হযরত মাওলানা মুফতি তকী উছমানী ।।

হযরত আবদুল্লাহ ইবনে উমর রা. থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন-

أَلَا كُلّكُمْ رَاعٍ، وَكُلّكُمْ مَسْئُولٌ عَنْ رَعِيّتِهِ، فَالْأَمِيرُ الّذِي عَلَى النّاسِ رَاعٍ، وَهُوَ مَسْئُولٌ عَنْ رَعِيّتِهِ، وَالرّجُلُ رَاعٍ عَلَى أَهْلِ بَيْتِهِ، وَهُوَ مَسْئُولٌ عَنْهُمْ، وَالْمَرْأَةُ رَاعِيَةٌ عَلَى بَيْتِ بَعْلِهَا وَوَلَدِهِ، وَهِيَ مَسْئُولَةٌ عَنْهُمْ، وَالْعَبْدُ رَاعٍ عَلَى مَالِ سَيِّدِهِ وَهُوَ مَسْئُولٌ عَنْهُ، أَلَا فَكُلّكُمْ رَاعٍ، وَكُلّكُمْ مَسْئُولٌ عَنْ رَعِيّتِهِ.

জেনে রেখো, তোমরা সকলেই দায়িত্বশীল এবং তোমরা প্রত্যেকেই স্বীয় দায়িত্ব সম্পর্কে জিজ্ঞাসিত হবে। শাসক তার প্রজাদের ব্যাপারে  দায়িত্বশীল; সে তাদের সম্পর্কে জিজ্ঞাসিত হবে। গৃহকর্তা স্বীয় গৃহের বাসিন্দাদের দায়িত্বশীল। সে তাদের ব্যাপারে জিজ্ঞাসিত হবে। স্ত্রী তার স্বামীর ঘর ও তার সন্তানদের দায়িত্বশীল। সে এগুলোর ব্যাপারে জিজ্ঞাসিত হবে। গোলাম তার মালিকের সম্পদের রক্ষণাবেক্ষণের ক্ষেত্রে দায়িত্বশীল। সে এ বিষয়ে জিজ্ঞাসিত হবে। তো স্মরণ রেখো, তোমরা সকলেই (কোনো না কোনো বিষয়ে) দায়িত্বশীল। আর সকলেই স্বীয় দায়িত্ব সম্পর্কে জিজ্ঞাসিত হবে। -সহীহ মুসলিম, হাদীস ১৮২৯; সহীহ বুখারী, হাদীস ৭১৩৮

রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের এ হাদীসটি অত্যন্ত চমৎকার এবং খুবই গুরুত্বপূর্ণ। নবীজীর ‘জাওয়ামিউল কালিম’ বা ব্যাপক অর্থবোধক যেসকল বাণী রয়েছে, এটি তার একটি। এ হাদীসে আমাদের সবাইকেই সম্বোধন করা হয়েছে। বলা হয়েছে যে, তোমরা সকলেই কোনো না কোনোভাবে কোনো না কোনো দায়িত্বের সাথে সম্পৃক্ত। সকলেই কোনো না কোনো বিষয়ের জিম্মাদার। অতএব সবাইকে তার দায়িত্ব সম্পর্কে জবাবদিহি করতে হবে। তার উপর ন্যস্ত কর্ম ও দায়িত্ব সম্পর্কে সে জিজ্ঞাসিত হবে। তার জিম্মাদারীর হিসাব তাকে দিতে হবে।

হাদীসের একটি অংশ হল-

وَالرّجُلُ رَاعٍ عَلَى أَهْلِ بَيْتِهِ، وَهُوَ مَسْئُولٌ عَنْهُمْ.

অর্থাৎ পুরুষ বা গৃহকর্তা তার অধীনস্ত ঘরের সবার ব্যাপারে দায়িত্বশীল। তার কাঁধে তাদের রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব অর্পিত হয়েছে। সন্তান ও স্ত্রী-পরিজনের দেখভাল করা তার কর্তব্য। প্রত্যেক পুরুষ তার এই কর্তব্যের ব্যাপারে জিজ্ঞাসিত হবে। তাকে জবাব দিতে হবে- তুমি যেই পরিবারের কর্তা ছিলে তা তুমি কীভাবে পরিচালনা করেছ? পরিবারের সদস্যদের সাথে তোমার আচরণ কেমন ছিল? তাদের হকগুলো কতটুকু আদায় করেছ? তাদের তরবিয়ত করেছ কতটুকু? তারা দ্বীনের পথে চলছে কি চলছে না? জাহান্নামের দিকে আবার ধাবিত হয়ে যাচ্ছে না তো? তাদের দ্বীনী বিষয়ে তোমার খেয়াল কতটুকু ছিল? কিয়ামতের দিন কড়ায় গণ্ডায় এগুলোর হিসাব দিতে হবে। কুরআনুল কারীমে আল্লাহ তাআলা বলেন-

یٰۤاَیُّهَا الَّذِیْنَ اٰمَنُوْا قُوْۤا اَنْفُسَكُمْ وَ اَهْلِیْكُمْ نَارًا.

