মুফতী মাসউদুর রহমান ওবাইদী

প্রশ্নঃ (ক) শরীয়তের দৃষ্টিতে চেয়ারে বসে নামায পড়ার হুকুম কী? এবং কখন চেয়ারে বসে নামায পড়তে পারবে কখন পারবে না? বিস্তারিত দলীলসহ জানালে উপকৃত হব৷

(খ) শরীয়ত কর্তৃক নিয়ম  মুওয়াফিক রুকু-সিজদা আদায় করতে অক্ষম ব্যক্তি চেয়ারে বসে রুকু- সিজদা ইশারায় আদায় করার সময় সামনের কোন কিছু রেখে যেমন, টেবিল, উঁচু তখতা, বাঁলিশ এ জাতীয় কোনো কিছু রাখা কিংবা উভয় হাত বিছিয়ে হাতের উপর সিজদা ; অথবা ইশারায় রুকু করার সময় উভয় হাত লম্বা করে বিছানো জরুরী? নাকি শুধুমাত্র ঝুকে মাথার ইশারায় রুকু সেজদা করা যথেষ্ট?

(গ) নিয়মতান্ত্রিক রুকু সিজদায় করতে অক্ষম ব্যক্তির চেয়ারে বসে জামাতের সাথে নামায আদায় করার সময় চেয়ারে কোথায় রাখবে? এবং চেয়ার রাখার পদ্ধতি কি? বিস্তারিত জানালে উপকৃত হব৷

শরয়ী সমাধানঃ

(ক) আল্লাহ তা’আলা মানব জাতিকে সৃষ্টি করেছেন একমাত্র তাঁরই এবাদত করার জন্যে৷ ঈমানের পরে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও সর্বশ্রেষ্ঠ ইবাদত হচ্ছে নামায৷ কিয়ামতের দিবস সর্বপ্রথম নামাযের হিসাব দিতে হবে৷ দুনিয়াতে মানুষের জীবন সংশোধনকারী, ইহকাল ও পরকালের সফলতা ও শান্তির মূলধন হচ্ছে নামায৷ নামায বান্দার জন্য এমন একটি ইবাদত যে ইবাদতের রয়েছে মানবজাতির অন্যান্য ইবাদতের মূল প্রশিক্ষণ এবং সমস্ত সৃষ্টিজগতের ইবাদতসমূহের মৌলিক বিষয়৷

দ্বিতীয়তঃ ইবাদত এর অর্থ হচ্ছে, মহান আল্লাহ তা’আলার যিনি সৃষ্টিকর্তা, পালনকর্তা, সর্বগুণে গুণান্বিত এবং পরিপূর্ণতার সর্বোচ্চ আসনে অধিষ্ঠিত, এমন এক সত্তার সামনে বান্দা নির্দিষ্ট নিয়মে নম্রতার শেষ সীমায় পৌঁছে ও বিনয়ের সাথে স্বীয় নিচুতা ও নিম্নতার আত্মপ্রকাশ করা৷ নামায যেহেতু আল্লাহ তা’আলার সান্নিধ্য অর্জনের সর্বপ্রথম ও সর্বশ্রেষ্ঠ একটি ইবাদত, সেহেতু নামাযকে খূশু- খূযূ তথা আল্লাহ তা’আলার বড়ত্ত্বের ভয়-ভীতির দ্বারা পরিপূর্ণ করে, বাহ্যির অঙ্গ পত্যঙ্গকে রাসূলুল্লাহ( সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের) সুন্নাতের সাজে সাজিয়ে নিয়ম-তান্ত্রিকভাবে আদায় করতে হবে৷ তখনই বান্দা যিম্মা মুক্ত হবে এবং তার জন্য নামায উপকারী হবে৷ অর্থাৎ এই নামায দুনিয়াতে আল্লাহ তা’আলার নাফরমানি কাজ থেকে তাকে বিরত রাখবে এবং অন্তরে শান্তি প্রদান করবে৷ আর আখিরাতে মুক্তির উপায় হবে৷ জান্নাতুল ফেরদাউস নছীব হবে, অন্যথায় নয়৷ 

