মসজিদের নিয়ন্ত্রণ আলেমদের হাতে নেই: মুফতি হাবীবুল্লাহ মাহমুদ কাসেমী

41

শুধু গণমাধ্যম ও সোশ্যাল মিডিয়া নয়, বাংলাদেশের প্রকৃত জনমত তৈরি হয় মসজিদে। মিম্বারের ধ্বনিতে। আলেমদের মাধ্যমে। ইসলামী সমাজ মূলত মসজিদকেন্দ্রিক। মসজিদ মুসলমানের সচিবালয়। সামাজিক ঐক্যের প্রতীক। মসজিদেই হওয়া উচিত জনকল্যাণমূলক সব কাজ। উদ্যোগ। শিক্ষা, বিয়ে-শাদী, সমাজসেবা, লঙ্গরখানাসহ বিভিন্ন সামাজিক কাজের প্রাণ কেন্দ্র হবে মসজিদ।

এক্ষেত্রে সবচেয়ে কার্যকরী ভূমিকা রাখেন মসজিদের খতিবগণ। কারণ তিনি  প্রতি সপ্তাহের শুক্রবার মুসুল্লিদের নানাবিষয়ে গঠনমূলক আলোচনা করে থাকেন। ধর্মীয় জ্ঞান ও মানবতার আলো ছড়িয়ে দেন চারদিকে। শিক্ষিত -শিক্ষিত ও অল্পশিক্ষিত  সর্বস্তরের মানুষই এ সামিয়ানার ছাত্র। বলা চলে মসজিদের মিম্বার মানুষের জীবনের উন্মুক্ত পাঠশালা। মিম্বার-মেহরাবের  আলো ঝলমলে এ পাঠশালার প্রধান কারিগর একজন খতিব। সমাজের মানুষকে আরো বেশি মসজিদমুখী করতে কিংবা মসজদিকে গণমূখী করতে নানা পরামর্শ নিয়ে হাজির হয়েছেন দেশের একজন খ্যাতিমান খতিব। তিনি হলেন ইকবাল রোড জামে মসজিদ, মুহাম্মদপুর, ঢাকা এর খতিব মুফতি হাবীবুল্লাহ মাহমুদ কাসেমী। তার সঙ্গে কথা বলেছেন  আওয়ার ইসলাম টোয়েন্টিফোর ডটকম সাংবাদিক- মোস্তফা ওয়াদুদ

আওয়ার ইসলাম: মসজিদকেন্দ্রিক সমাজ ব্যবস্থা গড়ে তোলার জন্য করণীয় কী?

মুফতি হাবীবুল্লাহ মাহমুদ কাসেমী: মসজিদ মুসলমানের কেন্দ্রবিন্দু। সুতরাং মসজিদ মুসলমানদের জীবন সংশ্লিষ্ট সকল বিষয়ের প্রাণকেন্দ্র হবে এটাই স্বাভাবিক। মানুষকে আল্লাহ তায়ালা সৃষ্টি করেছেন সফল হওয়ার জন্য। ব্যর্থ হওয়ার জন্য মানুষকে সৃষ্টি করা হয়নি। আর মানুষের সাফল্যের পথ ও তার পদ্ধতি পরিস্কার করে বলা হয়েছে কুরআনে কারীমে। ‘যাকে জাহান্নাম থেকে মুক্তি দিয়ে জান্নাতে প্রবেশ করিয়ে দেয়া হলো সে সফলকাম হবে।’ (সুরা নিসা)

মানুষ সফল কিভাবে হবে? সাফল্যের পথ কিভাবে পাবে? তা কুরআনে আল্লাহ তায়ালা বলে দিয়েছেন। হাদিসে রাসূল সা. বলে দিয়েছেন। আর কুরআন-হাদিসে বর্ণিত এ বিষয়গুলো বেশি জানেন উলামায়ে কেরাম। আল্লাহ তায়ালা উলামায়ে কেরামকে এ নেয়ামাত দান করেছেন। আর উলামায়ে কেরামই এ বিষয়গুলো মানুষকে জানিয়ে থাকেন।

