শিখোবাংলায়.কম: আত্মমর্যাদাবোধে অনন্য ধর্ম ইসলাম। নিজের শ্রেষ্ঠত্ব ও মর্যাদা রক্ষায় অনড়। নিজ স্বকীয়তা ও স্বতন্ত্র্যতা রক্ষায় সদা অবিচল। ইসলাম তার অনুসারীদেরকে এর শিক্ষা দিয়েছে পূর্ণ মাত্রায়। কোনো মুসলিম নিজ কর্মে ইসলামের শ্রেষ্ঠত্ব, মর্যাদা, স্বাতন্ত্র্য ও স্বকীয়তার গ-ি অতিক্রম করবে- এই সুযোগ রাখেনি ইসলাম। আল্লাহ তায়ালার প্রিয় হাবিব সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেছেন, ‘যে ব্যক্তি নিজ কাজে-কর্মে কোনো জাতির অনুসরণ করবে কিয়ামতের দিন সে তাদের দলভুক্ত হবে’। (আবু দাউদ শরিফ, হাদিস ৪০৩১)

ইসলাম নিজ স্বতন্ত্র্যতা রক্ষায় তার অনুসারীদের ‘হারাম’ নামক এক ফলপ্রসু রক্ষাকবচ উপহার দিয়েছে। হারাম থেকে বাঁচাতে এর নিকটবর্তী না হওয়ারও মজবুত নির্দেশনা দিয়েছে ইসলাম। প্রিয় নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেছেন, হালালও স্পষ্ট এবং হারামও স্পষ্ট। আর এ দু’য়ের মাঝে রয়েছে বহু সন্দেহজনক বিষয়- যা অনেকেই জানে না। যে ব্যক্তি সেই সন্দেহজনক বিষয়সমূহ থেকে বেঁচে থাকবে, সে তার দিন ও মর্যাদা রক্ষা করতে পারবে।

আর যে সন্দেহজনক বিষয়সমূহে লিপ্ত হয়ে পড়ে, তার উদাহরণ সে রাখালের ন্যায়, যে তার পশু বাদশাহর সংরক্ষিত চারণভূমির আশেপাশে চরায়, অচিরেই সেগুলোর সেখানে ঢুকে পড়ার আশংকা রয়েছে। জেনে রাখ যে, প্রত্যেক বাদশাহরই একটি সংরক্ষিত এলাকা রয়েছে। আরো জেনে রাখ যে, আল্লাহর যমীনে তাঁর সংরক্ষিত এলাকা হলো তাঁর নিষিদ্ধ কাজসমূহ। জেনে রাখ, শরীরের মধ্যে একটি গোশতপি- আছে, তা যখন ঠিক হয়ে যায়, গোটা শরীরই তখন ঠিক হয়ে যায়। আর তা যখন নষ্ট হয়ে যায়, গোটা শরীরই তখন নষ্ট হয়ে যায়। জেনে রাখ, সে গোশতপি-টি হলো কলব (অন্তর)। (বুখারি শরিফ, হাদিস: ৫২)

ভাস্কর্য নির্মাণ করা, আল্লাহ তায়ালার নিষিদ্ধ এলাকায় প্রবেশের অন্যতম উপসর্গ। এর মাঝে পরোক্ষভাবে নিহিত রয়েছে মূর্তি পূজার প্রতি উদার্ত আহবান। এতে করে মানুষের অন্তর থেকে ক্রমেই হ্রাস পাবে মূর্তি ও ভাস্কর্যের অসারতা। মনের অজান্তেই মানুষের অন্তরে স্থান পাবে মূর্তি ও ভাস্কর্য প্রীতি। মুসলিম হয়েও পৌত্তলিকদের মূর্তি পূজোয় অংশগ্রহণে বিন্দুমাত্র দ্বিধাবোধ হবে না তার মনে।