সে ক্ষেত্রে স্বয়ং রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) এর আমল এবং সাহাবায়ে কিরাম, তাবেঈন, তাবে-তাবেঈন আইম্মায়ে মুজতাহিদীন ফুক্বাহায়ে কিরামগণের আমল আমাদের সামনে থাকতে হবে৷

রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) অন্তিম মুহূর্তে যখন ভীষণ অসুস্থ ছিলেন৷ তখন সাহাবায়ে কিরামগণের কাঁধে ভর করে জামাতে শরিক হয়ে যমীনে বসে নামায আদায় করেছেন৷ তা সত্ত্বেও চেয়ার ব্যবহার করেননি৷ রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) এর যুগ থেকে নিয়ে সাহাবায়ে কিরাম, তাবেঈন, তাবে- তাবেঈনদের সময় পর্যন্ত এই স্বর্ণালী যুগের অসুস্থ ও মা’যূর ব্যক্তির ছিল এবং চেয়ার ছিল৷ কিন্তু তারা চেয়ারে বসে নামায আদায় করেছেন এমন প্রমাণ পাওয়া মুশকিল৷ পরবর্তী যুগে ফুক্বাহায়ে কিরামগণ অসুস্থ ও মা’যূর ব্যক্তিদের শরয়ী বিধান সম্পর্কে আলাদা অধ্যায় কায়েম করে সবিস্তারে আলোচনা করেছেন এবং অসুস্থ ব্যক্তিদের বিধি-বিধানের ব্যাপারে কুরআন সুন্নাহের আলোকে যথাসম্ভব সহজ সিদ্ধান্ত দেয়ার চেষ্টা করেছেন৷ এমনকি বসে ইশারায় করে নামায পড়তে না পারলে শুয়ে ইশারা করে নামায পড়ার কথাও বলেছেন৷ কিন্তু তাদের এই দীর্ঘ আলোচনাতে চেয়ারে বসে নামায পড়ার কথা কোথাও খুঁজে পাওয়া যায় না৷

তবে পরবর্তী ফক্বাহায়ে কিরামগণ সর্বদিক বিবেচনা করে বিশেষ উযর ও অপারগতার ভিত্তিতে শুধুমাত্র এমন ব্যক্তির ক্ষেত্রে চেয়ারে বসে নামাজ পড়া জায়েয বলেছেন, যারা কোনভাবেই যমীনে সিজদা করা শক্তি রাখে না৷ তাই শরয়ী সিদ্ধান্ত মতে গ্রহণযোগ্য কোন উযর ও অপারগতা ছাড়া চেয়ারে বসে নামায আদায় করা যাবে না এবং নামাযেও হবে না৷ তাই আজকাল যমীনে সিজদা করে নামায পড়ার শক্তি থাকা সত্ত্বেও চেয়ারে বসে নামায আদায় করার যে ব্যাপক প্রচলন দেখা যাচ্ছে তা শরীয়ত সম্মত নয়৷ তাই তা বর্জনীয়৷

 কিছু পর্যালোচনা

বর্তমানে অসুস্থতার বাহানা দিয়ে চেয়ারে বসে নামায পড়ার যে ব্যাপক প্রচলন হয়েছে, তা শরীয়ত সম্মত নয়, বরং তা বিভিন্ন কারণে নিন্দনীয় ও বর্জনীয়৷ নিম্নে তা থেকে উল্লেখযোগ্য কয়েকটি কারণ উল্লেখ করা হলোঃ 

(1) চেয়ারে নামায পরার প্রচলন আমাদের যুগেই শুরু হয়েছে৷ খাইরুল কুরূন সাহাবায়ে কিরাম, তাবেঈন এবং তাবে -তাবেঈনদের যুগ এর প্রচলন ছিল না৷ অথচ সে সময়ও চেয়ার ছিল এবং মা’যূর ব্যক্তিও ছিল৷

(2) যে সকল মুছল্লী ক্বিয়াম, রুকু- সিজদা ও যনীনে বসে নামায আদায় করতে অক্ষম নয়; বরং সক্ষম, তাদের জন্য চেয়ারে বসে ফরয ও ওয়াজিব নামায আদায় করা জায়েযই নয়৷ অথচ কোন সময় দেখা যায় যে, এমন ব্যক্তিরাও চেয়ার দোখামাত্র তাতে বসে নামায আদায় করতে থাকে, যার কারণে তাদের নামাযই হচ্ছে না৷

