সাদুদ্দীন সাদী ।।

শিখোবাংলায়.কম: মূর্তি ও ভাস্কর্যের মধ্যে কোনো যোগসূত্রই নেই বলে অনেকে যে ধারণা দেওয়ার চেষ্টা করেছেন-তা ইতিহাস ও বাস্তবতার নিরিখে একদম ভুল। মানব সভ্যতার শুরুতে থেকে ভাস্কর্য নির্মাণ ও চিত্রশিল্পের নমুনা পাওয়া যায়। নুহ আ. এর সম্প্রদায় নেক্কার লোকদের ভাস্কর্য তৈরি করে এক পর্যায়ে পূজা শুরু করে বলে কুরআন শরীফের ব্যাখ্যা গ্রন্থগুলোতে পাওয়া যায়।

ইমাম বগভী বর্ণনা করেন, এই পাঁচ জন প্রকৃতপক্ষে আল্লাহ তাআলার নেক ও সৎকর্মপরায়ণ বান্দা ছিলেন। তাদের সময়কাল ছিল হযরত আদম ও নূহ আ.-এর আমলের মাঝামাঝি। তাঁদের অনেক ভক্ত ও অনুসারী ছিল। তাঁদের ওফাতের পর ভক্তরা সুদীর্ঘকাল পর্যন্ত তাদের পদাঙ্ক অনুসরণ করে আল্লাহ তাআলার এবাদত ও বিধি-বিধানের প্রতি আনুগত্য অব্যাহত রাখে। কিছুদিন পর শয়তান তাদেরকে এই বলে প্ররোচিত করল : তোমরা যেসব মহাপুরুষের পদাঙ্ক অনুসরণ করে উপাসনা কর, যদি তাদের মূর্তি তৈরি করে সামনে রেখে লও, তবে তোমাদের উপাসনা পূর্ণতা লাভ করবে এবং বিনয় ও একাগ্রতা অর্জিত হবে। তারা শয়তানের ধোঁকা বুঝতে না পেরে মহাপুরুষদের প্রতিকৃতি তৈরি করে উপাসনালয়ে স্থাপন করল এবং তাদের স্মৃতি জাগরিত করে এবাদতে বিশেষ পুলক অনুভব করতে লাগল। এমতাবস্থায়ই তাদের সবাই একে একে দুনিয়া থেকে বিদায় নিয়ে গেল এবং সম্পূর্ণ নতুন এক বংশধর তাদের স্থলাভিষিক্ত হল। এবার শয়তান এসে তাদেরকে বোঝাল : তোমাদের পূর্বপুরুষদের খোদা ও উপাস্য মূর্তিই ছিল। তারা এই মূর্তিগুলোরই উপাসনা করত। এখান থেকে প্রতিমাপূজার সূচনা হয়ে গেল।’’ (সংক্ষিপ্ত মাআরিফুল কুরআন পৃ. ১৪০৮)

তাহলে দেখা যাচ্ছে, স্মারক মূর্তি থেকেই পূজার মূর্তির সূচনা।

বাংলা পিডিয়ায় ভাস্কর্যের যে প্রবন্ধটি রয়েছে তার সারকথাই হল, এই শিল্পের সূচনা ও বিকাশ পুরোটাই ঘটেছে মূর্তিকে কেন্দ্র করে। বিখ্যাত ও প্রাচীন সকল ভাস্কর্যই বিভিন্ন দেবদেবীর মূর্তি। কিছু উদ্ধৃতি তুলে দিচ্ছি :

ক. ‘এই শিল্পের কেন্দ্র ছিল মথুরা।  এখানে সে সময় ব্রাক্ষণ, বৌদ্ধ ও জৈন মূলত এই প্রধান তিনটি কেন্দ্রের অনুসারীরা পূজার নিমিত্তে মূর্তি বানাতে গিয়ে এর সূচনা করেছিল।’ (বাংলা পিডিয়া প্রকাশনায় : বাংলাদেশ এশিয়াটিক সোসাইটি, প্রথম প্রকাশ : চৈত্র ১৪০৯/মার্চ ২০০৩, খ  : ৭, পৃষ্ঠা : ৩৩৩)

খ.‘গুপ্ত শাসকগণ ছিলেন একনিষ্ঠ বৈষ্ণব। প্রাথমিক গুপ্তমূর্তিগুলোর বেশির ভাগই বিষ্ণু অথবা বিষ্ণু সংশ্লিষ্ট অন্য যে কোন মূর্তি।  এ যুগের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভাস্কর্যটি বিহারের ভাগলপুরের শাহকুন্ড  থেকে আবিষ্কৃত নরসিংহ মূর্তি।’ (প্রাগুক্ত পৃ. ৩৩৪)

