মুফতি সাইদ আহমাদ পালনপুরির আলোকিত জীবনচরিত

25

শিখো বাংলায়: দারুল উলুম দেওবন্দের শাইখুল হাদীস ও প্রধান শিক্ষক, হজরতুল উসতাজ, শাইখ মাওলানা মুফতী সাইদ আহমদ পালনপুরি আজ (১৯ মে) রফিকে আলার ডাকে লাব্বাইক বলে নশ্বর জগৎ থেকে শাশ্বত জগতে পাড়ি জমান। ইন্না-লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন। ( উবায়দুল্লাহ)

মুফতি সাইদ আহমাদ পালনপুরি রাহিমাহুল্লাহর জন্মতারিখ সংরক্ষিত নেই। হ্যাঁ, যখন সম্মানিত পিতা তার বয়স দেড় বা পৌনে দুই বছর হয়, তখন জন্মস্থান ডিবহাডের জমি কিনেছিলেন, এর দলিলপত্র বিদ্যমান আছে। সে হিসেবে তার সম্মানিত পিতা অনুমান করে তার জন্মসন ১৯৫০ খৃষ্টাব্দ বলেছেন। তিনি কালিড়া নামক স্থান, জেলা, বানাস কাঁঠায় ( উত্তর গুজরাট) জন্মগ্রহণ করেন। এই জেলারই কেন্দ্রীয় শহর পালনপুর, যা ভারত স্বাধীনের পূর্বে মুসলমান নবাবদের স্টেট ছিল। সেখানে একটি আরবি মাদরাসা সুল্লামুল উলুম নামে প্রতিষ্ঠিত আছে, যাতে মাধ্যমিক পর্যন্ত পাঠদান হয়।

নাম: পিতা-মাতা তার নাম শুধু আহমদ রেখেছিলেন। কেননা তার একজন বড় মা-শরিক ভাই ছিলেন আহমদ নামে। তারই স্মরণে সম্মানিত মাতা তার নাম রাখেন আহমদ। সাইদ আহমদ নামটি তিনি নিজেই রেখেছিলেন, যখন সাহারানপুর মাজাহিরুল উলুম মাদরাসায় ভর্তি হন। সে সময় থেকে এ নামেই তিনি বিশ্বব্যাপী প্রসিদ্ধ। বংশের বয়স্ক বৃদ্ধরা এখনো তাকে আহমদ ভাই নামে ডাকেন। যদিও এখন এমন বৃদ্ধ দুচারজনই বাকি আছেন।

তার সম্মানিত পিতার নাম, ইউসুফ। দাদার নাম, আলী। যাকে সম্মানসরূপ আলি জি বলা হত।

শিক্ষাদীক্ষা: যখন তার বয়স ৫/৬ বছর হয়, তখন সম্মানিত পিতা, যিনি ডিবহাডে কৃষিকাজে থাকতেন, তার শিক্ষাদীক্ষার সূচনা করেন। কিন্তু সম্মানিত পিতা ক্ষেত-বাড়ির কাজের কারণে তার দিকে পরিপূর্ণ নজর রাখতে পারেননি। এজন্য তাকে স্বীয় জন্মস্থান কালিড়ায় মক্তবে মধ্যে ভর্তি করিয়ে দেন।

শৈশবের উসতাজগণ : তার মক্তবের উসতাজগণ হলেন:

১. মাওলানা দাউদ সাহেব চৌধুরি রাহ.।
২. মাওলানা হাবিবুল্লাহ সাহেব চৌধুরি রাহ.।
৩. মাওলানা ইবরাহিম সাহেব জোনকিয়াহ রাহ.।

প্রাথমিক শিক্ষা: প্রাথমিক শিক্ষা সমাপ্ত করে তিনি স্বীয় মামু মাওলানা আবদুর রহমান সাহেব রাহিমাহুল্লাহর সাথে ছাপি গমণ করেন এবং দারুল উলুম ছাপিতে স্বীয় মামুসহ অন্যান্য শিক্ষকবৃন্দের কাছ থেকে ফারসির প্রাথমিক কিতাবাদি ছয় মাস পর্যন্ত অধ্যায়ণ করেন। ছমাস পর মামু দারুল উলুম ছাপি ছেড়ে নিজের বাড়ি ফিরে আসলে তিনিও তার সাথে জোনি সিন্ধনিতে চলে আসেন এবং ছমাস পর্যন্ত তার কাছে ফারসির কিতাবাদির পাঠ গ্রহণ করেন। এরপর মুসলিহে উম্মাহ হজরত মাওলানা মুহাম্মাদ নজির মিয়া সাহেব পালনপুরি কুদ্দিসা সিররুহুর মাদরাসায়, যা পালনপুর শহরেই অবস্থিত ভর্তি হন এবং চার বছর পর্যন্ত হজরত মাওলানা মুফতি মুহাম্মদ আকবর মিয়া সাহেব পালনপুরি এবং হজরত মাওলানা মুহাম্মদ হাশেম সাহেব বুখারি রাহিমাহুল্লাহদ্বয়ের কাছে আরবির প্রাথমিক এবং মাধ্যমিক কিতাবগুলোর শিক্ষা গ্রহণ করেন।

মুসলিহে উম্মাহ হজরত মাওলানা মুহাম্মদ নজির মিয়া সাহেব কুদ্দিসা সিররুহু ঐ মহান ব্যক্তিত্ব, যিনি এই শেষ যুগেও মোমন ভ্রাতৃত্বদেরকে বিদআত, কুসংস্কার এবং সকল প্রকার অনৈসলামিক রীতিনীতি থেকে দূর করে হেদায়েত এবং সুন্নাতের রাজপথে বের করে আনেন। আজও পালনপুর এলাকায় দীনি যে পরিবেশ দৃষ্টিগোচর হচ্ছে, তা মাওলানারই খিদমতের ফলাফল।

হজরত মাওলানা মুহাম্মদ আকবর মিয়া সাহেব রাহ. তার ছোট ভাই এবং ডান হাত ছিলেন। হজরত মাওলানা মুহাম্মদ হাশেম সাহেব বুখারি রাহ. বুখারা থেকে দারুল উলুম দেওবন্দে শিক্ষা লাভের জন্য আগমন করেছিলেন। দাওরায়ে হাদিস পাশের পর প্রথমে পালনপুরে, পরে ইমদাদুল উলুম গুজরাটে। অতঃপর জামেআ হুসাইনিয়া রান্দিরে (সুরত) সবশেষে দারুল উলুম দেওবন্দে পাঠদানের খেদমত আনজাম দেন। শেষদিকে তিনি হিজরত করে মদিনা মনোয়ারায় চলে যান এবং সেখানেই পরলোকগমন করেন। তিনি বকিউল গারকাদে শায়িত আছেন।