(3) নামাযে চেয়ার ব্যবহার করার কারণে কাতার সোজা করতে ব্যাঘাত সৃষ্টি হয়৷ অথচ হাদীস শরীফে কাতার সোজা করার প্রতি অনেক গুরুত্বারোপ করা হয়েছে৷

4)আমাদেরকে ইয়াহুদী ও নাসারাদের সাদৃশ্য অবলম্বন করা থেকে কঠোরভাবে নিষেধ করা হয়েছে৷ তারা গির্জায় ও তাদের ইবাদত খানায় চেয়ার -টেবিলে বসে ইবাদত করে থাকে৷ চেয়ারে বসে নামায পড়তে তাদের সাদৃশ্য অবলম্বন হয়৷ তাই তা থেকে বেঁচে থাকতে হবে৷

(5) নামাজ নম্রতা ও বিনয় প্রকাশমূলক একটি ইবাদত৷ তা চেয়ারবিহীন অবস্থায় যেভাবে প্রকাশ পায়, চেয়ারে বসে নামায আদায় করা অবস্থায় সেভাবে প্রকাশ পায় না৷ তাই তা বর্জনীয়৷

(6) অনেক সুস্থ যুবক মুছল্লী নামাযের পর ঐ সকল চেয়ারে বসে আরাম করে৷ আবার কখনো কখনো ঐ সকল চেয়ারগুলো একত্রে করে গল্পে লিপ্ত হয়, যা মসজিদের শান, পবিত্রতা ও আদবের পরিপন্থী৷

(7) চেয়ারের ব্যবহার অনেক ক্ষেত্রে কুরআন কারীম এবং বুজুর্গদের আদবের খেলাফ হয়ে যায়৷ এই জন্য ইশারায় নামায পড়া অবস্থায়ও যথাসম্ভব চেয়ার ব্যবহার করা থেকে বেঁচে থাকা উচিত৷ এবং এর ব্যবহারের প্রতি লোকদেরকে নিরুৎসাহিত করা সময়ের পরিহার্য দাবি৷ আর চেয়ারের ব্যবহার শুধু ঐ সকল ব্যক্তিদের পর্যন্ত সীমাবদ্ধ করা উচিত যারা জমিনে বসে নামায আদায় করতে সক্ষম নয়৷

শরীয়ত সমর্থিত মা’যূর ও অক্ষম ব্যক্তির নামাজ আদায়ের মৌলিক মাসালাসমূহঃ

মনে রাখতে হবে সাধারণ মাথা ব্যথা কিংবা জ্বর-সর্দি অথবা সামান্য অসুস্থতার বাহানা দিয়ে নামাযের ফরজসমূহ তথা ক্বিয়াম রুকু-সিজদা ইত্যাদি আদায় করার শক্তি থাকা সত্ত্বেও তা ছেড়ে দিয়ে চেয়ারে বসে নামায আদায় করলে নামায হবে না৷ বরং শরীয়ত এ ব্যাপারে নির্দিষ্ট উযর এবং নির্দিষ্ট রুকুন আদায়ের অক্ষমতার শর্ত সাপেক্ষে চেয়ারে বসে নামায আদায়ের অনুমতি দিয়েছে৷ যার আলোচনা নিম্নে সংক্ষিপ্ত ভাবে তুলে ধরা হলোঃ

(1)যদি কোন ব্যক্তি স্বাভাবিক ভাবে দাঁড়াতে সক্ষম হয়, তাহলে স্বাভাবিক ভাবে দাঁড়িয়ে নামায আদায় করবে৷ আর যদি স্বাভাবিক ভাবে দাঁড়াতে না পারে, তাহলে কোন কিছুর সাথে হেলান দিয়ে দাঁড়াবে যদিও এক আয়াত পরিমাণ কিংবা তাকবীরে তাহরীমা পরিমাণ দাঁড়াতে সক্ষম হয় সে পরিমাণ দাঁড়িয়ে নামায আদায় করবে৷ এমতাবস্থায় ক্বিয়াম ছেড়ে দিয়ে চেয়ারে বসে নামাজ আদায় করলে নামায হবে না৷