গ. ‘বাংলার গুপ্ত ভাস্কর্যগুলো বেশির ভাগই প্রতীকী এবং এগুলির আকৃতি নির্ধারিত হয়েছে মধ্যদেশ বা মধ্যভারতের পুরোহিত কর্তৃক বর্ণিত দেবতাদের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য অনুসারে।’ (প্রাগুক্ত  পৃ. ৩৩৫)

ঘ. ‘অষ্টম শতাব্দীর মাঝামাঝিতে পাল সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর পরিস্থিতির উন্নতি হতে শুরু করে। পাল রাজারা বৌদ্ধ ধর্মের একনিষ্ঠ অনুসারী ছিলেন এবং এ ধর্মের মহাযান মতবাদটি তাদের উদার পৃষ্ঠপোষকতা লাভ করে।

‘পাল ভাস্কর্যের সর্বপ্রাচীন নমুনাটি ধর্মপালের ২৬ রাজ্যাঙ্কের (আনুমানিক ৭৭৫-৮১০ খৃ.) যা বিহারের গয়া থেকে পাওয়া গেছে। দেবপালের সময়ের তারিখ সম্বলিত বলরামের দুটি ব্রোঞ্জ ভাস্কর্য ও তারার একটি প্রস্তর ভাস্কর্য এ অঞ্চল থেকেই পাওয়া গেছে।’ (প্রাগুক্ত, পৃ. ৩৩৭-৩৩৮)

ঙ. ‘বাংলার বিভিন্ন এলাকা থেকে দশম শতকে যে সকল ভাস্কর্য আবিষ্কৃত হয়েছে তাতে বৌদ্ধ মূর্তির সঙ্গে অনেক ব্রাক্ষণ্যমূর্তিও অন্তর্ভুক্ত। উদাহরণ হিসেবে প্রতীকী চিহ্ন সম্বলিত বেশ কিছু মনসা মূর্তির কথা বলা যায়, যেগুলি এ অঞ্চলের প্রথম পর্যায়ের ভাস্কর্য হিসেবে পরিচিত।’ (প্রাগুক্ত পৃ. ৩৩৯)

চ. ‘পশ্চিম দিনাজপুরের এহনাইল থেকে প্রাপ্ত লক্ষ্মী-নারায়ণের যুগল মূর্তিটি (২৪.৪ সেমি) তাদের কমনীয় আলিঙ্গনভঙ্গির জন্য শতাব্দীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ ভাস্কর্য হিসেবে প্রতীয়মান।’ (প্রাগুক্ত পৃ. ৩৩৯)

এধরনের আরো অনেক উদ্ধৃতি উল্লেখ করা যেতে পারে।

বাংলা পিডিয়ায় ‘মূর্তিতত্ত্ব’ শীর্ষক প্রবন্ধ থেকে কিছু উদ্ধৃতি তুলে দিচ্ছি :

ক. ‘মহাজাগতিক বা পঞ্চবোধিসত্ত্ব বাংলায় পৃথকভাবে পূজিত হতেন। মান্দার (নওগাঁ জেলা) ভারসন থেকে প্রাপ্ত ও বরেন্দ্র জাদুঘরে রক্ষিত মস্তকবিহীন কালো পাথরে খোদিত ধ্যানীবুদ্ধ অক্ষোভ্যের এ অনিন্দ্যসুন্দর ভাস্কর্যটি পঞ্চবোধিসত্ত্ব ভাস্কর্যের একটি প্রকৃষ্ট উদাহরণ।’ (প্রাগুক্ত খ  : ৮, পৃ. ৩১৪)

জৈন ধর্মীয় মূর্তি প্রসঙ্গে বলতে গিয়ে নিবন্ধকার বলেন,

খ. শুধু বর্ধমানেই নয়, পশ্চিমবঙ্গের পুরুলিয়া, মেদিনীপুর ও বাকুড়া জেলাগুলিতে প্রচূর সংখ্যক পাথরের জৈন ভাস্কর্য ও অন্যান্য পুরাবস্ত্ত আবিষ্কৃত হয়েছে। এগুলির মধ্যে কিছু কিছু এখনও সেখানে পূজিত হচ্ছে, আবার কিছু কিছু জাদুঘরে সংরক্ষিত আছে। (প্রাগুক্ত পৃ. ৩১৮)

মোটকথা, ভাস্কর্য থেকে মূর্তি এবং মূর্তি থেকে ভাস্কর্য-এই চলাচলই হল মূর্তি ও ভাস্কর্যের সুদীর্ঘ ইতিহাসের সারকথা। একে অস্বীকার করা বাস্তবতাকেই অস্বীকার করার নামান্তর।