার হৃদয়ে নূর দান করুন। আমার যবান ও কথায় নূর দান করুন। নূর দান করুন আমার শ্রবণশক্তিতে। দৃষ্টিশক্তিতে। আমার উপরে। নিচে। ডানে। বামে। সামনে। পিছনে। নূর দান করুন আমার প্রাণে। আমার জন্য করুন বিরাট নূরের আয়োজন।-সহীহ মুসলিম, হাদীস নং : ৭৬৩

এই দুআর বরকতে সত্যি সত্যিই মুমিনের জীবন নূরময় হয়ে উঠে। কাজে-কর্মে, চিন্তা-ধ্যানে, মন-মানসিকতায়, ভাবনা-কল্পনায় ছড়িয়ে পড়ে পবিত্র আলো। সত্যের আলো। হিদায়াতের আলো। এ আলোয় ভেসে যায় পঙ্কিল যত ভাবনা। ক্লেদাক্ত যত অনুভূতি। পবিত্র সুন্দর আভা লাভ করে মুমিন। পায় অন্যরকম তৃপ্তি ও আনন্দ।

ফজরের নামায পড়ে পাওয়া মুমিনের ফুরফুরে সকাল পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ সম্পদের চেয়েও অনেক অনেক দামী। সুতরাং এই মুমিনের চেয়ে বড় ধনী আর কে এই জগতে? তার জন্য হযরত রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ইরশাদ,

مَنْ صَلَّى صَلاَةَ الصُّبْحِ فَهْوَ فِي ذِمَّةِ اللَّهِ

যে ব্যক্তি ফজরের নামায আদায় করে সে আল্লাহর যিম্মা ও হেফাযতে থাকে।-সহীহ মুসলিম, হাদীস নং : ২৬২

ফজর আদায়ের পর মুমিন প্রতিদিন কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করে। বলে,

رَضِيتُ بِاللهِ رَبًّا، وَبِالْإِسْلَامِ دِينًا، وَبِمُحَمَّدٍ نَبِيًّا

আমি আল্লাহকে রব হিসাবে পেয়ে সন্তুষ্ট। ইসলামকে দ্বীন হিসাবে পেয়ে তৃপ্ত। মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে নবী হিসাবে পেয়ে চির ধন্য।

এই কৃতজ্ঞতার পুরস্কারও পায় সে। আজ থেকে চৌদ্দশ বছর আগে স্বয়ং দরবারে নববীতে তার জন্য ঘোষণা করা হয়েছে পুরস্কার। হযরত রাসূলে কারীম সাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,

كَانَ حَقًّا عَلَى اللهِ أَنْ يُرْضِيَهُ يَوْمَ الْقِيَامَةِ

যে ব্যক্তি সকাল সন্ধ্যায় তিনবার করে এই দুআ পড়বে, কিয়ামতের দিন আল্লাহর পক্ষে তাকে সন্তুষ্ট করিয়ে দেওয়া আবশ্যক হয়ে যাবে।-মুসনাদে আহমাদ, ২৩১১১

এভাবেই শুরু হয় মুমিনের দিন। আপন রবের সাথে সম্পর্কপূর্ণ এই জীবন। এ ভাগ্য মুমিন ছাড়া আর কার আছে? আল্লাহর কথা ভেবে ভেবে ঘুমিয়ে যাওয়া। আল্লাহর ডাকে সাড়া দিয়ে নিদ্রা ত্যাগ করা। এর মধ্যেই মুমিনের সব আয়োজন।

ধন্য তুমি হে মুমিন! ধন্য তোমার জীবন! সফল ও চির কল্যাণময় তোমার এ দিনযাপন!