(2) আর যদি কোন ভাবেই দাঁড়াতে না পারে কিংবা দাঁড়ালে অসহনীয় কষ্ট হয়, অথবা রোগ বেড়ে যাওয়া কিংবা সুস্থ হতে বিলম্ব হওয়ার প্রবল আশঙ্কা থাকে, তাহলে এমন ব্যক্তি যমীনে বসে রুকু মাথার ইশারায় আদায় করবে এবং মাটিতে সিজদা করে নামায আদায় করবে৷ মাটিতে সিজদা করার উপর সক্ষম থাকা সত্ত্বেও চেয়ারে বসে ইশারায় নামায আদায় করলে নামায হবে না৷

(3) যদি কোন ব্যক্তি মাটিতে স্বাভাবিকভাবে, সুন্নাত ত্বরীকায়ে বসে নামায আদায় করতে অক্ষম, কিন্তু কোনো কিছুর সাথে হেলান দিয়ে বসে মাটিতে সিজদা করতে সক্ষম, তাহলে সে সেভাবেই বসে মাটিতে সিজদা করবে৷ এমতাবস্থায় চেয়ারে বসে নামাজ আদায় করলে নামায আদায় হবে না৷

(5) যদি অসুস্থতার কারণে কোনোভাবেই মাটিতে কপাল ঠেকিয়ে সিজদা করতে সক্ষম নয়, কিন্তু সে মাটিতে বসে মাথার ইশারায় নামায আদায় করতে সক্ষম, এমন ব্যক্তির দুই অবস্থাঃ 

এক· মাটিতে সিজদা করতে অক্ষম হওয়ার সাথে সাথে ক্বিয়াম ও রুকু করতেও অক্ষম, তাহলে সে মাটিতে বসেই মাথার ইশারায় নামায আদায় করবে৷ তবে রুকুর ইশারার চেয়ে সিজদার ইশারার জন্য মাথা একটু বেশি ঝুকাবে৷

দুই· মাটিতে সিজদা করতে অক্ষম, কিন্তু ক্বিয়াম এবং রুকু উভয়টা কিংবা শুধুমাত্র ক্বিয়াম করতে সক্ষম এমন ব্যক্তির ব্যাপারে হানাফী ফক্বীহগণের  প্রসিদ্ধ মত হলো, তার উপর  ক্বিয়াম ফরয নয়৷ এমন ব্যক্তি চাইলে সে দাঁড়িয়ে ইশারা করে নামায আদায় করতে পারবে, কিংবা বসে ইশারা করে নামায আদায় করতে পারবে৷ তবে বসে ইশারা করে নামায আদায় করা উত্তম৷

কিন্তু অনেক মুহাক্কিক ফক্বীহগণের দৃষ্টিতে উক্ত দলিলের বিচারে ফিক্বহে হানাফীর ঐ মতটিই বেশি শক্তিশালী৷ যা ইমাম যুফার রহ·গ্রহণ করেছেন৷ আর এটাই বাকি তিন ইমাম তথা ইমাম মালেক রহ·, ইমাম শাফি রহ·,ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল রহ· এর মাযহাব৷ তা হলো, এমন ব্যক্তি(তথা যে ব্যক্তি যমীনের উপর সিজদা করতে অক্ষম) যদি দাঁড়াতে সক্ষম হয়, তাহলে তার জন্য দাঁড়ানো ফরয৷ কেননা ক্বিয়াম স্বতন্ত্র  রুকুন৷ সেজদা করতে অক্ষম হওয়ার কারণে ক্বিয়াম রহিত হবে না৷