মাজাহিরুল উলুমে ভর্তি: তিনি পালনপুরে শরহে জামি পর্যন্ত শিক্ষা লাভের পর উচ্চশিক্ষার লক্ষ্যে ১৩৭৭ হিজরি সনে সাহারানপুর (ইউ.পি.) সফর করেন এবং সেখানে ভর্তি হয়ে তিন বছর পর্যন্ত ইমামুন নাহু ওয়াল মানতিক, হজরত মাওলানা সিদ্দিক আহমাদ সাহেব জমোভি রাহিমাহুল্লাহর কাছে নাহু, মানতিক এবং ফালসাফার অধিকাংশ কিতাব পড়েন। হজরত মাওলানা মুহাম্মদ ইয়ামিন সাহেব সাহারানপুরি, হজরত মাওলানা মুফতি ইয়াহয়া সাহেব সাহারানপুরি, হজরত মাওলানা আবদুল আজিজ সাহেব রায়পুরি এবং হজরত মাওলানা ওয়াকার আলি সাহেব বিজনুরি রাহিমাহুমুল্লাহর কাছেও কিতাবসমূহ পড়েন।

দারুল উলুম দেওবন্দে ভর্তি : অতঃপর তিনি ফিকহ, হাদিস, তাফসির এবং বিভিন্ন বিষয়ে উচ্চশিক্ষার জন্য ১৩৮০ হিজরি সনে দারুল উলুম দেওবন্দে ভর্তি হন। প্রথম বছরে হজরত মাওলানা নসির আহমদ খান সাহেব বুলন্দশহরি রাহিমাহুল্লাহর কাছে তাফসিরে জালালাইন (আলফাউজুল কবিরের সাথে), হজরত মাওলানা সায়্যিদ আখতার হুসাইন সাহেব দেওবন্দি রাহিমাহুল্লাহর কাছে হিদায়া প্রথম দুই খণ্ড এবং হজরত মাওলানা বশির আহমদ খান সাহেব বুলন্দশহরি রাহিমাহুল্লাহর কাছে তাসরিহ-বসতে বাব, শরহে চোগমেনি, রিসালায়ে ফতহিয়া এবং রিসালায়ে শামসিয়া ইত্যাদি ইলমে হাইয়াতের কিতাবসমূহ পড়েন। পরের বছর মিশকাত শরিফ, হেদায়া আখিরাইন, তাফসিরে বাইজাবি ইত্যাদি বই অধ্যয়ণ করেন এবং ১৩৮২ হিজরি সন- যা ছিল দারুল উলুম দেওবন্দের শতবার্ষিকী– দাওরায়ে হাদিস সম্পন্ন করেন।

দেওবন্দে তার শিক্ষকবৃন্দ: তিনি দারুল উলুম দেওবন্দে যেসমস্ত আসাতিজাদের থেকে শিক্ষা গ্রহণ করেছেন, তারা হলেন: হজরত মাওলানা সাইয়্যিদ আখতার হুসাইন সাহেব দেওবন্দি, হজরত মাওলানা বশির আহমদ খান সাহেব বুলন্দশহরি, হজরত মাওলানা সাঈদ হাসান সাহেব দেওবন্দি, হজরত মাওলানা আবদুল জলিল সাহেব কিরানভি, হজরত মাওলানা আসলামুল হক সাহেব আজমি, হাকিমুল ইসলাম হজরত মাওলানা কারি মুহাম্মদ তায়্যিব সাহেব দেওবন্দি, হজরত মাওলানা ফখরুল হাসান সাহেব মুরাদাবাদি, হজরত মাওলানা মুহাম্মদ জাহুর সাহেব দেওবন্দি, ফখরুল মুহাদ্দিসিন মাওলানা ফখরুদ্দিন আহমাদ মুরাদাবাদি, ইমামুল মাকুল ওয়াল মানকুল আল্লামা মুহাম্মদ ইবরাহিম বিলয়াভি, মুফতিয়ে আজম হজরত মাওলানা মুফতি সায়্যিদ মাহদি হাসান সাহেব শাহজাহানপুরি সাহেব, শাইখ মাহমুদ আবদুল ওয়াহহাব মাহমুদ সাহেব মিশরি এবং হজরত মাওলানা নসির আহমদ খান সাহেব বুলন্দশহরি রাহিমাহুমুল্লাহ।

প্রথম স্থান অধিকার: তিনি বাল্যকাল থেকেই ছিলেন প্রখর মেধাবি ও সমঝদার। কুতুববিনি এবং পরিশ্রমে অভ্যস্ত ছিলেন। সাথে উল্লিখিত আসাতিজায়ে কেরামের শিক্ষাদীক্ষা তার যোগ্যতাকে বাইশ বছর বয়সে চূড়ান্তে পৌছিয়ে দেয়। দারুল উলুম দেওবন্দের মতো বিরাট বিদ্যাপীঠে বাৎসরিক পরীক্ষায় তিনি প্রথমস্থানে সফলতা অর্জন করেন। অথচ সেই বছর পাক্কা যোগ্যতার অধিকারী অনেক ফারেগিনরা শুধু প্রথমস্থান অধিকারের জন্যই দাওরায়ে হাদিসে ভর্তি হন।

দারুল ইফতায় ভর্তি ও তার প্রথম ছাত্র:

তিনি দাওরায়ে হাদিস শেষ করে শাওয়াল ১৩৮২ হিজরি সনে তাকমিলে ইফতায় আবেদন করলে তা মঞ্জুর হয়। হজরত মুফতি সায়্যিদ মাহদি হাসান সাহেব শাহজাহানপুরির তত্ত্বাবধানে ফাতাওয়ার কিতাবাদি মুতালাআ এবং ফতোয়া প্রদানের অনুশীলনের সূচনা করেন। তিনি নিজ ভাই-বোনদের মাঝে সবচেয়ে বড় ছিলেন। এজন্য দাওরায়ে হাদিস থেকে ফারেগ হওয়ার পর নিজের ভাইদের শিক্ষাদীক্ষার দিকে বিশেষ দৃষ্টি দেন এবং অধমকে ১৩৮২ হিজরি সনে নিজের সাথে দেওবন্দে নিয়ে আসেন। অবশেষে তিনি আমার হিফজে কুআনের সম্পূর্ণ জিম্মাদারি নিজেই গ্রহণ করেন। এ বছরেই তিনি শাইখ মাহমুদ আবদুল ওয়াহহাব মাহমুদ মিসরি রাহিমাহুল্লাহর কাছে কুরআনে কারিম মুখস্ত করেন। তিনি অত্যন্ত ভালো হাফেজ এবং মিসরি কারি ছিলেন। তিনি জামিআতুল আজহার কায়রোর পক্ষ থেকে দারুল উলুম দেওবন্দে প্রেরিত ছিলেন।

মোটকথা: ১৩৮২-১৩৮৩ হিজরি সনে তিনি একদিকে ফতোয়ার কিতাব মুতালাআ করতেন, অন্যদিকে অধমকেও কুরআন মুখস্ত করাতেম এবং নিজেও কুরআন মুখস্থ করতেন। এ কাজে তিনি এতটাই ব্যস্ত এবং মগ্ন থাকতেন যে, রমজানুল মোবারকে বাড়ি যাননি। আমিও যাইনি। রমজানপর নিজের আরেক ভাই মৌলভি আবদুল মাজিদকেও দেওবন্দে ডেকে আনেন।

এদিকে ইফতাকর্তৃপক্ষ তার যোগ্যতাকে চূড়ান্তে পৌঁছার লক্ষ্যে তার দারুল ইফতার ভর্তিতে আরো এক বছরের সুযোগ করে দেয়। সুতরাং ১৪৮৩-৮৪ হিজরিতে তিনি ছোট ভাই মৌলভি আবদুল মাজিদ সাহেবকে ফারসির কিতাবসমূহ পড়াতেন, আমাকে কুরআন মুখস্থ করাতেন, নিজেও কুরআন মুখস্থ করতেন। অন্যদিকে ফাতোয়া প্রদানের খুবই অনুশীলন করতেন। তিনি ফাতওয়া প্রদানে এতটা যোগ্যতা রাখতেন যে, ছমাস পর দারুল উলুম দেওবন্দের পরিচালনা কমিটি তাকে সহকারি মুফতির মর্যাদায় দারুল উলুম দেওবন্দে নিয়োগ দিয়ে দেয়।

বাড়িতে গমন: ২১ শাওয়াল ১৩৮৪ হিজরি সনে তিনি মাদরে ইলমি দারুল উলুম দেওবন্দকে খায়রবাদ বলে প্রথমে নিজের ঘরে তাশরিফ নেন। এক সপ্তাহ ঘরে অবস্থান করে পিতা-মাতার জিয়ারতে ধন্য হন। অতঃপর ছোট ভাই মৌলভি আবদুল মাজিদ -যিনি অধমের দুবছরের বড় ছিলেন-, মৌলভি হাবিবুর রহমান সাহেব -যিনি অনুমানিক আমার থেকে সাত/আট বছর ছোট ছিলেন- এবং অধমকে সাথে নিয়ে রান্দির (সুরত) তাশরিফ নেন এবং দারুল উলুম আশরাফিয়ায় পাঠদানের সূচনা করেন।

রান্দিরে কর্মজীবনের সূচনা: তিনি জুলকাদা ১৩৮৪ হিজরি থেকে শাবান ১৩৯৩ হিজরি পর্যন্ত নয় বছর দারুল উলুম আশরাফিয়ায় আবু দাউদ শরিফ, তিরমিজি শরিফ, তাহাবি শরিফ, আশশামায়িল, মুয়াত্তাইন, নাসাই শরিফ, ইবনে মাজাহ শরিফ, মিশকাত শরিফ, (আলফাওজুল কাবিরসহ), তরজমায়ে কুরআন, হেদায়া আখিরাইন, শরহুল আকাইদুন নাসাফিয়াহ, হুসামি ইত্যাদি কিতাবসমূহের দরস প্রদান করেন। সাথে সাথে লেখালিখির ময়দানেও ব্যস্ত থাকেন। এই সময়েই তিনি ‘দাড়হি আওর আম্বিয়া কি সুন্নাতে’, ‘হুরমাতে মুসাহারাত’ এবং ‘আলআওনুল কাবির’ রচনা করেন। সে সময়ই তিনি কাসেমুল উলুমি ওয়াল খাইরাত মাওলানা মুহাম্মাদ কাসেম নানুতভি রাহিমাহুল্লাহর কিতাবসমূহ ও তার উলুম-মাআরিফের ব্যাখ্যা ও সহজকরণের কাজের সূচনা করেন এবং একটি প্রবন্ধ “ইফাদাতে নানুতাভি শিরোনামে কিস্তি আকারে ‘আলফুরকান লাখনো’ এ প্রকাশিত হয়েছিল। যা অত্যন্ত মূল্যবান নিবন্ধ। (কিন্তু এর কাজ আর সামনে অগ্রসর হয়নি, তিনি অন্যান্য কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়েন। উবায়দুল্লাহ)

দারুল উলুম দেওবন্দে নিয়োগ: তার উতাজে মুহতারাম হজরত মাওলানা মুহাম্মাদ হাশেম সাহেব বুখারি রাহিমাহুল্লাহ যিনি প্রথমে জামিআ হুসাইনিয়া রান্দিরে পড়াতেন। অবশেষে দারুল উলুম দেওবন্দে তার নিয়োগ হয়। তিনি চিঠির মাধ্যমে তাকে অবহিত করলেন যে, দারুল উলুম দেওবন্দে একজন শিক্ষকের জায়গা শূন্য আছে, অতএব, আপনি শিক্ষকতার আবেদন পাঠিয়ে দিন। তিনি হজরত জনাব মাওলানা হাকিম মুহাম্মদ সাদ রশিদ সাহেব রাহিমাহুল্লাহর সাথে পরামর্শক্রমে আবেদন করেন। এদিকে এ বছরই শাবানে মজলিসে শুরার বৈঠকে আরবি বিভাগের জন্য একজন শিক্ষক নিয়োগের আলোচনা আসলে হজরত মাওলানা মুহাম্মাদ মনজুর নুমানি সাহেব রাহিমাহুল্লাহ তার নামই প্রস্তাব করলেন। এই মজলিসেই তার নিয়োগ সম্পন্ন হয়। তাকে শাবানেই এ বিষয়ে অবগত করা হয়। বাদ রমজানুল মোবারক তিনি দারুল দেওবন্দের তাশরিফ আনেন। সে সময় থেকে মত্যু অবধি দারুল দেওবন্দে পাঠদানের খিদমত আনজাম দিয়েছেন।