কিন্তু সবকিছু জানানোর জন্য একটি অফিস লাগে। যেমন হসপিটাল একটি অফিস। এখানে চিকিৎসা সেবা প্রদান করা হয়।
ইঞ্জিনিয়ারিং তৈরির জন্য আলাদা অফিস আছে। তারা মান নির্ণয় করে। অর্থনৈতিক বিভাগের জন্য আলাদা অফিস আছে। মোটকথা সবকিছু পরিচালনার জন্য অফিস আছে আলাদা আলাদা। আল্লাহ তায়ালার দীন শিখানোর জন্য ও মানুষকে জান্নাতের পথ সম্পর্কে জানানোর জন্য আল্লাহ তায়ালা যে অফিস নির্ধারণ করে দিয়েছেন সেটা হলো আল্লাহর ঘর মসজিদ। মসজিদ থেকে যে দিক-নির্দেশনা দিবে। সে মোতাবেক তার জীবন পরিচালনা করবে।

বস্তুত! বর্তমানে মানুষ মনে করে ক্ষেত-খামার, চাকরি-বাকরি সব দুনিয়ার কাজ। আর ইসলাসের কাজ হলো শুধু নামাজ পড়া। আসলে বিষয় এটা না। বরং দুনিয়ার কাজকেও আখেরাতের কাজের সাথে সম্পৃক্ত করে দেয়া হয়েছে। দুনিয়ার কাজগুলো যদি আল্লাহর দেখানো পথে ও রাসূলের সুন্নাহ মোতাবেক হয় তাহলে সে সফলকাম হবে। অনেকে এ বিষয়গুলো জানেন না।

আপনি দেখবেন, যারা জানে যে আমার দুনিয়ার সমস্ত কাজকর্ম হলো আখেরাতকে পাওয়ার জন্য। তারা কিন্তু নিজেদের জীবনকে মসজিদের সাথে লাগিয়ে রেখেছে। অর্থাৎ যারা ইসলাম সম্পর্কে সচেতন। ইসলামী কার্যক্রম সম্পর্কে সচেতন তারা অবশ্যই মসজিদমুখী। এখন একজন খতিবের কাজ হলো, সাধারণ মানুষকে এ বিষয়গুলো ভালো করে বুঝানো। যদি একবার সাধারণ মানুষের বুঝ চলে আসে তাহলে সে মসজিদ ছাড়বে না। বরং তার দুনিয়ার যাবতীয় কাজ, বিয়ে-শাদি, বিচার-সালিশসহ আরও যত রকমের জীবনঘনিষ্ঠ বিষয় থাকতে পারে এসবকিছু সে মসজিদেই করবে। তখন মানুষকে মসজিদমুখী করা যাবে।

এককথায় বলতে পারি, যদি মানুষের মাঝে আখেরাতের প্রতি সচেতনতা তৈরি হয়, তাহলে মানুষ মসজিদমুখী হবে। আর দুনিয়াকে প্রাধান্য দিয়ে যখন মানুষ আখেরাত থেকে গাফেল থাকবে তখন সে মসজিদ থেকেও বিমুখ থাকবে। আর মসজিদ থেকে যখন দূরে সরে পড়বে তখন সবকিছু থেকেই সে দূরে সরে পড়বে। তবে এখন এটা নেই।

রাসূল সা. ও সাহাবায়ে কেরামের সময়ে মসজিদ থেকেই বিচারকার্যসহ সবধরনের কাজ পরিচালনা করা হতো। কিন্তু যখন সমাজ বড় হতে লাগলো। সমাজের বিচারকার্য বাড়তে লাগলো। তখন সমাজের প্রয়োজনেই আলাদা বিচারের স্থানের প্রয়োজন পড়লো।