উক্ত মতি হানাফী ফক্বীহগণ থেকে যারা গ্রহণ করেছেন, তাদের মধ্যে অন্যতম হলেন, ইমাম ওমর ইবনে নুজাইম রহ·, ইমাম ত্বাহত্বাবী হর· এবং ইমাম জাফর আহমদ থানবী রহ·, শাইখুল ইসলাম আল্লামা তাক্বী উসমানী( দা· বা·) সহ বর্তমানেস অনেক ওলামায়ে কিরামগণ৷ ইমাম ইবনুল  হুমাম রহ· প্রসিদ্ধ মতের “ইল্লত” তথা কারণ (তা হল, সিজদা করতে অপারগ হলে ক্বিয়াম রহিত হয়ে যায়) এর উপর আপত্তি তুলেছেন৷ যা ইমাম যুফর হর· এর মতটি শক্তিশালী হওয়ার সমর্থন বুঝা যায়৷ এমনকি ইমাম হালবী রহ· বলেন, ” যদি বলা হতো বসে ইশারা করে নামায আদায় করার চেয়ে (এটা হানাফী মাযহাবের প্রসিদ্ধ মত) দাঁড়িয়ে ইশারা করে নামাজ আদায় করা উত্তম, তাহলে তা আরো বেশি ভালো হত৷ কেননা এ ভাবে নামায আদায় করলে সকলের মতানুসারে নামায বিশুদ্ধ হয়ে যায়৷

 তাই এমন ব্যক্তি প্রথমে দাঁড়িয়ে ক্বিরাত পড়বে৷ অতঃপর রুকু করতে সক্ষম হয়, তাহলে নিয়মতান্ত্রিকভাবে রুকু করবে৷ আর যদি রুকু করতে সক্ষম না হয়, তাহলে বসে রুকু-সিজদা ইশারায় আদায় করবে৷ অতঃপর সিজদা থেকে উঠে দ্বিতীয় রাকাতের জন্য যদি দাঁড়াতে সক্ষম হয়, যদিও কোন কিছুর সাহায্য নিয়ে দাঁড়াতে সক্ষম হয়, তাহলে দাঁড়িয়ে কিরাত পড়বে৷ আর যদি তাতে ভীষণ কষ্ট হয়, তাহলে বাকি নামায বসে ইশারায় আদায় করবে৷

আল্লামা তাক্বী উসমানী (দা· বা·) একাধিক দলীলের মাধ্যমে উক্ত মতটি প্রাধান্য দেয়ার পর বলেন, যমীনের উপর সিজদা করতে অক্ষম কোনো মুছল্লী যদি ফিক্বহে হানাফীর প্রসিদ্ধ মতাঅনুযায়ী আমল করে এবং পূর্ণ নামায বসে রুকু-সিজদা ইশারায় আদায় করে, তাহলে তার নামায ফাসেদ হয়ে গেছে বলবো না৷ কেননা মুক্বাল্লিদের জন্য মুজতাহিদের উক্তিও দলিলে শরয়ী৷ সুতরাং যে ব্যক্তি  উক্ত মতাঅনুযায়ী আমল করেছে, তার নামায  ফাসেদ হয়েছে বলা যাবে না৷

উল্লেখিত 4 এবং 5 নং অবস্থায় দাঁড়িয়ে কিংবা বসে ইশারায় নামায আদায় করার উপর সক্ষম হওয়া সত্ত্বেও কেউ যদি চেয়ারে বসে নামাজ আদায় করে, তাহলে তার নামায আদায় হয়ে যাবে৷ তবে তা অনুত্তম ও সর্তকতা পরিপন্থী৷ নামায আদায় হবে এই জন্য যে, উক্ত ব্যক্তির উপর বসে ইশারায় নামায আদায় করা ওয়াজিব নয়, কেননা তার জন্য দাঁড়িয়ে রুকু-সিজদা ইশারায় আদায় করাও জায়েয৷ যেহেতু যমীনে ইশারায় নামায আদায় করা ওয়াজিব নয়, তাই তার জন্য চেয়ারে বসে ইশারায় নামায আদায় করা জায়েয৷

(6) চেয়ারে বসে নামায আদায় করা ওই সমস্ত ব্যক্তিদের জন্য জায়েয,যারা যমীনে বসে রুকু-সিজদা ইশারায় আদায় করতে অক্ষম৷ তবে যমীনে বসে রুকু-সিজদা ইশারায় আদায় করতে সক্ষম হওয়া সত্ত্বেও কেউ যদি চেয়ারে বসে ইশারায় নামায আদায় করে; তাহলে তখনও তার নামায আদায় হয়ে যাবে৷ তবে তা খেলাফে আউলিয়া তথা অনুত্তম ৷কেননা যমীনে বসা ব্যক্তি চেয়ারে বসা ব্যক্তির চেয়ে যমীনের অধিক নিকটবর্তী হয়ে থাকে৷

