জ্ঞান খোদার দান

16

শিখো বাংলায়: ইলম শব্দটি একাধিক অর্থে ব্যবহৃত হয়। এর একটি অর্থ হচ্ছে উপলব্ধি করা।

কেউ কেউ বলেন, ‘ইলমের অর্থ সত্যায়ন করা। চাই তা ইয়াকিনি হোক বা অন্য কিছু। আর অভিধান অনুযায়ী ইলম অর্থ ইয়াকিন বা বিশ্বাস।’

‘ইলম হচ্ছে আমলের নাম। আর আমল হল স্থায়ী জগতের স্বার্থে ক্ষণস্থায়ী জগৎ ত্যাগ করা।’ কোনো মানুষের প্রকৃত মুমিন হওয়া নির্ভর করে তার ইলম হাসিলের ওপর। কারণ কোনো ব্যক্তি ইলম হাসিল করা ছাড়া প্রকৃত মুমিন হতে পারে না। আর মুমিন হওয়া নির্ভর করে দুটি বস্তুর ওপর।

এক. সে আল্লাহতায়ালা ছাড়া অন্য কারও ইবাদত করবে না। দুই. শরিয়ত নির্দেশিত পন্থা ছাড়া ইবাদত করবে না। ইলম হল বান্দার প্রতি আল্লাহর প্রথম উপহার। যারা ইলম হাসিল করেন তাদের আলেম বলে। সাধারণ মুমিনের চেয়ে আলেমের মর্যাদা বহু গুণ বেশি।

আল্লাহতায়ালা বলেন, তোমাদের মধ্যে যারা জানে আর যারা জানে উভয়ে কি সমান? অর্থাৎ সমান নয়। আলেমরা উত্তম। ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু ‘আনহুমা বলেন, ‘সাধারণ মুমিনের চেয়ে আলেমের মর্যাদা সাতশত গুণ বেশি।

জীবন চলার পথে, সামাজিক নানা সমস্যা ও বিপদাপদে সাধারণ মানুষকে আলেমদের শরণাপন্ন হওয়ার আদেশ দেয়া হয়েছে এবং উলামায়ে কেরামকে সাধারণ মানুষের আশ্রয়স্থলের মর্যাদা দান করা হয়েছে।

কোরআনে ইরশাদ হয়েছে- মূর্খতা হচ্ছে আত্মার মৃত্যু এবং জীবন জবেহ ও হায়াত ধ্বংস করার নাম। তাই কোরআনে মূর্খতা থেকে বেঁচে থাকতে বলা হয়েছে। সূরা হুদের ৪৬নং আয়াতে বলা হয়েছে- ‘আমি তোমাকে উপদেশ দিচ্ছি, যেন মূর্খদের অন্তর্ভুক্ত না হও।’

যারা পার্থিব জীবনের জ্ঞান ও ধন-সম্পদ নিয়ে অহমিকা করে তাদের বাহ্যিক সুখ দর্শনে কারও বিভ্রান্ত ও বিচলিত হওয়ার কোনো কারণ নেই। কারণ ওরা তো চতুষ্পদ জন্তুর মতো। যারা চারণভূমিতে পেটে যতদূর জায়গা হয় ততদূর খেয়ে থাকে।

আর বাড়িতে যাওয়ার পর জায়গা হয় নোংরা গোয়ালঘর কিংবা নিকৃষ্ট খোঁয়াড়ে; কিন্তু একজন মানুষ কি সেরকম? সে কি গরুর প্রচুর খাওয়া দেখে হিংসা বা ঈর্ষা করতে পারে? কখনও না। এটি তাকে মানায় না।