দারুল উলুম দেওবন্দে পাঠদানের খিদমত: তিনি শাওয়াল ১৩৯৩ হিজরি -এই প্রবন্ধ লেখা পর্যন্ত – দারুল উলুম দেওবন্দে যেসব কিতাব পড়িয়েছেন এবং পড়াচ্ছেন এর বিস্তারিত বিবরণ সন আকারে নিম্নে দেয়া হল:
১৩৯৩-৯৪: মুসাল্লামুস সুবুত, হিদায়া প্রথম খণ্ড, সুল্লামুল উলুম, হাদিয়ায়ে সাইদিয়া, জালালাইন (প্রথম অর্ধেক) আলফাওজুল কাবিরসহ, মুল্লা হাসান।

১৩৯৪-৯৫: মুসাল্লামুস সুবুত, শরহুল আকায়িদে জালালি, মুল্লা হাসান, জালালাইন (২য় অর্ধেক) আলফাওজুল কাবির।

১৩৯৫-৯৬: মুসামারাহ, দিওয়ানে মুতানাব্বি, মাইবুজি, তাফসিরে বাইজাবি ২১-২৫ তম পারা।

১৩৯৬-৯৭: দিওয়ানে মুতানাব্বি, তাফসিরে বাইজাবি ২৬-৩০ তম পারা, মুল্লা হাসান ও মিশকাতুল মাসাবিহ (সাময়িক)।

১৩৯৭-৯৮: মিশকাতুল মাসাবিহ দ্বিতীয় খণ্ড, নুখবাতু্ ফিকারসহ, হুসামি (কিয়াসঅধ্যায়) মুল্লা হাসান, সাবয়ে মুআল্লাকা, হিদায়া, মুয়াত্তা লিল ইমাম মালেক।

১৩৯৮-৯৯: দিওয়ানে হামাসা, সাবয়ে মুআল্লাকা, তাফসিরে বাইজাবি সুরা বাকারা, মিশকাতুল মাসাবিহ (২য় খণ্ড) নুখবাতু্ ফিকারসহ, তাফসিরে মাজহারি ১৬-২০ তম পারা, মুয়াত্তা লিল ইমাম মালেক, সিরাজি ও নাসাই শরিফ।

১৪০০ হিজরি: মিশকাতুল মাসাবিহ (২য় খণ্ড) নুখবাতু্ ফিকারসহ, তাফসিরে বাইযাজি। ২১-২৫ পারা, দিওয়ানে হামাসা, সাবয়ে মুআল্লাকা, মুয়াত্তা লিল ইমাম মালেক, সিরাজি।

১৪০১হিজরি: মিশকাতুল মাসাবিহ (২য় খণ্ড) নুখবাতু্ ফিকারসহ, তাফসিরে বাইজাবি ২৬-৩০ পারা, তাফসিরে মাদারিকুত তানজিল ৬-১০, সিরাজি, মুয়াত্তা মুহাম্মাদ।

১৪০২হিজরি: সুনানে তিরমিজি (১ম খণ্ড) তাফসিরে বাইজাবি বাকারা, সুনানে আবু দাউদ, সহিহ বুখারি সানি, মুয়াত্তা মালেক ও মুয়াত্তা মুহাম্মাদ। ১৪০৩ হিজরি: সুনানে তিরমিজি (১ম খণ্ড) তাফসিরে বাইজাবি বাকারা, সহিহ মুসলিম (১ম খণ্ড) মুকাদ্দিমাতুবনিস সালাহ, রশিদিয়া, সুনানে ইবনে মাজাহ।

১৪০৪ হিজরি: সুনানে তিরমিজি (১ম খণ্ড) তাফসিরে বাইজাবি (বাকারা) হিদায়া চতুর্থ খণ্ড ও তাহাবি শরিফ।

১৪০৫ হিজরি: সুনানে তিরমিজি ১ম খণ্ড, তাফসিরে বাইজাবি (বাকারা) হিদায়া তৃতীয় খণ্ড, বুখারি ১ম খণ্ড ও তাহাবি শরিফ।

১৪০৬ হিজরি:সুনানে তিরমিজি ১ম খণ্ড, তাফসিরুল কুরআন, হিদায়া চতুর্থ খণ্ড ও তাহাবি শরিফ।

১৪০৭হিজরি: তালখিসুল ইতকান, সুনানে তিরমিজি ১ম খণ্ড, তাফসিরুল কুরআন, হিদায়া চতুর্থ খণ্ড ও তাহাবি শরিফ।

১৪০৮ হিজরি: তিরমিজি ১ম খণ্ড, তাফসিরুল কুরআন, হিদায়া চতুর্থ খণ্ড, তাহাবি শরিফ, হুজ্জাতুল্লাহিল বালিগা।

১৪০৯হিজরি: তিরমিজি ১ম খণ্ড, তাফসিরুল কুরআন, হিদায়া চতুর্থ খণ্ড, তাহাবি শরিফ, হুজ্জাতুল্লাহিল বালিগাহ।

১৪১০ হিজরি: তিরমিজি ১ম খণ্ড, তাফসিরুল কুরআন, হিদায়া তৃতীয় খণ্ড, তাহাবি শরিফ

১৪১১ হিজরি থেকে ১৪২৭ হিজরি পর্যন্ত তিরমিজি ১ম খণ্ড, তাহাবি শরিফ এবং হুজ্জাতুল্লাহিল বালিগার পাঠদান করেছেন।

১৪২৭ থেকে মৃত্যু অবধি সহিহ বুখারি ১ম খণ্ডের দরস প্রদান করেন।

অন্যান্য খিদমাতসমূহ: উল্লিখিত পাঠদানের খেদমতসহ তিনি দারুল উলুম দেওবন্দে যেসব খিদমাত আনজাম দিয়েছেন এর বিস্তারিত আলোচনা এই সংক্ষিপ্ত পরিসরে সম্ভব নয়। শুধু কিছু খেদমতের আলোচনা করা হল:

১. ১৪০২ হিজরিতে হজরত মাওলানা মুফতি নেজাম উদ্দিন সাহেব রাহ. দীর্ঘ দিনের ছুটি নেন। হজরত মাওলানা মুফতি মাহমুদ সাহেব গাঙ্গুহি রাহ.ও সাহারানপুরে চলে যান। আরো কিছু মুফতিয়ানে কেরাম দারুল উলুম থেকে পৃথক হয়ে যান। এজন্য কর্তৃপক্ষ তাকে এবং অধমকে ইফতার সম্পর্কিত কিতাবসমূহ পাঠদানের সাথে সাথে ইফতা বিভাগের তত্ত্বাবধায়ক এবং ফতোয়া প্রদানের নির্দেশ দেয়। আমরা সুচারুভাবে তা আনজাম দিয়েছি।

২. যখন দারুল উলুম দেওবন্দে মজলিসে তাহাফফুজে খতমে নুবুওয়ত প্রতিষ্ঠা লাভ করে, তিনি এর নাজিম নিযুক্ত হন। ১৪১৯ হিজরিতে তিনি এই পদ থেকে অব্যাহতির আবেদন মজলিসে শুরা বরাবর করেন। কিন্তু মজলিসে শুরা তা গ্রহণ করেনি।

৩. উল্লেখিত খিদমত পরেও হজরত মুহতামিম সাহেব (কারি মুহাম্মাদ তায়্যিব রাহ.) দামাত বারকাতুহুম তাকে লিখিত অথবা মৌখিক বক্তব্য প্রদানের খিদমত সোপান করতেন। তিনি তা সুষ্ঠু ও সুচারুরূপে আনজাম দিতেন, যার দীর্ঘ ব্যাখ্যা এই সংক্ষিপ্ত লিখনীতে সম্ভব নয়।

রচনাবলী: তার প্রকাশিত রচনাবলী পূর্ব-পশ্চিম দিগন্তে বিস্তৃত। কয়েকটি রচনার পরিচয় নিম্নরূপ:

১. তাফসিরে হেদায়েতুল কুরআন। এটি সর্বমহলে গ্রহণীয় একটি তাফসিরগ্রন্থ। ৩০ তম পারা ও ১-৯ পর্যন্ত হজরত মাওলানা মুহাম্মাদ উসমান কাশিফ আলহাশিমি সাহেব রাজুপুরি রাহ. লিখেছেন। বইটি মোট আট খণ্ড। দুই খণ্ড পরে বাকি সব তার লেখা। অবশ্য হাশেমির লেখা দুই খণ্ডও তিনি আবার লিখেছেন। ( অধম তাফসিরটির অনুবাদ করছি)

২. রহমতুল্লাহিল ওয়াসিআ শরহে উর্দু হুজ্জাতুল্লাহিল বালিগাহ। এটি তার শ্রেষ্ঠ কৃতিত্ব। এর দ্বারাই তিনি বিশ্বব্যাপী সমাদৃত হয়েছেম, যা বিশাল কলেবরে ৫ খণ্ডে প্রকাশিত। এছাড়াও জনসাধারণদের জন্য এর পাঠাংশ ব্যতিরেকে মূল বিষয়বস্তু আলাদা করে ‘কামিল বুরহানে এলাহি’ নামে ৩ খণ্ডে প্রকাশ করেন এবং মূল বই টীকাটিপ্পনীসহ দুইখণ্ডে মুদ্রণ করেন।

৩. তুহফাতুল কারি শরহে উর্দু সহিহুল বুখারি। যা তার তাকরিরসমষ্টি। মোট ১২ খণ্ডে মুদ্রিত। যাতে সহিহ বুখারিরর তারাজিম এবং ফিকহি মাসায়েল ও আসবাবে ইখতিলাফ নেহায়েত সহজলভ্য করা হয়েছে। ইমাম বুখারি রাহ.-এর সূক্ষ্মতা বুঝতে এই ব্যাখ্যাগ্রন্থ অত্যন্ত গুরুত্ববহ।

৪. তুহফাতুল আলমায়ি শরহে উর্দু সুনানে তিরমিজি। যা মোট ৮ খণ্ডে প্রকাশিত। পুরা সুনানে তিরমিজি বুঝতে এর ভূমিকা অপরিসীম।

৫. আলআউনুল কাবির। যা আলফাউজুল কাবিরের ব্যাখ্যাগ্রন্থ। তিনি মূল বই আলফাউজুল কাবিরের জাদিদ তারিবও করেছেন। যা অত্যন্ত সুচারু ও গুরুত্ববহ। এই নতুন আরবি, যা অতীতের অন্যান্য আরবির সংস্করণ। দারুল উলুম দেওবন্দসহ অন্যান্য মাদরাসায় এখন এই অনুবাদই পড়ানো হয়। এছাড়া ফয়জুল মুনঈম, মাবাদিল ফালসাফা, মুইনুল ফালসাফা, মিফতাহুত তাহজিব, আসান মানতিক, আসান সরফ, মাহফুজাত, আপ কেসে ফাতওয়া দেঁ, কিয়া মুক্তাদি পর ফাতেহা ওয়াজেব হে, ইলমি খুতবাত, হায়াতে ইমাম আবু দাউদ, মাশাহির মুহাদ্দিসিনন ও ফুকাহায়ে কেরাম আওর তাজকিরা রাবিয়ানে কুতুবে হাদিস, হায়াতে ইমাম তাহাবি, ইসলাম তাগাইউর পজির দুনিয়ে মে, নুবুওয়াত নে ইনসান কু কিয়া দিয়া, দাঁড়হি আওর আম্বিয়া কি সুন্নাতে, হুরমাতে মুসাহারাত, তাসহিল আদিল্লায়ে কামিলা, হাওয়াশি ও আনাভিন ইজাহুল আদিল্লা, হাওয়াশি ইমদাদুল ফাতাওয়া(১ম খণ্ড), জুবদাতুত তাহাবিসহ সর্বমোট ৪০ এর ঊর্ধ্বে তার রচনাবলী দেশ-বিদেশে সমাদৃত।

তার সর্বশেষ রচনা: তার সর্বশেষ প্রকাশিত রচনা হচ্ছে, জলসায়ে তাজিয়াত কা শরয়ি হুকুম, যা অধমের অনুবাদে “চেতনার মশাল” নামে মুদ্রিত। (উবায়দুল্লাহ)