   শরীয়তের দৃষ্টিতে গ্রহণযোগ্য উযরসমূহ 

এমন অসুস্থতার দরুন প্রাণ কিংবা অঙ্গহানি বা অঙ্গের উপকারিতা নিষ্ফল হয়ে যাওয়ার ভয়ে রয়েছে ৷হাঁটু কিংবা অন্য কোন অঙ্গে সমস্যা এতো মারাত্মক যে, যার দরুন অসুস্থতা বেড়ে যাওয়া অথবা সুস্থ হতে বিলম্ব হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে, কিংবা নামাযে দাঁড়ানোর সাথে সাথেই পড়ে যায় অথবা দাঁড়াতে অসহনীয় কষ্ট হয় ইত্যাদি উযরের কারণে নামাযের কোন ফরয তথা ক্বিয়াম, রুকু-সিজদা ইত্যাদি ছেড়ে দেওয়া অথবা যমীনে কিংবা চেয়ারে বসে নামায পড়ার অবকাশ রয়েছে৷

তবে তা শরীয়তের ব্যাপারে বিজ্ঞ উলামায়ে  কিরাম এবং অসুস্থতার ক্ষেত্রে দ্বীনদার বিজ্ঞ ডাক্তার পরামর্শ কিংবা পূর্বের অভিজ্ঞতা বা প্রবল ধারণার ভিত্তিতে হতে হবে৷ শুধুমাত্র নিজের ধারণা প্রসূত মনে করে চেয়ারে বসে কিংবা মাটিতে বসে ইশারায় নামায আদায় করা জায়েয হবে না৷ কেননা এমনও হতে পারে যে, তার অজান্তে নামাযই হচ্ছে না৷ অথচ সে এ ব্যাপারে সম্পূর্ণ উদাসীন৷

 তাই নামাযের মত গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত, কিয়ামের  দিন সর্বপ্রথম যে নামাযের হিসাব দিতে হবে যে নামায মানুষের জীবনে সংশোধনকারী, দুনিয়া- আখিরাতের সফলতা ও শান্তির মূলধন, তা মনগড়া নিজের খেয়াল,খুশি মতে আদায় করে পরিনাম নিষ্ফল হওয়া থেকে বেঁচে থাকা জ্ঞানী ব্যক্তির পরিচয়৷

(খ) শরীয়তের গ্রহণযোগ্য কিতাবাদী অধ্যয়নে প্রমাণিত হয় যে, শরীয়ত কর্তৃক নিয়মতান্ত্রিক রুকু-সিজদা আদায় করতে অক্ষম ব্যক্তির প্রশ্নে উল্লেখিত ভাবে চেয়ারে বসে রুকু কিংবা সিজদা ইশারায় আদায় করার সময় সামনে কোন কিছু যেমন টেবিল, উঁচু তখতা ইত্যাদি রেখে এর উপর সিজদা করার প্রয়োজন নেই এবং রুকু করার সময় উভয় হাত লম্বা করে বিছানারও প্রয়োজন নেই; বরং ইশারায় রুকু আদায় করার সময় মাথা এ পরিমাণ ঝুকাবে, যেন  মাথা হাঁটু বরাবর পৌঁছে যায়৷ উল্লেখিত পরিমাণ মাথা ঝুকানো উত্তম৷ অন্যথায় সামান্য পরিমাণ মাথা ঝুকানো রুকুর ইশারার জন্য যথেষ্ট৷ আর সিজদা ইশারায় আদায় করার সময় রুকুর তুলনায় মাথা একটু বেশি ঝুকাবে৷ আর কেউ যদি সামনে কোন কিছু রেখে তাতে সিজদা করে, তাহলে তা নিয়মতান্ত্রিক সিজদা বলে গন্য হবে না; কিন্তু এমতাবস্তায়ও যেহেতু সিজদা কিংবা রুকুর ইশারা পাওয়া গেছে, তাই রুকু এবং সিজদা আদায় হয়ে যাবে৷ শর্ত হলো সিজদার ইশারা রুকুর ইশারা থেকে মাথা একটু বেশি ঝুকাতে হবে৷