হে ঈমানদারগণ! তোমরা নিজেদেরকেও আগুন থেকে বাঁচাও এবং তোমাদের পরিবার পরিজনকেও। -সূরা তাহরীম (৬৬) : ৬

অতএব এমন করা সমীচীন নয় যে, তুমি নিজে তো আগুন থেকে বাঁচার ব্যবস্থা গ্রহণ করে রেখেছ; নামায পড়ছ, রোযা রাখছ, ফরয ওয়াজিবগুলো মেনে চলছ, এমনকি সুন্নত-মুস্তাহাবও আদায় করে যাচ্ছ, আর ওদিকে ছেলে সন্তান কোন পথে চলছে- সুপথে, না বিপথে, এগুলোর কোনো খেয়াল-খবর রাখছ না, তাদেরকে সঠিক পথে আনার চেষ্টা-ফিকির করছ না, তো এমন হলে মনে রাখবে, কিয়ামতের দিন তুমি এর দায় থেকে মুক্ত হতে পারবে না। তোমাকে এর জবাব দিতে হবে এবং এই গুরু দায়িত্বে অবহেলা করার কারণে তোমাকে পাকড়াও হতে হবে। এজন্য রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলে দিয়েছেন, ব্যক্তি তার পরিবারের দায়িত্বশীল। তাদের সঠিক রক্ষণাবেক্ষণ সে কতটুকু করেছে এ বিষয়ে সে জিজ্ঞাসিত হবে।

হাদীসের পরবর্তী অংশ হল-

وَالْمَرْأَةُ رَاعِيَةٌ عَلَى بَيْتِ بَعْلِهَا وَوَلَدِهِ، وَهِيَ مَسْئُولَةٌ عَنْهُمْ.

আর নারী তার স্বামীর গৃহ ও তার সন্তানদের রক্ষণাবেক্ষণকারী। সে এসবের ব্যাপারে জিজ্ঞাসার সম্মুখীন হবে।

এ বর্ণনা অনুযায়ী নারীর উপর দুটি দায়িত্ব অর্পিত হয়েছে। এক. স্বামীর গৃহ হেফাজত করা। দুই. তার সন্তান-সন্ততির দেখভাল করা। অর্থাৎ নারীগণ গৃহস্থালী কায়-কায়বার ঠিক ঠিক আঞ্জাম দেবেন। ঘরদোর গোছগাছ ও পরিপাটি করে রাখবেন। নিজ নিজ সংসার সামলে রাখবেন। আর সন্তানদের দেখাশোনা করবেন। তাদের জাগতিক বিষয়াদিরও খেয়াল রাখবেন এবং দ্বীনী বিষয়াদিরও। এটা নারীদের দায়িত্বের অংশ।

দীর্ঘ হাদীসের এই অংশে নারীদের গুরুত্বপূর্ণ দুটি দায়িত্বের কথা উল্লেখ করা হয়েছে।

