ধর্ষণ ও নারী নির্যাতনের ইসলামি প্রতিকার

19

মুফতি জাকারিয়া মাসউদ।।

শিখো বাংলায়: ধর্ষণ ব্যাভিচারের চেয়েও মারাত্নক অপরাধ। ধর্ষণ থেকে ধর্ষকের যেমন বেঁচে থাকা জরুরি তেমনই ধর্ষণ থেকে নিজেকে বাঁচাতে নারীকেও ভুমিকা রাখতে হবে এবং ধর্ষণ চেষ্টাকালে নারী কারো নিকট সাহায্য প্রার্থী হলে সাহায্য ও করতে হবে।

আর এ সময় হত্যার মতো কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটে গেলে তাতেও সমর্থন দিয়েছে ইসলাম। আল্লাহর পক্ষ থেকে প্রতিরোধকারীদের জন্য রয়েছে পুরস্কার।

হযরত সাঈদ ইবনে জায়েদ (রা) বলেন, আমি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে বলতে শুনেছি, সম্পদ রক্ষা করতে গিয়ে যে ব্যক্তি নিহত হয়েছে সে শহিদ। জীবন রক্ষা করতে গিয়ে যে ব্যক্তি নিহত হয়েছে সে শহিদ। দ্বীন রক্ষা করতে গিয়ে যে ব্যক্তি নিহত হয়েছে সে শহিদ। আর সম্ভ্রম রক্ষা করতে গিয়ে যে ব্যক্তি নিহত হয়েছে সেও শহিদ। (আবু দাউদ, তিরমিযি)

ধর্ষণ সৃষ্টি হয় অবৈধ কামভাব (যৌনচাহিদা) তাড়িত বিষয় থেকে। এটি মূলত তারাই করতে পারে যাদের অন্তরে আল্লাহর ভয় নেই। ধর্ষণ, ব্যভিচারসহ সব প্রকারের অপকর্ম থেকে বাঁচার সহজ উপায় হলো অন্তরে আল্লাহর ভয়কে ধারণ করা। আর আল্লাহর ভয় সৃষ্টি হবে তার ক্ষমতা এবং অবস্থান সম্পর্কে জ্ঞাত হলে। আল্লাহ সবসময় সর্বত্র পর্যবেক্ষণকারী এবং প্রত্যেক বিষয়ের বিচারক।

এই বিশ্বাস যদি কোনো ব্যক্তি তার অন্তরে ধারণ করতে পারে তাহলে নিশ্চিতভাবে কোনো অন্যায়ে লিপ্ত হতে পারে না। কেননা কোনো ব্যক্তি প্রশাসনের সামনে অপরাধ করে না। কারণ তার প্রশাসনের ক্ষমতা সম্পর্কে জ্ঞান আছে।

আল্লাহতায়ালা ইরশাদ করেন, আর আল্লাহকে ভয় করতে থাকো। সন্দেহাতীতভাবে জেনে রাখো আল্লাহর আজাব বড়ই কঠিন। (সুরা বাকারা,আয়াত ১৯৬)

ইসলামে ধর্ষকের শাস্তি :ইসলামে যেমন ব্যভিচার বা জেনার শাস্তি রয়েছে, তেমনি জেনার সমগোত্রীয় ধর্ষণেরও কঠোর শাস্তির বিধান রেখেছে ইসলাম। তবে ব্যভিচার সংঘটিত হয় উভয়ের সম্মতিতে, তাই ব্যভিচারের ক্ষেত্রে উভয়েরই শাস্তি রয়েছে। আর ধর্ষণ সংঘটিত হয় এক পক্ষের বল প্রয়োগের মাধ্যমে, তাই এ ক্ষেত্রে শাস্তি হবে ধর্ষকের, ধর্ষিতার নয়। কেননা ধর্ষিতা এখানে জুলুমের শিকার, তথা মাজলুম বা অত্যাচারিত আর ইসলামে মাজলুমের কোনো শাস্তি নেই। ধর্ষণের ক্ষেত্রে দুইটি বিষয় সংঘটিত হয়। ১) জিনা বা ব্যভিচার। ২) বল প্রয়োগে সম্ভ্রম লুণ্ঠন।