(গ) নিয়মতান্ত্রিক রুকু-সিজদা আদায় করতে অক্ষম ব্যক্তির চেয়ারে বসে নামাজ আদায় করার সময় মসজিদের কাতারের এক কিনারায় নামায আদায় করা উত্তম৷ যাতে করে চেয়ারে বসে নামায পড়ার দরুন কাতারের মাঝে কোন প্রকার অসুন্দর কিংবা খালি দেখা না যায়৷ কেননা হাদীস শরীফে কাতার সোজা রাখা এবং পরস্পর খুব মিলে দাঁড়ানোর প্রতি বিশেষ গুরুত্বারোপ করা হয়েছে৷ তবে যদি নামাযের শুরুতে কাতার পরিপূর্ণ না হয়, তাহলে যে পর্যন্ত কাতার হয়েছে সেখানেই তারা চেয়ারে বসে নামায আদায় করবে৷ কাতার ফাঁকা রেখে একবারে কিনারায় দাঁড়াবে না এবং পরবর্তীতে যারা আসবে, তারা এরপর থেকে দাঁড়াতে শুরু করবে৷

এমন মা’যূর ব্যক্তি স্বেচ্ছায়, নিজ উদ্যোগে কাতারের এক কিনারায় দাঁড়াবে৷ তবে যদি সে কাতারের মাঝখানে কিংবা ইমামের পিছনে চেয়ার নিয়ে বসে যায়, তাহলে তাকে সেখান থেকে তাড়িয়ে দেয়া কিংবা কাতারের এক কিনারায় চলে যাওয়ার হুকুম করা উচিত নয়৷

দ্বিতীয়তঃ মা’যূর ব্যক্তির কাতারের চেয়ার রাখার দুটি পদ্ধতি রয়েছে৷ পদ্ধতি দুটির কোন একটিতে কাতার সোজা করার ব্যাপারে শরীয়ত কর্তৃক বর্ণিত সুন্নাত পদ্ধতি রক্ষা হয় না; বরং কোনো না কোনো ত্রুটি থেকে যায়৷ তাই এমন মা’যূর ব্যক্তিরা কাতারে চেয়ার রাখার সময় যথাসম্ভব সুন্নাতের প্রতি খেয়াল রাখতে হবে৷

পদ্ধতি দুটি নিম্নরূপঃ 

1· চেয়ারের পিছনের পায়া কাতারে দাঁড়ানো মুছল্লিদের পায়ের গোড়ালি বরাবর রাখা৷

2· চেয়ারের সামনের পায়া কাতারে দাঁড়ানো মুছল্লিদের পায়ের গোড়ালি বরাবর ও অবশিষ্ট অংশ পিছনে রাখা৷

উক্ত দুই পদ্ধতি থেকে দ্বিতীয় পদ্ধতি অবলম্বন করা অবস্থায় যদি পিছনের কাতারে দাঁড়ানো মুসল্লিদের কষ্ট হয়; কিংবা নামায পড়তে অসুবিধা হয় অথবা তার চেয়ার বরাবর পিছনের কাতারের জায়গাটুকু চেয়ার রাখার দরুন ফাঁকা থেকে যায়, তাহলে প্রথম পদ্ধতি অবলম্বন করে নামায আদায় করবে৷ অন্যথায় দ্বিতীয় পদ্ধতি অবলম্বন করে নামায আদায় করবে৷

দলিলঃ সূরা বাকারা আয়াত নং(238)

সূরা হজ আয়াত নং(77)

বুখারী শরীফ হাদিস নং(1117)

মুজীমুল কবীর হাদিস নং (13082)

সালাতুল ফতোয়াঃ 1/194,195

ফতোয়ায়ে তা তার খানিয়া ঃ 1/153

ফাতহুল কাদীরঃ 1/458

মাবসূতঃ 1/213,218

এলাউস শুনানঃ7/201,203

হেদায়াঃ 1/76

তাবয়ীনুল হাকায়েকঃ 1/200

ফতোয়ায়ে শামীঃ 2/98, 1/569

কিতাবুন নাওয়াঝেলঃ 5/490

ফতোয়ায়ে রহিমিয়াঃ 5/159৷