মাওলানা মাহফুজুল হক: একজন মুখলিস কর্মবীরের সহজ-সরল জীবন

22

শিখো বাংলায়: মাওলানা মাহফুজুল হক। সময়ের প্রতিভাবান আলেমেদ্বীন। দেশের প্রতিনিধিত্বশীল আলেমদের একজন। উপমহাদেশের প্রখ্যাত হাদীস বিশারদ, আপোষহীন সিপাহসালার শাইখুল হাদীস আল্লামা আজিজুল হক রহ. এর এই সুযোগ্য সন্তান ইসলাম ও মুসলিম উম্মাহর পক্ষে প্রসংশনীয় ভূমিকা রেখে চলছেন। শিক্ষা-আন্দোলন থেকে শুরু করে সামাজিক, রাজনৈতিক প্রতিটি অঙ্গনে রয়েছে তার সরব পদচারণা।

মাওলানা মাহফুজুল হক ছাত্রজীবন থেকেই অত্যন্ত মেধাবী হিসেবে পরিচিত। সুশৃংখল জীবন-যাপন, কাজকর্মে নিয়মানুবর্তিতা ও আমল-আখলাকে অতুলনীয় হিসেবে সকল উস্তাদের কাছেই ছিলেন প্রিয়পাত্র। পড়শোনার সূচনা তৎকালীন শীর্ষ দ্বীনি বিদ্যাপিঠ লালবাগ জামিয়া কুরআনিয়ায়। পড়াশোনার মূল অংশ অধ্যায়ন করেন জামিয়া রাহমানিয়ায়। এরপর মাদারে ইলমি দারুল উলুম দেওবন্দ থেকে শিক্ষাজীবন সমাপ্ত করে জামিয়া রাহমানিয়াতেই শিক্ষক হিসেবে যোগদান করেন। শিক্ষক হিসেবে নিয়োগের অল্প দিনেই সুখ্যাতি অর্জন করতে সক্ষম হন।

২০০১ -এ জামিয়া রাহমানিয়ার ক্রান্তিকালে তিনি নেতৃত্ব গ্রহণ করেন। ভাইস প্রিন্সিপাল হিসেবে কিছুদিন দায়িত্ব পালনের পর ২০০২ থেকে অত্যন্ত দক্ষতার সাথে জামিয়ার প্রিন্সিপাল হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। পড়াশোনার সর্বোচ্চ মান বজায় রেখে তালিম ও তরবিয়াতের পাশাপাশি ইসলাম ও মুসলিম উম্মাহর পক্ষে বলিষ্ঠ ভূমিকা পালন করায় জামিয়া রাহমানিয়া বিশেষভাবে আলোচিত। তিনি সেই ঐতিহ্যবাহী ধারাকে সমুন্নত রেখে জামিয়ার অগ্রযাত্রাকে আরও শাণিত করেছেন।

মাওলানা মাহফুজুল হকের কর্মের পরিধি আরও বিস্তৃত হয় ২০০৫ সনে। ওলামায়ে কেরামের সর্ববৃহত ঐক্যবদ্ধ প্লাটফর্ম বেফাকুল মাদারিসিল আরাবিয়ার যুগ্ম-মহাসচিব হিসেবে নির্বাচিত হন। কর্মতৎপর যুগ্ম-মহাসচিব হিসেবে দীর্ঘ এক যুগ অবধি বেফাকের প্রতিটি কর্মসূচিতে গুরুত্বপূর্ণ ভুমিকা রাখছেন। মাদরাসা শিক্ষাব্যবস্থার উন্নতি, নেসাব সংস্কার, কওমি সনদের স্বীকৃতি, কওমি কমিশন থেকে নিয়ে প্রতিটি ধাপেই রয়েছে তার সরব অংশগ্রহণ। এদেশের লক্ষ লক্ষ কওমি মাদরাসা ছাত্র শিক্ষকদের আশা আকাক্সক্ষার প্রতীক বেফাক যাদের অক্লান্ত পরিশ্রমের উপর ভর করে আজকের এই অবস্থানে এসেছে তাদের মধ্যে তিনি অন্যতম।

আশির দশকে জামিয়া মুহাম্মদিয়া ও জামিয়া রাহমানিয়া প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে মোহাম্মদপুর এলাকায় মাদরাসা-মসজিদ প্রতিষ্ঠা ও আলেম ওলামাদের যে সমাগম শুরু হয়েছিলো, সময়ের ব্যবধানে তা ক্রমান্নয়ে বৃদ্ধিই পেয়েছে।

বর্তমানে মোহাম্মদপুরে মাদরাসার সংখ্যা ত্রিশের অধিক। মাদরাসাগুলোর পরস্পর সম্পর্ক উন্নয়ন, প্রতিষ্ঠানের উন্নতি ও ঐক্যবদ্ধ অবস্থান সৃষ্টির জন্য প্রতিষ্ঠা হয়েছিল ইত্তেফাকুল মাদারিসিল কওমিয়া মুহাম্মদপুর। গত এক দশকে ইত্তেফাক তার সফলতার পথে অনেক দূর এগিয়ে গেছে। ঐক্যবদ্ধ পরীক্ষায় অংশগ্রহণ এবং গুরুত্বপূর্ণ যে কোনো ইস্যুতে অভিন্ন কর্মসূচি পালনের মাধ্যমে সারা ঢাকায় আলোড়ন সৃষ্টি করেছে উত্তেফাক। ইত্তেফাক গঠন এবং প্রতিটি কর্মসূচি সফল বাস্তবায়নের পিছনে অন্যতম কারিগর তিনি।