সময়ের ব্যবধানে সম্মান প্রদর্শনের উদ্দেশ্যে নির্মিত ভাস্কর্যই পরিণত হবে একান্ত পূজনীয় উপাস্যরূপে। মানুষ ভুলে যাবে ঐশী গ্রন্থ কুরআনুল কারিমের দ্ব্যর্থহীন ঘোষণা, ‘নিশ্চয়ই শিরক করা ভয়াবহ জুলুম’। (সুরা লুকমান- ১৩) ভুলে যাবে মহা গ্রন্থ আল কুরআনের কঠিন সতর্কবাণী, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ তাঁর সাথে শরিক করাকে ক্ষমা করবেন না, তবে এছাড়া অন্যান্য (গোনাহ) যার জন্য ইচ্ছা- ক্ষমা করবেন। আর যে ব্যক্তি আল্লাহর সাথে শরিক করেছে, সে ভয়াবহ গোমরাহীতে লিপ্ত হয়েছে’।

এর জলন্ত প্রমাণ মেলে কুরআন, হাদিস, তাফসির ও ইতিহাসের পাতা উল্টালে। হযরত নূহ আলাইহিস সালামের আগমন পূর্ববর্তী সময়ের কথা। ভাস্কর্য নির্মাণের সূচনাকাল। হযরত নূহ আলাইহিস সালামের সম্প্রদায় নির্মাণ করেছিল পাঁচটি ভাস্কর্য। তারা সেগুলোর পূজা করত। নূহ আলাইহিস সালাম তাদেরকে একত্ববাদের দাওয়াত দিলে ঔদ্ধত্যভরে তারা তা প্রত্যাখ্যান করে। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেছেন, ‘নূহ বললেন, ‘হে আমার রব! ওরা আমার কথা অমান্য করেছে এবং এমন ব্যক্তির আনুগত্য করেছে, যার সম্পদ ও সন্তানসন্ততি কেবল তা ক্ষতিই বৃদ্ধি করেছে।

আর ওরা ভয়ানক চক্রান্ত করেছে এবং বলেছে, তোমরা তোমাদের উপাস্যদের কিছুতেই ত্যাগ করো না এবং ত্যাগ করো না- ‘ওয়াদ’, ‘সুয়া‘আ’, ‘ইয়াগুছ’, ‘ইয়া‘উক’ ও ‘নসরকে’। এভাবে ওরা পথভ্রষ্ট করেছে বহু মানুষকে। আর (ইয়া আল্লাহ) আপনি জালেমদের পথভ্রষ্টতা ছাড়া কিছুই বৃদ্ধি করবেন না’। (সুরা নূহ, আয়াত ২১- ২৪)

উপরোক্ত ২৩ নং আয়াতের তাফসিরে ইমাম কুরতুবি রহ. লিখেন- মুহাম্মদ ইবনে কা‘ব রহ. বলেন, হযরত আদম আলাইহিস সালামের পাঁচ পুত্র ছিল: (পর্যায়ক্রমে তারা হল) ‘ওয়াদ’, ‘সুয়া‘আ’, ‘ইয়াগুছ’, ‘ইয়া‘উক’ ও ‘নসর’। তারা ছিল ইবাদতগুজার বান্দা। একদিন তাদের একজন মৃত্যু বরণ করে।

এতে তারা সকলেই ব্যথিত হয়। ইতোমধ্যেই শয়তান এসে বলে, আমি তোমাদের জন্য তার একটি প্রতিকৃতি বানিয়ে দেই। তোমরা তা দেখে তাকে স্মরণ করবে। (তারা তার কথায় সম্মতি জানায় এবং তাকে তাদের ভাইয়ের প্রতিকৃতি বানানোর) অনুমতি দেয়। ফলে শয়তান মসজিদে পিতল ও সীসা দ্বারা তার (তাদের ভাইয়ের) প্রতিকৃতি বানিয়ে দেয়। এরপর আরেকজন মৃত্যুবরণ করলে সে তারও প্রতিকৃতি বানায়।