ইসলামে ব্যভিচারের যে শাস্তি নির্ধারিত রয়েছে তা হলো দুই প্রকার। অবিবাহিত নারী-পুরুষের জন্য ১০০ বেত্রাঘাত এবং বিবাহিত নারী-পুরুষের জন্য পাথর নিক্ষেপ করে হত্যা করা। আল্লাহতায়ালা ইরশাদ করেন, ব্যভিচারিণী নারী ব্যভিচারী পুরুষ, তাদের প্রত্যেককে ১০০ করে বেত্রাঘাত কর। আল্লাহর বিধান কার্যকর করণে তাদের প্রতি যেন তোমাদের মনে দয়ার উদ্রেক না হয়, যদি তোমরা আল্লাহর প্রতি ও পরকালের প্রতি বিশ্বাসী হয়ে থাকো। মুসলমানদের একটি দল যেন তাদের শাস্তি প্রত্যক্ষ করে। (সুরা নুর, আয়াত :০২)

হাদিসে রাসুল (স.) বলেন, অবিবাহিত পুরুষ-নারীর ক্ষেত্রে শাস্তি ১০০ বেত্রাঘাত এবং এক বছরের জন্য দেশান্তর । আর বিবাহিত পুরুষ-নারীর ক্ষেত্রে ১০০ বেত্রাঘাত এবং রজম মেরে হত্যা। (মুসলিম)

এ হাদিসের আলোকে ইসলামি আইন বিশারদগণ ভিন্ন ভিন্ন মতের দিকে গেছেন। কোনো বিশারদ ব্যভিচারীর শাস্তি দুইটিকেই গ্রহণ করেছেন। অর্থাত্ বেত্রাঘাত এবং দেশান্তর। তবে হানাফি মাজহাবের আইনবিদগণ কোরআন বর্ণিত শাস্তির মতটিকেই গ্রহণ করেছেন। ধর্ষণের মধ্যে যেহেতু দুইটি অপরাধ পাওয়া যায় সুতরাং প্রথমটির জন্য ব্যভিচারের শাস্তিই হবে। আর পরের অপরাধের জন্য কোনো কোনো আলেম মুহারাবার শাস্তির কথা উল্লেখ করেছেন।

মুহারাবার শাস্তি হলো—অস্ত্রের ভয় দেখিয়ে ডাকাতির যে শাস্তি তাই। মুহারাবার শাস্তির ব্যাপারে কোরআন পাকে আল্লাহতায়ালা ইরশাদ করেন, যারা আল্লাহ ও তার রাসুলের সঙ্গে সংগ্রাম করে এবং দেশে হাঙ্গামা সৃষ্টি করতে সচেষ্ট হয়, তাদের শাস্তি হচ্ছে, তাদেরকে হত্যা করা হবে, অথবা শূলে চড়ানো হবে, অথবা তাদের হস্তপদসমূহ বিপরীত দিক থেকে কেটে দেওয়া হবে, অথবা দেশ থেকে বহিষ্কার করা হবে। এটি হলো—তাদের জন্য পার্থিব লাঞ্ছনা আর পরকালে তাদের জন্য রয়েছে কঠোর শাস্তি। (সুরা মায়িদা, আয়াত :৩৩)

এ আয়াতের ভিত্তিতে বিচারক ধর্ষকের জন্য ব্যভিচারের শাস্তির সঙ্গে উল্লেখিত চার ধরনের শাস্তির যে কোনোটি দিতে পারেন। তবে যখন সমাজে ধর্ষণ মহামারি রূপ ধারণ করে, তখন সমাজকে কলুষমুক্ত করতে মুহারাবার মতো কঠোর শাস্তি দেওয়া জরুরি। আর ধর্ষণের কারণে অথবা ধর্ষণ পরবর্তী হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হলে তার একমাত্র শাস্তি হলো মৃত্যুদণ্ড প্রদান।

ধর্ষণ প্রতিরোধে বিবাহের গুরুত্ব :আল্লাহতায়ালা বলেন, তোমাদের মধ্যে যারা ‘আইয়িম’ বিপত্নীক বা বিধবা মহিলা তাদের বিবাহ সম্পাদন কর এবং তোমাদের দাসদাসীদের মধ্যে যারা সত্ তাদেরও। তারা অভাবগ্রস্ত হলে আল্লাহ নিজ অনুগ্রহে তাদের অভাব দূর করে দিবেন। আল্লাহ তো প্রাচুর্যময়, সর্বজ্ঞ। ( সুরা আন নুর, আয়াত ৩২) পরের আয়াতে মহান আল্লাহতায়ালা বলেন, যাদের বিয়ের সামর্থ্য নেই আল্লাহ তাদেরকে নিজ অনুগ্রহে অভাবমুক্ত না করা পর্যন্ত তারা যেন সংযম অবলম্বন করে। (সুরা আন নুর, আয়াত ৩৩)।