তবে বর্তমানে আপনি দেখবেন, যে এলাকার মানুষের সচেতনতা যতটুকু হয়েছে সে এলাকার মানুষ ততটাই মসজিদমুখী। তারা মসজিদেই তাদের বিয়ে-শাদি সম্পাদন করছে। আজ থেকে ৩০ বা ৫০ বছর আগে এটা তেমন ছিলো না। এখন মসজিদে বিয়ে-শাদি অনেক বেড়েছে। আমার মসজিদে আমি এমনও জুমা আছে যে তিন, চারটি বিয়ে পড়িয়েছি। মোটকথা সচেতনতা বৃদ্ধি পেলে সমাজ মসজিদকেন্দ্রিক হয়ে উঠবে। মসজিদকেই তখন জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে মানুষ মনে করতে থাকবে।

শিখো বাংলায়: ‘নামাজ শেষ মসজিদ তালা’-এ সংস্কৃতি নিয়ে যদি কিছু বলতেন।

মুফতি হাবীবুল্লাহ মাহমুদ কাসেমী: মসজিদগুলোর নিয়ন্ত্রণ যদি আলেমদের কাছে থাকতো, তাহলে মসজিদের চিত্র এরকম হতো না। বরং অন্যরকম হতো। এটা অত্যন্ত দুঃখের সাথেই বলতে হয় যে, মসজিদগুলোর নিয়ন্ত্রণ আলেমদের হাতে নেই। বরং সাধারণ মানুষদের হাতে এর নিয়ন্ত্রণ। সুতরাং যা হওয়ার তাই হচ্ছে। নামাজ শেষে মসজিতে তালা ঝুলছে।

একটি সূত্র আমরা জানি, মেডিকেল বা হাসপাতালের নিয়ন্ত্রণ ডাক্তাররাই করবেন। ইঞ্জিনিয়ারিং ইউনিভার্সিটির ব্যাপারে আমরা জানি, এখানে সর্বেসর্বা হবেন ইঞ্জিনিয়াররা। প্রশাসনের ব্যাপারে যারা প্রশাসনিক সাইটে দক্ষ তারাই দায়িত্বে থাকবেন। একেক সাইটের নিয়ন্ত্রন ঐ বিষয়ে দক্ষদের হাতেই থাকে। সব ক্ষেত্রেই আমরা এ কাইটেরিয়া ফলো করি।

কিন্তু মসজিদ নিয়ন্ত্রণের জন্য কোনো যোগ্যতা বা কাইটেরিয়া আমরা নির্ণয় করি না। আপনি দেখেন যে, ইমাম খতীবের জন্য আমরা কতভাবে যোগ্যতা নির্ণয় করি। কিন্তু ইমাম খতীবদের যারা পরিচালনা করবেন বা মৌলিকভাবে যারা তাদের উপর কর্তৃত্ব করবেন, তাদের কী কী যোগ্যতা থাকতে হবে সেটা কি কখনো নির্ণয় করতে দেখেছেন?

মসজিদ কমিটিতে আসার জন্য কী কী যোগ্যতা থাকতে হবে এটা কিন্ত কেউ ফলো করে না। অথচ কুরআনুল কারিমে বলা আছে, মসজিদ আবাদ কারা করবে। মসজিদ নিয়ন্ত্রণ কারা করবে। সে ব্যাপারে দিক-নির্দেশনা দেয়া আছে। আল্লাহ বলেন, ‘আল্লাহর ঘর মসজিদ তারাই তা’মীর করবে যারা ঈমান গ্রহণ করেছে আল্লাহ ও তার রাসূলের উপর, এবং নামাজ কায়েম করে, যাকাত দেয়। এবং তারা কেবল আল্লাহকেই ভয় করে।’ (আল কুরআন)

অতএব আমি মনে করি এ ক্যাটাগরির মানুষ মসজিদ নিয়ন্ত্রণের দায়িত্ব নিলে আর কোনো সমস্যা থাকবে না। মসজিদে নামাজ শেষে তালাও ঝুলবে না।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here