একের পর এক সকলেই মৃত্যুবরণ করে। শয়তান তাদের সকলের প্রতিকৃতি নির্মাণ করে। সময়ের পরিক্রমায় তারা আল্লাহর ইবাদত ছেড়ে দেয়। শয়তান তাদেরকে (নিন্দার স্বরে) বলে, কি ব্যাপার! তোমরা দেখি কোনো কিছুরই ইবাদত করছ না? উত্তরে তারা বলে, আমরা কিসের ইবাদত করব? শয়তান উত্তরে বলে, তোমাদের এবং তোমাদের বাপ-দাদাদের প্রভুসমূহের ইবাদত করবে। তোমরা কি তোমাদের এবং তোমাদের বাপ-দাদাদের প্রভুদেরকে তোমাদের মসজিদে দেখ না? তোমাদের বাপ-দাদারা আল্লাহর পরিবর্তে এদেরই ইবাদত করেছে।

তখন আল্লাহ তায়ালা হযরত নূহ আলাইহিস সালামকে প্রেরণ করেন। নূহ আলাইহিস সালাম তাদেরকে একত্ববাদের দাওয়াত দিলে তারা তার দাওয়াত প্রত্যাখ্যান করে তাদের সম্প্রদায়ের লোকদেরকে বলে, তোমরা তোমাদের উপাস্যদের কিছুতেই ত্যাগ করো না এবং ত্যাগ করো না- ‘ওয়াদ’, ‘সুয়া‘আ’, ‘ইয়াগুছ’, ‘ইয়া‘উক’ ও ‘নসরকে’। মুহাম্মদ ইবনে কা‘বও এবং মুহাম্মদ ইবনে কায়েস রহ. বলেন, ‘ওয়াদ’, ‘সুয়া‘আ’, ‘ইয়াগুছ’, ‘ইয়া‘উক’ ও ‘নসর’, এরা ছিল আদম আলাইহিস সালাম ও নূহ আলাইহিস সালামের মধ্যবর্তী সময়ের কয়েকজন সৎলোক। তাদের কিছু অনুসারি ছিল, যারা তাদের অনুসরণ করত। তারা মৃত্যুবরণ করলে শয়তান তাদের অনুসারিদের সামনে তাদের প্রতিকৃতি বানানোর কিছু ভাল দিক ফুটিয়ে তোলে। শয়তান তাদের অনুসারীদের এ কথা বুঝাতে সক্ষম হয় যে, তাদের প্রতিকৃতি বানানো হলে তোমরা তা দেখে তাদের ত্যাগের কথা স্বরণ করবে এবং আত্মপ্রশান্তি লাভ করবে।

এরপর শয়তান তাদের প্রতিকৃতি বানিয়ে দেয়। এক সময় এ সকল অনুসারীদের সকলেই মৃত্যুবরণ করে। নতুন প্রজন্মের আগমন ঘটে। তারা বলে, হায় আমরা যদি জানতাম আমাদের বাপ-দাদারা এ সকল মূর্তির সাথে কেমন আচরণ করেছে! শয়তান তাদের আক্ষেপ পূরণে দ্রুত এসে উপস্থিত হয় তাদের কাছে। এসে বলে, তোমাদের বাপ-দাদারা তো তাদের ইবাদত করত। যেন শয়তান এ সংবাদ দিয়ে তাদের উপর অনুগ্রহ করেছে এবং বৃষ্টির পানি দ্বারা তাদেরকে সিক্ত করেছে। ফলে তারাও তাদের ইবাদত শুরু করল। এভাবেই সে সময় থেকে মূর্তিপূজার সূচনা হয়। (তাফসিরে কুরতুবি ১০/৫০৮)

