মুফতি কামরুজ্জামান।।

শিখোবাংলায়.কম: হিজরি ক্যালেন্ডারে আমরা এখন পবিত্র রবিউল আউয়াল মাস অতিক্রম করছি, নবী কারীম সা. এর জন্ম সংক্রান্ত যে তারিখ গুলোর বর্ননা পাওয়া যায় তার মধ্যে এ মাসের ১২ তারিখ অন্যতম। তবে এ তারিখটি সর্বসম্মত নয়, বরং নবীজী সা. এর জন্ম তারিখ সম্পর্কে বিভিন্ন বর্ননা রয়েছে, যেমন- ৮ ই রবিউল আউয়াল ইত্যাদি। সুতরাং মিলাদুন্নবী উপলক্ষে রবিউল আউয়াল মাসটি আমাদের ‍নিকট খুবই গুরুত্বপূর্ণ।

কিন্তু অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় পবিত্র এ মাসেই চরমপন্থী খ্রিস্টান দেশ ফ্রান্স রাষ্ট্রীয়ভাবে প্রিয় নবী সা. এর আবমাননায় লিপ্ত হয়েছে। ব্যাঙ্গাত্বক কার্টুন প্রকাশ করে গোটা মুসলিম উম্মাহর হৃদয়কে ক্ষত-বিক্ষত করেছে। এদের দৃষ্টান্ত মক্কার মুশরিকদের ন্যায়, তারা রাসুল সা. কে কষ্ট দিত। সাধারণ মানুষকে তারা কুরআনের বাণী শুনতে বাধা দিতো। মহান আল্লাহ তায়ালা বলেন وَقَالَ الَّذِينَ كَفَرُوا لَا تَسْمَعُوا لِهَذَا الْقُرْآنِ وَالْغَوْا فِيهِ لَعَلَّكُمْ تَغلبون (আয়াত – ২৬, সূরা হামিম সিজদা) এবং তারা বলে তোমরা এই কুরআন শ্রবণ করোনা এবং তার তেলাওয়াত কালে হট্টগোল সৃষ্টি করো।

প্রিয় পাঠক! এই ফ্রান্স একদিকে রাসুলের ব্যাঙ্গাত্বক কার্টুন প্রকাশ করে তার সুমহান চরিত্রে কালিমা লেপনের অপচেষ্টা চালাচ্ছে। অপরদিকে আপনারা যারা তাদের অর্থনৈতিক ব্যবস্হাপনা সম্পর্কে ধারনা রাখেন তারা জানেন তারা কিভাবে মানুষের উপর জুলুম করে তাদের অর্থনৈতিক অবকাঠামোকে মজবুত করেছে।

মহান আল্লাহ তায়ালা বলেন مُحَمَّدٌ رَسُولُ اللَّهِ وَالَّذِينَ مَعَهُ أَشِدَّاءُ عَلَى الْكُفَّارِ رُحَمَاءُ بَيْنَهُمْ (আয়াত ২৯- সুরা ফাতাহ) এই আয়াতের প্রেক্ষাপট অনেক ব্যাপক শুধু মূল বিষয় আজ আলোচনা করবো। হুদায়বিয়ার সন্ধির সময় যখন রাসুল সা. ও মক্কার মুশরিকদের মাঝে সন্ধি চুক্তি হচ্ছিলো তখন নবিজীর জামাতা হযরত আলী রাঃ সন্ধিপত্রে নবিজী সাঃ এর নামের সাথে রাসুলুল্লাহ শব্দ যোগ করে লিখেন مِنْ مُحَمَّد رَسُولُ اللَّه তখন মুশরিকরা বলল তাকে যদি আমরা রাসুল হিসেবে মেনেই নিতাম তাহলে তো তার সাথে যুদ্ধ ও সন্ধি কোন কিছুই প্রয়োজন ছিলনো।

তখন নবিজী সা. হযরত আলী রা. কে مُحَمَّدٌ رَسُولُ اللَّهِ কেটে محمد بن عبد اللَّه লেখার নির্দেশ প্রদান করলেন। নবিজী সা. বললেন, তারা স্বীকৃতি না দিলেও আমি আল্লাহর রাসুল। এর পরিপ্রেক্ষিতে আল্লাহ রাব্বুল আলামিন উল্লেখিত আয়াত নাযিল করেন। মুহম্মদ সাঃ আল্লাহর রাসুল। আর তার সাথে যারা আছে তারা কাফেরদের প্রতি অত্যন্ত কঠোর। মুমিনদের প্রতি খুবই দূর্বল। মহান আল্লাহ তার প্রিয় হাবিব মুহাম্মদ সাঃ কে সুমহান চরিত্র-মাধুরীর অধিকারী বানিয়ে এ ধরার বুকে প্রেরণ করেছেন। আল্লাহ তায়ালা বলেনوَإِنَّكَ لَعَلَى خُلُقٍ عَظِيمٍ (4) (সুরা কলাম- আয়াত ৪) নিশ্চয় আপনি মহান চরিত্রের উপর অধিষ্ঠিত।

