‘কুরআনের কাব্যানুবাদ করতে গিয়ে আল্লাহর কুদরতের সাহায্য পেয়েছি’

25

শিখো বাংলায়: পবিত্র কুরআনুল কারিম। মহান রাব্বুল আলামিনের কালাম। নাজিল হয়েছে আরবি ভাষায়। পৃথিবীতে যত ভাষা আছে, তত ভাষাতেই আল কুরআনের অনুবাদ আছে। আমাদের মাতৃভাষা বাংলাতেও আছে অসংখ্য অনুবাদ। কিন্তু পৃথিবীর কোনো ভাষাতেই আল কুরআনের পূর্ণাঙ্গ কাব্যানুবাদ নেই। এই প্রথম পবিত্র কুরআনের কাব্যানুবাদ করলেন বাংলার জাগ্রত কবি আল্লামা মুহিব খান।

আল কুরআনের কাব্যানুবাদ! তাও আবার বাংলায়! এতো রীতিমতো বিস্ময়! আর এই বিস্ময়কর অসাধারণ বিরল কাজটিই করেছেন বাংলাদেশের জনপ্রিয় গীতিকার, সুরকার ও জাগ্রত এই কবি। এ বিষয়ে আওয়ার ইসলামের মুখোমুখি হয়েছেন কবি। তার সাথে কথা বলেছেন আওয়ার ইসলাম সাংবাদিক মোস্তফা ওয়াদুদ


আওয়ার ইসলাম: প্রিয় কবি কেমন আছেন?
মুহিব খান: আলহামদুলিল্লাহ। আল্লাহ ভালো রেখেছেন।

আওয়ার ইসলাম: আপনার আল কুরআনের কাব্যনুবাদ সম্পর্কে জানতে চাই। কতদিন লেগেছে পূর্ণ কুরআনের কাব্যনুবাদ করতে?
মুহিব খান: আমি পবিত্র কুরআনের কাব্যনুবাদ করা শুরু করি ২০০৪ সালের মার্চ মাস থেকে। এরপর ২০০৬ সালে ১০ পারা প্রকাশিত হয়েছে। তারপর ২০০৬ থেকে ২০২০ পর্যন্ত মাত্র তিন পারার অনুবাদ বরেছি। এ সময় অন্য কাজে সময় দেয়া হয়েছে। নিজস্ব ব্যস্ততা ও অন্যান্য কাজে বেশ ব্যস্ত সময় পার হওয়ায় কুরআন অনুবাদে ততটা হাত দেয়া সম্ভব হয়নি। এরপর গত ১৬ এপ্রিল-২০ থেকে ২৮ সেপ্টেম্বর-২০ পর্যন্ত মাত্র পাঁচ মাস ১২ দিন এ বাকি ১৭ পারার কাজ সমাপ্ত হয়েছে।

এর মাঝে দুই ঈদ ও প্রয়োজনীয় অন্যান্য ব্যস্ততার দরুণ দেড় মাসের মতো কাজ করা হয়নি। সব মিলিয়ে ১৭ পারার কাব্যানুবাদ করতে আমার সময় লাগে চার মাসের মতো। এখানে প্রতি পারার কাজ করতে আমার সময় লাগতো সর্বনিম্ন তিনদিন আর সর্বোচ্চ দশদিন। প্রতিদিন কুরআনুল কারিমের কাব্যনুবাদের জন্য ১২ থেকে ১৮ ঘণ্টা সময় দেয়া হতো। সকাল ৮টা থেকে অনুবাদ শুরু হতো। রাত ২টা পর্যন্ত কাব্যানুবাদের কাজ চলতো।