অতএব মর্যাদা, গৌরব, অহংকার ও শ্রেষ্ঠত্বের কিছু থাকলে তা ইলমের মধ্যেই রয়েছে। যারা ইলম ধারণ করেছে তারা বাহ্যিক দৃষ্টিতে পৃথিবীর সবচেয়ে দুর্বল, গরিব ও অসহায় মনে হলেও প্রকৃতপক্ষে তারাই সফল, বিত্তবান এবং মর্যাদার অধিকারী। ইলমের এ মর্যাদা লাভের জন্য শুধু পুরুষরাই নয় বরং নারীরাও আদিষ্ট।

সবার জন্য এ মর্যাদা এবং সবার জন্য তা অপরিহার্য। ‘ইলমের চেয়ে শ্রেষ্ঠ কোনো বস্তু নেই। বাদশারা তো সাধারণ মানুষের শাসক; কিন্তু আলেমরা বাদশাহদের শাসক।’ ‘আলেমরা যুগের প্রদীপ, প্রত্যেকের নিজের সময়ের বাতিঘর; লোকেরা তাদের থেকে আলো সংগ্রহকারী।’

এই মহামূল্যবান ইলম শিখতে এসে যারা ফিরে গেছে তারা চরম ব্যর্থ হয়েছে। অনেকে ইলম হাসিল করতে আসে না। আর কেউ কেউ এসেও নানা কারণে ঝরে পড়ে।

সাবধান! এমন দুর্ভাগা যেন আমরা কেউ না হই। যারা ইলম শিখতে আসে না কিংবা এসেও কোনো কারণে ফিরে যায়, পৃথিবীতে তাদের চেয়ে হতভাগা কোনো লোক নেই। ইলম হাসিলের জন্য অনেক ত্যাগ-তিতিক্ষা সহ্য করতে হয়। সময় ব্যয় করতে হয়। শ্রম দিতে হয় এবং অনেক গুণের অধিকারী হতে হয় কিংবা নিজের মধ্যে গুণ সৃষ্টি করতে হয়।

বুজুর্গানে দ্বীন ইলম হাসিলের জন্য ছয়টি গুণ আবশ্যক বলেছেন। যথা- এক. মেধা। আল্লাহতায়ালা একেবারে মেধাশূন্য কোনো মানুষ সৃষ্টি করেননি। সুতরাং যারা মেধাশূন্যতার দোহাই দিয়ে ইলম অন্বেষণ করা থেকে বঞ্চিত রয়েছে তারা ভুল বিশ্বাসের সঙ্গে বাস করছে।

দুই. ইলম অন্বেষণের প্রতি তীব্র বাসনা থাকতে হবে। ইলম হাসিলের জন্য সর্বাত্মক প্রচেষ্টা ও সর্বোচ্চ মেধা খরচ করতে হবে।

তিন. ইলম হাসিলের জন্য সবর, ত্যাগ ও মুজাহাদা করা। একজন তালেবে ইলমের জন্য এ গুণ খুবই জরুরি। এ গুণ অর্জন করা ছাড়া কেউ তালেবে ইলম হওয়ারই যোগ্যতা রাখে না। ইলম তো সবর ও চেষ্টার অপেক্ষায় থাকে।

তাই এ গুণ দুটি ছাড়া ইলম হাসিলে সাফল্য লাভ করার কল্পনা করা বৃথা চেষ্টা ছাড়া আর কিছু নয়। ‘যার শিক্ষাজীবনের সূচনা হয় কষ্টের তার শেষ জীবন হয় উজ্জ্বল।’

ইলম হাসিল করতে হলে ত্যাগ স্বীকার করতে হয়। ধৈর্যের পরীক্ষা দিতে হয় এবং কষ্টসহিষ্ণু হতে হয়। নফসের সঙ্গে তুমুল লড়াই করতে হয়। আল্লাহতায়ালা আমাদের সবাইকে ইলম অর্জনের তাওফিক দান করুক।

লেখক : প্রিন্সিপাল, দারুল ইহসান কাসিমিয়া (এক্সিলেন্ট) মাদ্রাসা, সরকারি কলেজ রোড, ফুলপুর, ময়মনসিংহ

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here