তার পাঠদান ও রচনাশৈলীর বৈশিষ্ট্যঃ তার রচানাবলীর বৈশিষ্ট্য বলার প্রয়াস রাখি না। যারা তার ছাত্রত্ব গ্রহণে ধন্য হয়েছেন বা তার লিখনির সাথে পূর্ণ পরিচয় রাখেন, তারাই তা অনুধাবন করতে সক্ষম। তার বক্তব্যের ধরণ নেহায়েত প্রভাব বিস্তারকারী, তার দরস সমাদৃত এবং সাধারণ বোধগম্য। এমনিভাবে তার লিখনী অত্যন্ত সহজলভ্য। সাদাসিধে উপলব্ধি, যা সকলের কাছে গ্রহণীয়। তার বক্তব্য যেমন অত্যন্ত সংক্ষিপ্ত এবং ইলমি নিকাতে পরিপূর্ণ ছিল, তেমনিভাবে তার লিখনীও নেহায়েত গোঁছালো, স্পষ্ট ও সমন্বয়কারী।

সমৃদ্ধির পথে: উসতাজে মুহতারামকে আল্লাহ তাআলা অনেক সৌকর্ষ এবং পরাকাষ্ঠা দ্বারা ধন্য করেছিলেন। তার রুচি সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম, স্বভাব সাধাসিধে ও মনোরম। মেজাজে
স্বয়ংসম্পূর্ণতা ও মধ্যপন্থা, তীক্ষ্ণবুদ্ধিতে কল্যাণকামিতা, তার স্মৃতি আগন্তুক, তিনি অকস্মাৎ লিপিকার, সচ্ছল লেখক, তিনি হক-বাতিল, সঠিক-বেঠিকের মধ্যে পার্থক্য করার পরিপূর্ণ যোগ্যতার অধিকারী। তিনি হাকায়িক- মাআরিফের বোধগম্যে কালের অদ্বিতীয় ছিলেন। তার সবচে বড় উৎকৃষ্টতা হল, তিনি নিজের কাজে অত্যন্ত কূটবুদ্ধিসম্পন্ন এবং অবস্থার সাহসিকতার মোকাবেলাকারী ছিলেন। আমি তার মত দিনরাত পরিশ্রমকারী স্বচক্ষে দেখেনি। তার সমস্ত ছাত্ররা জানে যে, তার দরস কতটুকু গ্রহণীয়? যাদের তার লিখনী দেখার বা বক্তব্য শুনার সুযোগ হয়েছে, তারা-ই জানেন তার লিখনী এবং বক্তব্য কী পরিমাণ সারগর্ভ, সুচারু ও সমন্বয়কারী হয়ে থাকে। তার খাদেমরা জানে, তিনি নিজের এবং সম্পর্কীয় লোকদের কিতাবের সংশোধন ও মুদ্রণে কতটুকু গুরুত্বারোপ করতেন। তিনি নিজের ভাই ও পরিবার-পরিজনের শিক্ষাদীক্ষায় কতটুকু লক্ষ্য রাখতেন।

বাইআত ও অনুমতি: তিনি যেমনিভাবে ইলমে জাহিরের পরিপূর্ণতা রাখতেন তেমনিভাবে তিনি ইলমে বাতিনি দ্বারাও পরিপূর্ণ ছিলেন। কিন্তু তিনি একে এই পরিমাণ গোপন রাখতেন যে, সাধারণত মানুষ জানত যে, তিনি শুধু এলমে জাহিরিতে-ই দক্ষতা রাখেন। অথচ বাস্তবতা হল, তিনি ছাত্রকাল থেকেই হজরত শাইখুল হাদিস মাওলানা মুহাম্মাদ জাকারিয়া সাহেব রাহিমাহুল্লাহর কাছে বাইআত গ্রহণ করেছিলেন এবং অন্যান্য বুজুর্গানে দীনের সাহচর্যেপ ধন্য হয়েছেন। বিশেষত হজরত মাওলানা আবদুল কাদের সাহেব রায়পুরি রাহিমাহুল্লাহর মজলিসে মাজাহেরুল উলুমে ছাত্র থাকাকালে অংশগ্রহণ করতেন। তিনি হজরত মাওলানা মুফতি মুজাফফর হুসাইন সাহেব মাজাহেরি রাহিমাহুল্লাহ থেকে বাইয়াতের অনুমতিও লাভ করেছেন।

বাইতুল্লার জিয়ারত: তিনি কয়েকবার জিয়ারতে হারামাইন শরিফাইনের জিয়ারতে ধন্য হয়েছেন। সর্বপ্রথম ১৪০০হিজরি, মোতাবেক ১৯৮০ খৃষ্টাব্দে পরিবারসহ জাহাজে করে সফর করেন এবং ফরজ হজ আদায় করেন। অতঃপর ১৪০৬ হিজরিতে আফ্রিকা থেকে দ্বিতীয়বার হজ আদায় করেন। তিনি তো প্রথমেই নিজের ফরজ হজ আদায় করেছিলেন, এজন্য এই দ্বিতীয় হজ নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পক্ষ থেকে বদলি হজ হিসেবে আদায় করেছিলেন। ১৪১০ হিজরি, মোতাবেক ১৯৯০ খৃষ্টাব্দে সৌদির হজ মন্ত্রণালয়ের আমন্ত্রণে তৃতীয়বার হজ আদায় করেন। এছাড়া আরো অনেক হজ-উমরাহ দ্বারা ধন্য হয়েছেন।

মাতা-পিতার পরোগমণ: যেকালে শাইখুল ইসলাম মাওলানা শাব্বির আহমাদ উসমানি, মাওলানা বদরে আলম মিরাঠি সাহেব এবং মুহাদ্দিসে কাবির হজরত মাওলানা মুহাম্মাদ ইউসুফ বানুরি রাহিমাহুল্লাহ ডাবিলে পাঠদান করতেন, সেসময় তার পিতা সেখানে পড়তেন এবং হজরত মাওলানা বদরে আলম সাহেব মুহাজিরে মাদানির খাদেম ছিলেন। কিন্তু পারিবারিক দূরাবস্থার কারণে শিক্ষা পরিপূর্ণ করতে পারেননি। এজন্য তিনি তার ছেলেদেরকে মাওলানা শাব্বির আহমাদ উসমানি, মাওলানা বদরে আলম মিরাঠি এবং মাওলানা মুহাম্মদ ইউসুফ বানুরির মতন রত্ন বানানোর আগ্রহ রাখতেন। মাওলানা বদরে আলম রাহ.তাকে নসিহত করেছিলেন: “ইউসুফ! যদি তুমি তোমার ছেলেদেরকে ভালো আলেম বানাতে চাও, তাহলে হারাম এবং না জায়েজ মাল থেকে বিরত থাক এবং ছেলেদেরকেও হারাম- নাজায়েজ মাল থেকে বাঁচিয়ে রেখো। কেনন না জায়েজ এবং হারাম মাল দ্বারা যে শরীর বড় হয়, তাতে এই নুরের অনুপ্রবেশ ঘটে না।”