নারীগণ ফাতেমী জীবন অনুসরণ করুন

নবী দুলালী হযরত ফাতেমা রা.। জান্নাতী রমণীগণের সরদার। নববী তরবিয়তে ধন্য ফাতেমা রা. ছিলেন নেককার নারীদের উত্তম দৃষ্টান্ত। বিবাহের পর তিনি হযরত আলী রা.-এর ঘরে পা রাখেন। নতুন পথ চলতে তাঁরা পারস্পরিক সমঝোতা করে নেন- হযরত আলী রা. ঘরের বাইরের কাজগুলো করবেন। আর হযরত ফাতেমা রা. খেয়াল রাখবেন ঘরের আভ্যন্তরীণ বিষয়গুলোর প্রতি। সে হিসাবে হযরত ফাতেমা রা. ঘরোয়া কাজ নিজেই আঞ্জাম দিতেন। সাংসারিক কাজে খুব কষ্ট করতেন। স্বামী-সন্তানের সেবা-যতœ করতেন। অত্যন্ত আগ্রহের সাথেই তিনি এগুলো করতেন। তবে যেহেতু পরিশ্রমের কাজ ছিল তাই তাঁর খুব কষ্ট হত। সে যুগে তো আর এ যুগের মতো এত প্রাচুর্য ও সুযোগ-সুবিধা ছিল না। এখন তো বিদ্যুতের সুইচ অন করলেই খাবার প্রস্তুত হয়ে যায়! চাবি ঘোরালেই আগুন জ্বলে! কিন্তু দো জাহানের বাদশাহ্র কন্যা জান্নাতী রমণীদের সরদার হযরত ফাতেমা রা.-কে খাবার প্রস্তুত করতে হলে আগে জাঁতায় আটা পিষতে হত। জ্বালানীর জন্য লাকড়ি সংগ্রহ করতে হত। তারপর চুলায় আগুন জ্বলত। এভাবে এক বিরাট কর্মযজ্ঞ আঞ্জাম দিয়ে তবে প্রস্তুত হত শুকনো রুটি। এতে হযরত ফাতেমা রা.-কে অনেক কষ্ট পোহাতে হত বটে। তবুও তিনি এ কাজগুলো খুব শওক-যওক ও আগ্রহ-জযবা নিয়েই করতেন।

তাসবীহে ফাতেমী : উম্মতের জন্য এক বিরাট তোহফা

একবার রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট অনেক গনীমত জমা হল। অনেক দাস-দাসীও ছিল সেখানে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাহাবায়ে কেরামের মাঝে সেগুলো বণ্টন করে দিচ্ছিলেন। হযরত ফাতেমা রা. খবর পেয়ে গেলেন বাবার কাছে। আবদার করবেন- কাজের সহযোগিতার জন্য যদি তিনি কোনো খাদেম দেন! কিন্তু নবীজীর সাথে মুলাকাতের আর সুযোগ হল না। হযরত ফাতেমা রা. হাজির হলেন আম্মাজান হযরত আয়েশা সিদ্দীকা রা.-এর ঘরে। আম্মাজান আয়েশা রা.-কে বললেন, আপনি নবীজীকে একটু বলে দিয়েন- জাঁতায় আটা পিষতে পিষতে আমার হাতে কড়া পড়ে গেছে। পানির মশক তুলতে তুলতে শরীরে জখম হয়ে গেছে। এখন যেহেতু গনীমতস্বরূপ এত গোলাম বাদি এসেছে তাই কাজের সহযোগিতার জন্য আমি কোনো খাদেম পেতে পারি কি না। তাহলে আমার কষ্ট কিছুটা লাঘব হবে। একথা বলে হযরত ফাতেমা রা. ঘরে চলে গেলেন।

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ঘরে এলে আম্মাজান হযরত আয়েশা রা. নবীজীকে সব খুলে বললেন- ইয়া রাসূলাল্লাহ! আপনার আদরের দুলালী ফাতেমা এসেছিল। এ এ বলে গেল।

চিন্তা করে দেখুন তো, দয়ার্দ্র এক পিতা তার কলিজার টুকরা কন্যার ব্যাপারে যখন এ করুণ সংবাদ শোনেন যে, আটা পিষতে পিষতে তার হাতে কড়া পড়ে গেছে। আদরের দুলালীর ব্যাপারে এমন কথা শোনার পর বলুন তো একজন বাবার দিলে কী ঝড়-তুফান না বয়ে যেতে পারে! এখন শুনুন নবীজী কী করেছেন?

নবীজী এ শুনে হযরত ফাতেমা রা.-এর ঘরে গিয়ে উপস্থিত হলেন। হযরত আলী রা.-ও তখন ঘরে।  নবীজী তাদেরকে ডেকে বললেন-

أَلاَ أَدُلّكُمَا عَلَى خَيْرٍ مِمّا سَأَلْتُمَا؟ إِذَا أَخَذْتُمَا مَضَاجِعَكُمَا – أَوْ أَوَيْتُمَا إِلَى فِرَاشِكُمَا – فَسَبِّحَا ثَلاَثًا وَثَلاَثِينَ، وَاحْمَدَا ثَلاَثًا وَثَلاَثِينَ، وَكَبِّرَا أَرْبَعًا وَثَلاَثِينَ، فَهُوَ خَيْرٌ لَكُمَا مِنْ خَادِمٍ.