আল্লাহ আমাদের প্রিয় নবীকে অত্যন্ত সম্মানের অধিকারী বানিয়েছেন। আমরা কুরআনে কারিমে দেখতে পাই মহান আল্লাহ বিভিন্ন নবিকে যখন আহবান করেছেন, তখন তার নাম নিয়ে সম্বোধন করেছেন। যেমন, يَا آدَمُ اسْكُنْ أَنْتَ وَزَوْجُكَ الْجَنَّةَ , يَا يَحْيَى خُذِ الْكِتَابَ بِقُوَّةٍ – يَا نُوحُ اهْبِطْ بِسَلَامٍ مِنَّا – يَا عِيسَى إِنِّي مُتَوَفِّيكَ – وَنَادَيْنَاهُ أَنْ يَا إِبْرَاهِيمُ – يَا مُوسَى لَا تَخَفْ- يَا زَكَرِيَّا إِنَّا نُبَشِّرُكَ بِغُلَامٍ اسْمُهُ يَحْيَى – অপরদিকে আল্লাহ কুরআনে কারিমের কোথাও প্রিয় নবী সা. এর নাম উল্লেখ করে সম্বোধন করেননি।

বরং তিনি যেখানে তার রাসুল সাঃ কে সম্বোধন প্রয়োজন বোধ করেছেন তখন অন্য কোন লকব বা উপাধি দ্বারা সম্বোধন করেছেন। যেমন يَا أَيُّهَا الرَّسُولُ- يَا أَيُّهَا النَّبِيُّ – يَا أَيُّهَا الْمُزَّمِّلُ – يَا أَيُّهَا الْمُدَّثِّرُ আর যেখানে প্রসঙ্গক্রমে তার নাম উল্লেখ করেছেন সেখানে তার নামের সাথে তার গুনবাচক নাম ব্যবহার করেছেন। যেমন মহান আল্লাহ বলেন– وَمَا مُحَمَّدٌ إِلَّا رَسُولٌ – مُحَمَّدٌ رَسُولُ اللَّهِ পবিত্র কোরআনে অন্যত্রে এরশাদ হয়েছে لَتَجِدَنَّ أَشَدَّ النَّاسِ عَدَاوَةً لِلَّذِينَ آمَنُوا الْيَهُودَ وَالَّذِينَ أَشْرَكُوا (সুরা মাইদা- আয়াত,৮২) অর্থাৎ হে নবি আপনি মানুষের মধ্যে ইমানদারদের সবচেয়ে বড় দুশমন পাবেন ইহুদী ও মুশরিকদের তারপর খৃস্টানদেরকে সুতরাং কোন প্রকৃত মুসলিম কাফের মুশরিকদের সাথে বন্ধুত্ব স্থাপন করতে পারেনা। আল্লাহ তায়ালা বলেন, وَمَنْ يَتَوَلَّهُمْ مِنْكُمْ فَإِنَّهُ مِنْهُم (সুরা মাইদা- আয়াত, ৮২) যারা তাদের সাথে বন্ধুত্ব করবে তারা তাদেরই অন্তর্ভুক্ত হবে।

অতএব মুমিন হিসেবে আমাদের উচিৎ তাদের বিরুদ্ধে যথাসম্ভব প্রতিবাদ করা। আর রাসুলের জন্মের মাসে তাঁর অবমাননা আমরা কিছুতেই সইবো না। মুসলমান হিসেবে আমাদের কোরআনের নির্দেশনা মেনে এটাই করতে হবে। তাই আসুন- আমরা সবাই ঐক্যবদ্ধ হয়ে কাফির ও জালিমদের বিরুদ্ধে লড়াই করি। আল্লাহ তায়ালা আমাদের সবাইকেও কোরআন সুন্নাহ মোতাবেক জীবনযাপনের তাওফিক দান করেন। আমিন

লেখক: প্রিন্সিপাল ও শায়খুল হাদীস, জামিয়া আরাবিয়া শামসুল উলুম, খতিব চকবাজার জামে মসজিদ,ফরিদপুর।