এই নসিহত হজরত মাওলানা রাহ. সম্মানিত পিতাকে এজন্য-ই করেছেন, কারণ সেকালে আমাদের বংশ সুদে আক্রান্ত ছিল এবং আমাদের দাদা সুদ গ্রহণ করে একটি জমিও কিনে ছিলেন। সম্মানিত পিতা তখন ডাবিলের ছাত্র ছিলেন। এ ব্যাপারে দাদার সাথে মতবিরোধ ফলে দাদা তাকে পৃথক করে দেন। সুতরাং সম্মানিত পিতা হারাম মাল থেকে বাঁচার জন্য বাধ্য হয়ে শিক্ষা ছেড়ে পরিবারের দায়িত্ব গ্রহণ করেন। তিনি দৃড় প্রতিজ্ঞা করেন যে, প্রয়োজনে নিজে অনাহারে থাকব। তবুও হারাম মাল হাতে লাগাব না। আমি যদিও লেখাপড়া করতে পারিনি, আল্লাহ তাআলা যেন আমার সন্তানদেরকে ইলমে দীন দান করেন। সুতরাং সম্মানিত পিতা অবৈধ, হারাম মাল এবং সন্দেহপূর্ণ সম্পদ থেকে বেঁচে থাকতেন এবং নিজের সন্তানদেরও বাঁচাতেন। তাদের শিক্ষাদীক্ষার দিকে পরিপূর্ণ দৃষ্টি দেন নামাজ-রোজা পাবন্দির সাথে আদায় করতেন। আমার জানা মতে তার কোনো নামাজ কাজা হয়নি। সম্মানিত মাতার ইনতিকালের পর আব্বা সাহেব কুরআন মুখস্থ করা শুরু করেন। ৭/৮ পারা মুখস্ত করে ফেলেন। কিন্তু হায়াতে সাড়া দেয়নি।

জুলকাদা ১৪১৩ হিজরি এ একদিন তাহাজ্জুদের নামাজের জন্য তিনি উঠে। একটু গরম অনুভব হলে গোসল করে কাপড় পরিবর্তন করেন। তখন বুকে ব্যথা অনুভব হলে ভাই আবদুল মাজিদকে আওয়াজ দিয়ে ডাকেন। ভাই আবদুল মাজিদ তাড়াতাড়ি তার খেদমতে উপস্থিত হয়ে দেখেন তার সমস্ত শরির ঘামে ভরপুর। তিনি নিজেই বুক দাবিয়ে চৌকির উপর বসে আছেন। ভাই এই অবস্থা দেখে হতভম্ব হয়ে ভাই আবদুর রহমান, যিনি এক দেড়েক মাইল দূরে অবস্থান করতেন তাকে এবং ডাক্তার আনার চিন্তা করতে লাগলেন। পিতা বললেন, ডাক্তার ডাকার কোন প্রয়োজন নেই। একথা বলেই কিছুক্ষণের মধ্যেই আল্লাহর প্রিয় হয়ে গেলেন। ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন।

আমাদের সম্মানিত মাতাও দীনের জরুরি বিষয়ে অবগত ছিলেন। পারিবারিক বিষয়ে দক্ষ এবং অত্যন্ত পরিপাটি ছিলেন। নামাজ-রোজার খুবই গুরুত্ব দিতেন। তিনি সালেহা, আবেদা, সাবেরা ও শাকেরা রমনি ছিলেন। ১০ মুহররম ১৪৯৯ আশুরার রোজা রেখে ইফতারের পর তিনিও ইহকাল ত্যাগ করেন। ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন।

ভাইদের শিক্ষাদীক্ষা: তার মা-শরিক একজন ভাই, আপন চার ভাই এবং চারজন আপন বোন ছিলেন। মা-শরিক ভাইয়ের নাম আহমদ। যিনি তা থেকে বড় ছিলেন এবং নিজস্ব ভাই বোনদের মাঝে তিনিই ছিলেন বড়। পরে আবদুর রহমান, মৌলভি আবদুল মাজিদ, এরপর অধম। অতঃপর মাওলানা হাবিবুর রহমান। তিনি যখন দারুল উলুম দেওবন্দ থেকে শিক্ষার্জন করে ফারেগ হন, তখন আবদুর রহমানের বয়স ছিল ১৫ থেকে বেশি। অধম এবং আবদুল মাজিদ তখন মক্তবে পড়তাম। এজন্য প্রথমেই অধমকে নিজের সাথে দেওবন্দ নিয়ে যান, একবছর পর ভাই আবদুল মাজিদকেও কাছে ডাকেন। ফতোয়া প্রদানের অনুশীলনের সাথে সাথে আমাদের দুই ভাইকেও তিনি পড়াতেন।

পরিবার পরিজনের শিক্ষাদান: মরহুমের বৈবাহিক সম্পর্ক এবং সুন্নাতি আকদ মামু হাফেজ মৌলভি হাবিবুর রহমান সাহেব রাহিমাহুল্লাহর বড় মেয়ের সাথে ১৩৮৪ হিজরির শেষ দিকে সম্পন্ন হয়। তিনি কুরআনে করিমের ভালো একজন হাফেজ এবং ডাবিল থেকে শিক্ষার্জন করেন। তার সম্মানিত মাতার ইনতিকালের পর অধিকাংশ সময় ২৪ ঘণ্টায় কুরআনে করিম খতম করে ইসালে সওয়াব করতেন। কিন্তু যৌবনকালেই দুই মেয়ে, এক ছেলে রেখে তিনি মৃত্যুবরণ করেন।