বিবাহের ব্যাপারে ইসলামি আইনবিদদের অভিমত হলো—যে ব্যক্তি বিয়ে করার সামর্থ্য রাখে তার জন্য বিয়ে করা ওয়াজিব। দলিল হিসেবে তারা রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নিম্নের বানিটি গ্রহণ করেছেন, হে যুবকের দল তোমাদের মধ্যে যে বিবাহ করার ক্ষমতা রাখে সে যেন বিয়ে করে। বিয়ে হলো—দৃষ্টিকে নিম্নমুখীকারী এবং লজ্জাস্থানকে রক্ষাকারী। আর যে বিয়ে করার ক্ষমতা রাখে না, সে যেন সিয়াম পালন করে। এটাই তার জন্য আত্মরক্ষাকারী। (মুসলিম, ২/১০১৯) তাফসিরে ইবনে কাসীর।

উপরোক্ত আয়াতে আল্লাহতায়ালা বিবাহের প্রতি উত্সাহ প্রদান করে বলেন, যদি কোনো ব্যক্তি বিবাহ করে তাকে আল্লাহতায়ালা নিজ অনুগ্রহে সম্পদশালী করে দিবেন। আর বিশ্বনবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, বিবাহ হলো দৃষ্টির ও লজ্জাস্থানের হেফাজতকারী সুতরাং যখন কোনো পুরুষ-নারীর বিবাহের প্রয়োজন সঠিক সময়ে বিবাহ হলে তার দ্বারা সমাজে জেনা, ধর্ষণ বা মেয়েদের উত্ত্যক্ত করার মতো অপরাধ সংঘটিত হবে না।

ধর্ষিতার প্রতি ইসলামিক দৃষ্টি :বর্তমান সমাজ ধর্ষণের শিকার হওয়া নারীকে বাঁকা চোখে দেখে। তার প্রতি অবহেলা ও নানান কটূক্তি করে থাকে যা কোনোভাবেই কাম্য নয়। কেননা ধর্ষিতা যেহেতু অত্যাচারিত, তাই ইসলাম তাকে শাস্তি থেকে যেমন বিরত রেখেছে, তেমনই তার প্রতি খারাপ দৃষ্টিভঙ্গি দিতেও নিষেধ করেছে।

এ প্রসঙ্গে হাদিসে বর্ণিত হয়েছে, হযরত ইবনে আব্বাস (রা) বর্ণনা করেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ঘোষণা করেন, নিশ্চয়ই আল্লাহতায়ালা আমার উম্মতের ভুলবসত করা অপরাধ, ভুলে যাওয়া কাজ এবং বলপ্রয়োগকৃত বিষয় ক্ষমা করে দিয়েছেন। (ইবনে মাজাহ) অর্থাত্ এখানে যে ব্যক্তি সত্যিকারের ধর্ষণের শিকার তার গুনাহ হয় না । তাহলে তাকে যারা কটূক্তি করবে তারাই অপরাধী হিসেবে গণ্য হবে।

মোটকথা, সমাজে যখন ধর্ষণ মহামারি আকার ধারণ করবে তখন সব ধরনের আইন প্রয়োগসহ প্রতিরোধ গড়ে তোলে এ মহামারি থেকে সমাজকে রক্ষা করা সবাইর কর্তব্য। তাই আসুন আমরা এ ঘৃণ্য অপরাধের বিরুদ্ধে নিজ নিজ স্থান থেকে প্রতিরোধ গড়ে তুলি। আল্লাহতায়ালা আমাদেরকে তওফিক দান করেন। আমিন

লেখক: প্রধান মুফতি, কাশফুল উলুম নেছারীয়া মাদ্রাসা কমপ্ল্লেক্স, নেছারীবাদ, সিংড়া, নাটোর ও খতিব, চকসিংড়া উত্তরপাড়া জামে মসজিদ, সিংড়া, নাটোর।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here