হযরত ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, যে প্রতিমার পূজা নূহ আলাইহিস সালাম এর কওমের মাঝে প্রচলিত ছিল, পরবর্তী সময়ে আরবদের মাঝেও তার পূজা প্রচলিত হয়েছিল। ‘ওয়াদ’ দাওমাতুল জান্দাল নামক স্থানে অবস্থিত কালব্ গোত্রের একটি দেবমূর্তি। ‘সূওয়া‘আ’ হলো, হুযায়ল গোত্রের একটি দেবমূর্তি এবং ‘ইয়াগুছ’ ছিল মুরাদ গোত্রের, অবশ্য পরবর্তীতে তা গাতীফ গোত্রের হয়ে যায়। এর আস্তানা ছিল কওমে সাবার নিকটবর্তী ‘জাওফ’ নামক স্থানে। ইয়াউক ছিল হামাদান গোত্রের দেবমূর্তি, নাস্র ছিল যুলকালা গোত্রের হিময়ার শাখারদের মূর্তি।

এসব নূহ (আ.) এর সম্প্রদায়ের কতিপয় নেক লোকের নাম। তারা মারা গেল। তারা মারা গেলে, শয়তান তাদের কওমের লোকদের অন্তওে এ কথা ঢেলে দিল যে, তারা যেখানে বসে মজলিস করত, সেখানে তোমরা কতিপয় মূর্তি স্থাপন কর এবং ঐ সমস্ত পুণ্যবান লোকের নামানুসারেই এগুলোর নামকরণ কর। সুতরাং তারা তাই করল, কিন্তু তখনও ঐ সব মূর্তির পূজা করা হত না। তবে মূর্তি স্থাপনকারী লোকগুলো মারা গেলে এবং মূর্তিগুলো সম্পর্কে সত্যিকারের জ্ঞান বিলুপ্ত হলে লোকজন তাদের পূজা করতে শুরু করে দেয়। (বুখারি শরিফ, হাদিস ৪৯২০)

তাছাড়া ভাস্কর্য নির্মাণ পৌত্তলিকদের সাথে সাদৃশ্যতার প্রমাণ বহন করে। ইসলাম কোনো বিজাতীয় সংস্কৃতির সাথে সাদৃশ্যতা অবলম্বন সমর্থন করে না। এ থেকে বারণ করে ইসলাম ঘোষণা দিয়েছে ‘যে ব্যক্তি নিজ কাজে-কর্মে কোনো জাতির অনুসরণ করবে কিয়ামতের দিন সে তাদের দলভুক্ত হবে’। (আবু দাউদ শরিফ, হাদিস ৪০৩১)

অপর এক হাদিসে রসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এরশাদ করেছেন, ‘(কিয়ামতের দিন) মানুষের মধ্যে সবচেয়ে কঠিন শাস্তি হবে তাদের, যারা ছবি বানায় এবং মূর্তি ও ভাস্কর্য নির্মাণ করে। (সহিহ বুখারি, হাদিস ৫৯৫০)

রসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম অনত্র এরশাদ করেছেন, ‘যারা এ জাতীয় প্রাণীর ছবি, মূর্তি বা ভাস্কর্য তৈরি করে, কিয়ামতের দিন তাদেরকে শাস্তি দেয়া হবে। তাদের বলা হবে, তোমরা যা বানিয়েছিলে তা জীবিত কর’। (সহিহ বুখারি, হাদিস ৫৯৫১)

তিনি আরো এরশাদ করেছেন, ‘কিয়ামতের দিন সেসব মানুষের সবচেয়ে কঠিন আযাব হবে, যারা আল্লাহর সৃষ্টির (প্রাণীর) অনুরূপ তৈরী করবে’। (সহিহ বুখারি, হাদিস ৫৯৫৪)

তাই, আমাদের উচিত এমন সকল কাজ থেকে বিরত থাকা যাতে বিজাতীয়দের সাথে সাদৃশ্য অবলম্বন হয়, আল্লাহ তায়ালা অসন্তুষ্ট হন ও তার লানত বর্ষিত হয়। আল্লাহ তায়ালা আমাদেরকে তার সন্তুষ্টি অনুযায়ী জীবন-যাপন করে অসীম জান্নাতের অধিকারী হওয়ার তওফিক দান করুন। আমিন।

লেখক: শিক্ষার্থী, ফতোয়া বিভাগ, জামিয়া রাহমানিয়া আরাবিয়া