মরহুমের সম্মানিতা স্ত্রী ছিলেন অত্যন্ত শাকেরা, সাবেরা, আবেদা ও জাহেদা একজন নারী। তিনি কুরআনে কারিমের একজন ভালো হাফেজাও ছিলেন। নিজের সমস্ত ছেলে-মেয়েদের হেফজের শিক্ষিকা ছিলেন। বিবাহের পর ঘরের কাজ আনজামের সাথে সাথে হজরত মাওলানা মরহুমের কাছে কুরআন মুখস্ত করেন। মুখস্থ করাকালীন ও তাকমিলের পর নিজের সমস্ত ছেলে-মেয়েদেরকে পবিত্র কুরআন মুখস্থ করান। (সর্বমোট ১১ ছেলে, দুই মেয়ে এবং দুই পুত্রবধূকে হাফেজ-হাফেজা বানিয়েছেন। উবায়দুল্লাহ)

বাকিয়াতে সালিহাত: এই ভাগ্যবান মহিলার ঔরস থেকেই তার ১১জন ছেলে, ৩ জন মেয়ে জন্মগ্রহণ করেন। সবচে বড় ছেলে একটি দুর্ঘটনায় শাহাদত বরণ করেন এবং এক মেয়ের বাল্যকালেই ইনতিকাল হয়ে যায়। (আরো এক ছেলে গত বছর মৃত্যুবরণ করেন।) মৃত্যুকালে ৯ জন ছেলে, দুইজন মেয়ে রেখে যান।

তার গুরুত্বপূর্ণ একটি ওসিয়ত: ছেলের অর্তমানে নাতিদের মিরাস থেকে বঞ্চিত হওয়া একটি প্রসিদ্ধ মাসআলা এবং এটা ফারাইজেী নীতিকথা ‘আলবকরাব ফাল বকরাব’- এর ওপর নির্ভর করে। এই নীতিমালা থেকেই পিতার বর্তমানে দাদা বঞ্চিত হয়, ভাইয়ের বর্তমানে অন্য ভাইয়ের সন্তান হয় বঞ্চিত । কিন্তু নাতিদের মাসআলা নিয়ে অনেক লোক ইসলামি শিক্ষার ওপর আঙ্গুল উঠাতে চেষ্টা করে। তারা বলে, এটা কেমন ইনসাফ? ছেলে উত্তরাধিকারী হবে। কিন্তু নাতি-নাতনি যারা সাধারণত দুর্বল এবং অসহায় হয়ে থাকে তারা মাহরুম থাকবে? এই অভিযোগ বাস্তবতায় মুসলমানদের কারণেই সৃষ্টি হয়েছে। ইসলামি শিক্ষা প্রত্যেক দিক থেকেই পরিপূর্ণ, ও স্বয়ংসম্পূর্ণ। কিন্তু যদি মুসলমানরা এর সঠিক পন্থার ওপর আমল না করেন, তাহলে এর চিকিৎসা কী হবে? ইসলাম এক তৃতীয়াংশে ওসিয়তের অধীকার তো দিয়েছে। যাতে তারা এমন নাজুক জরুরতে এই অধিকার প্রয়োগ করতে পারে। অতএব, দাদার জন্য উচিত হ, প্রথমে নাতি-নাতনিদের জন্য ওসিয়ত করা। প্রয়োজনে তাদেরকে ছেলের অংশ থেকেও বেশির ওসিয়ত করা। এখন যদি দাদা মালের মহব্বতে ওসিয়তের সাহস না করে এবং আকস্মিক চলে যায়। আর নাতি-নাতনিরা বঞ্চিত থাকে, তাহলে এটা ইসলামি শিক্ষার দোষ নয়, বরং দাদারই দোষ। সে-ই এর জিম্মাদার।

মাসআলা স্পষ্ট করার পর আমি হজরতের সংক্ষিপ্ত এই জীবনচরিত তার-ই একটি ওসিয়তের মাধ্যমে ইতি টানছি। যাতে যারা এমন অবস্থার সম্মুখীন, তারা তার মতো নিজেদের নাতি-নাতনিদের জন্য প্রয়োজনে ওসিয়ত করতে পারে। ‘লাইতা লাআল্লা’ করবে না। জীবনের তো কোনো সার্টিফিকেট নেই। আল্লাহ না করুক, যদি মানুষ হঠাৎ চলে যায়, তাহলে বাচ্চাদের পেরেশানি সত্ত্বেও দাদার এমন নীতি ইসলামি শিক্ষার ওপর অভিযোগের কারণ হয়ে দাঁড়াবে।

যখন হজরতের বড় ছেলে মুফতি রশিদ আহমাদ রাহিমাহুল্লাহর আকস্মিক শাহাদাতের ঘটনা ঘটে, তখন বাড়ি (পালনপুর) থেকে সমস্ত ভাই-বোন, আত্মীয়-স্বজন শোকবার্তার জন্য দেওবন্দে আসেন। তখন ভাই সাহেব রাহিমাহুল্লাহ নিজের ছেলেদের এবং ভাই-বোনদের সামনে মরহুমের বাচ্চাদের জন্য এই ওসিয়ত করলেন যে, ‘যতক্ষণ আমি জীবিত থাকব মারহুমের দুই বাচ্চাকে আমার ছেলেদের মতো লালন-পালন করব। আর মৃত্যুর পর আমার ত্যাজ্যসম্পত্তি থেকে মারহুমের প্রত্যেক বাচ্চা একজন ছেলের পরিমাণ অংশ পাবে। কেননা দুই ছেলের মিরাসও এক তৃতীয়াংশ থেকে কম হবে। আমার এক তৃতীয়াংশে ওসিয়তের অধিকার রয়েছে। তখম সমস্ত আত্মীয়-স্বজন এর সাক্ষী ছিলেন।

ওসিয়তের পর তার চোখ থেকে অশ্রু ঝরতে লাগলে বললেন: আল্লাহ তাআলার লক্ষ লক্ষ শোকরিয়া, যিনি আমার একজন বাচ্চা নিয়ে গেলেন, এর বদলে দুইজন বাচ্চা দান করলেন। এখন আমার বারোজন সন্তান হয়ে গেল।

আল্লাহ তাআলা হজরতুল উসতাজকে ক্ষমা করে জান্নাতুল ফেরদৌস নসিব করুন। পরিবার, ছাত্র এবং সমস্ত লাওয়াহিকিন ও ভক্তদেরকে সবরে জামিলের তাওফিক দান করুন।

লেখক : ওবায়দুল্লাহ আসআদ কাসেমী।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here