তার কর্মতৎপরতা শুধু শিক্ষা ক্ষেত্রেই সীমাবদ্ধ নয়, রাজনৈতিক অঙ্গনেও রয়েছে তার সক্রিয় উপস্থিতি। মাওলানা মাহফুজুল হক এদেশের ইসলামি আন্দোলনের স্থপতি শাইখুল হাদীস রহ. এর সন্তান। আন্দোলন সংগ্রামের মাঝেই তিনি বেড়ে উঠেছেন। কৈশোরের কচি বয়সে স্বৈরাচারী এরশাদের আমলে হজরত হাফেজ্জির আন্দোলনের সময় তিনি সর্বপ্রথম কারাবরণ করেন।

এ থেকে প্রতীয়মান হয় যে বাল্যবয়সেই তিনি সংগ্রামের পাঠ গ্রহণ করেছিলেন। বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের মাধ্যমে তিনি দলীয় রাজনীতিতে প্রবেশ করেন। শাইখুল হাদীস রহ. সক্ষমতার শেষ সময় পর্যন্ত বলিষ্ঠ হাতে সংগঠনের নেতৃত্ব দিলেও তার অবর্তমানে সংগঠন বার বার হোচট খেতে থাকে। এহেন সংকটময় সময়ে সংগঠনের হাল ধরতে হয় মাওলানা মাহফুজুল হক এর। ২০১২ সনে তিনি দলের নায়েবে আমির নির্বাচিত হন। এবং ২০১৩ থেকে তিনি দলের মহাসচিব হিসেবে দক্ষতার সাথে দায়িত্ব পালন করছেন।

সাম্প্রতিক কালের আলোড়ন সৃষ্টিকারী সংগঠন হেফাজতে ইসলামের নাস্তিক্যবাদবিরোধি আন্দোলনে তিনি ছিলেন সামনের কাতারে। ঢাকার বুকে দানাবেঁধে ওঠা আন্দোলনের অন্যতম রূপকার তিনি। বর্তমানে হেফাজতের ঢাকা মহানগরীর নায়েবে আমির হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। কওমি সনদের স্বীকৃতির আন্দোলনেও মাওলানা মাহফুজুল হক একটি আলোচিত নাম। স্বীকৃতি ইস্যুতে দেশের মূলধারার শীর্ষস্থানীয় ওলামায়ে কেরামের পক্ষে অবিস্মরণীয় ভূমিকা পালন করেন। তিনি হাইআতুল উলয়ার একজন গুরুত্বপূর্ণ সদস্য।

এছাড়াও অসংখ্য ইস্যুভিত্তিক সংগঠন ও সামাজিক সংগঠনের সাথে তিনি জড়িত। সারাদেশে ছড়িয়ে থাকা অসংখ্য মাদরাসা মসজিদ তার তত্ত্বাবধানে পরিচালিত হচ্ছে। সবগুলোই তিনি সফলভাবে পরিচালনা করছেন। ছোট কাজ করতে গিয়ে তার মাঝে থাকে না কোনো আড়ষ্টতা, বড় বড় দায়িত্ব পালনেও দেখা যায় না কোনো অহমিকা। সাদাসিধা জীবন-যাপনে অভ্যস্থ এই মহান কর্মবীরের প্রথম পছন্দই কাজ। পাহাড়সম কাজ ঠাণ্ডা মাথায় সূচারুরূপে আঞ্জাম দেয়ার এক অনন্য বৈশিষ্ট্যের অধিকারী তিনি।

দীনের এসকল খেদমতের পাশাপাশি তিনি প্রতিনিয়ত ছুটছেন দেশের আনাচে-কানাচে। সারা দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের মাহফিলগুলোতে যাচ্ছেন। অজপাড়াগাঁয়ের সাধারণ মানুষের কাছে দীনের দাওয়াত পৌঁছে দিচ্ছেন। তার কর্মের পরিধি এখন শুধু দেশেই সীমাবদ্ধ নয়, বিভিন্ন সেমিনার ও শিক্ষা প্রোগ্রামে অংশ নিতে সফর করেছেন দক্ষিণ আফ্রিকা, মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর, কাতার, ভারত পাকিস্তানসহ অসংখ্য দেশ।

আকাবের ওলামায়ে কেরামের শূন্যতায় হতাশাচ্ছন্ন আঁধারে আলোকবর্তিকা হয়ে যারা এগিয়ে আসছেন, তিনি তাদের অন্যতম। হজরত শাইখুল হাদীস রহ. যতদিন হায়াতে ছিলেন, তার প্রতিটি কাজ বাস্তবায়নে নিরবচ্ছিন্ন ভূমিকা রেখেছেন। পরবর্তীতে তার রেখে যাওয়া কাজগুলো দক্ষতার সাথে সামনে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন। আমরা মহান মালিকের দরবারে সুস্থতার সঙ্গে তার দীর্ঘ নেক হায়াত কামনা করি।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here