তোমরা যা চেয়েছ তারচে অনেক অনেক উত্তম একটি বিষয় সম্পর্কে কি আমি তোমাদেরকে অবগত করব না! যখন তোমরা শোবার প্রস্তুতি নিবে তখন ৩৩ বার সুবহানাল্লাহ, ৩৩ বার আলহামদু লিল্লাহ এবং ৩৪ বার আল্লাহু আকবার পড়ে নিবে। খাদেম লাভ করার চেয়ে এ আমলটি তোমাদের জন্য অনেক বেশি উত্তম।

(দ্রষ্টব্য : সহীহ বুখারী, হাদীস  ৩১১৩, ৩৭০৫, ৫৩৬১; সহীহ মুসলিম, হাদীস ২৭২৭)

হাঁ, মেয়েও তো ছিলেন সাইয়্যিদুল কাউনাইন সরদারে দো আলম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়সাল্লামের কন্যা। জান্নাতী রমণীদের সরদার। নববী তরবিয়তে প্রতিপালিত। মুখ ফুটে দ্বিতীয় কোনো কথা আর বললেন না। নবীজীর বাতলানো আমলেই আশ্বস্ত রইলেন। আর উম্মত তাঁর বদৌলতে এ বিশেষ আমল প্রাপ্ত হল। যেহেতু এ তাসবীহ আমরা হযরত ফাতেমা রা.-এর সৌজন্যে লাভ করেছি তাই একে বলা হয় ‘তাসবীহে ফাতেমী’। তো নবী দুলালী হযরত ফাতেমা রা. ছিলেন এ উম্মতের জন্য অনন্য দৃষ্টান্ত। আদর্শ স্ত্রীর উত্তম নমুনা।

যাইহোক, নারীর দায়িত্ব হচ্ছে সে তার স্বামীর সংসারের রক্ষণাবেক্ষণ করবে। আর এ দৃষ্টিকোণ থেকে সে তার স্বামীর ও সংসারের কাজগুলোকে নিজের কাজ ও দায়িত্ব মনে করে আঞ্জাম দেবে।

মায়েদের দায়িত্ব সন্তানের তরবিয়ত করা

ঘর সংসারের দেখাশোনার পাশাপাশি নারীর উপর বিশেষভাবে আরো যে দায়িত্বটি বর্তায় তা হল সন্তান-সন্ততির দেখভাল করা। সুষ্ঠুভাবে সন্তান প্রতিপালন করা, তাদের সেবাযত্ন করা, উত্তমরূপে তাদের তরবিয়ত করা, তাদেরকে আদর্শ শিক্ষায় গড়ে তোলা ইত্যাদি বিষয়গুলো নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নারীদের দায়িত্বে অর্পণ করেছেন। সন্তান যদি উত্তম তরবিয়তে প্রতিপালিত না হয় এবং ইসলামী আদর্শ ও শিষ্টাচারসমূহ রপ্ত না করে তাহলে এর জন্য মায়েরা জিজ্ঞাসিত হবেন। তারপর বাবারা। কেননা প্রাথমিক এবং মৌলিকভাবে এ বিষয়গুলোর জিম্মাদারী মায়েদের উপরই বর্তায়। তাই মায়েদের জিজ্ঞাসা করা হবে, তোমাদের কোলে প্রতিপালিত শিশুগুলো দ্বীন-ঈমান নিয়ে কতটুকু বেড়ে উঠেছে? তাদের মাঝে ইসলামী আদাব-শিষ্টাচার কতটুকু পরিস্ফুট হয়েছে? আলোচ্য হাদীসে রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ বিষয়টির প্রতিই ইঙ্গিত করেছেন।

সবশেষে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সকলের দায়িত্বের কথা উল্লেখ করার পর সেই শুরুর কথাটি আবার স্মরণ করিয়ে দিয়ে বলেন-

أَلَا فَكُلّكُمْ رَاعٍ، وَكُلّكُمْ مَسْئُولٌ عَنْ رَعِيّتِهِ.

খেয়াল রেখো, তোমরা সকলেই কিন্তু (কোনো না কোনো বিষয়ে) দায়িত্বশীল। আর সকলেই স্বীয় দায়িত্ব সম্পর্কে জিজ্ঞাসিত হবে।

আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে যার যে দায়িত্ব রয়েছে তা জেনে যথাযথভাবে পালন করার তাওফীক দান করুন- আমীন।

(দ্রষ্টব্য : ইসলাহী খুতুবাত ২/১১০-১১৫)

তরজমা : মুহাম্মাদ আশিক বিল্লাহ তানভীর