আওয়ার ইসলাম: আপনার কাব্যানুবাদের বৈশিষ্ট্য কী কী?
মুহিব খান: বৈশিষ্ট্য নির্ধারণ করবেন পাঠকবৃন্দ। তবে আমি যদি বলি তাহলে পাঁচটি বৈশিষ্ট্যের কথা তুলে ধরতে পারবো। প্রথমত: পৃথিবীতে এই প্রথম পূর্ণাঙ্গ ও বিশুদ্ধ কুরআনের কাব্যনুবাদ। এর আগে পৃথিবীর অন্যান্য ভাষায় হয়তো কাব্যনুবাদ হয়েছে তবে কোনোভাষাতেই পূর্ণাঙ্গ কাব্যনুবাদ করা হয়নি।

দ্বিতীয়ত: বিশুদ্ধ কাব্যানুবাদ। আমি আরবি থেকে আরবির কাব্যানুবাদ করেছি। একাধিক তাফসির সামনে রেখেছি। এর আগে হয়তো কেউ কেউ কাব্যানুবাদ করেছেন তবে কোনো আলেমের হাতে এই প্রথম কুরআনের কাব্যানুবাদ পূর্ণাঙ্গভাবে লিপিবদ্ধ হয়েছে। তৃতীয়ত: মূলানুগ তথা মূল তরজমার প্রতি খেয়াল রাখা হয়েছে। ভাবানুবাদ করা হয়নি। যেহেতু এটা কুরআনের তরজমা। আর কুরআনের তরজমার ক্ষেত্রে আমি স্বাধীন নয়। তাই মূল তরজমাকে কাব্যের ভাষায় ফুটিয়ে তোলার চেষ্টা করা হয়েছে।

চতুর্থত: আয়াত টু আয়াত। অর্থাৎ আয়াতের ধারাবাহিকতার সাথে সাথে তরজমার থারাবাহিকতা লক্ষ রাখা হয়েছে। এমন করা হয়নি কয়েকটি আয়াতের তরজমা একসাথে কাব্যাকারে পেশ করা হয়নি।

আওয়ার ইসলাম: আপনি এই কাব্যানুবাদ কেন করলেন?
মুহিব খান: আসলে কুরআনের কারিমের কাব্যানুবাদ লিখবো এমন কোনো চিন্তা, পরিকল্পনা বা ইচ্ছা কোনোকিছুই আমার ছিল না। ২০০৪ এর ১৯ মার্চ মাগরিবের নামাজে সুরা ফাতিহা তেলাওয়াত করছিলাম। সে সময় সুরা ফাতিহার কাব্যানুবাদের কাঠামো আমার মাথায় এলো। এর আগে কখনোই আমার চিন্তায় এমন বিষয় আসেনি। তারপর নামাজ শেষে হাতের কাছে একটি খাম পেলাম। কলমও ছিল না। একটি পেন্সিল দিয়ে সে খামের উপর সুরা ফাতেহার কাব্যানুবাদ লিখে নিলাম।

আমি সে সময় কাগজ খুঁজতে যাইনি। কারণ কাগজ খুঁজতে গেলে হয়তো আমি ভুলে যেতাম। এরপর সেখানে সুরা বাকারার প্রথম কয়েকটি আয়াতেরও কাব্যানুবাদ করে নিলাম। আর আমি তো হাফেজ না। তাই সুরা বাকারার শুরু দিকে যতটুকু মনে ছিল ততটুকুর কাব্যানুবাদ করি। আসলে এটা আল্লাহর পক্ষ থেকে আমার প্রতি ইলহাক হয়েছে।

তারপর মনে হলো, শুরু করলাম। আল্লাহ তায়ালা পুরো করেছেন আলহামদুলিল্লাহ। আমার ইচ্ছে ছিল বয়স যখন ৩০ বছর পূর্ণ হবে তখন কুরআনের ৩০ পারার কাব্যানুবাদ শেষ হবে। কারণ যখন আমি কাব্যানুবাদ শুরু করি তখন আমার বয়স ছিল ২৫ বছর। এর ৩০ বছর পার হয়ে গেলেও শেষ করা সম্ভব হয়নি। তারপর আবার খেয়াল হলো, আমাদের নবীজি নবুওয়াত প্রাপ্ত হয়েছেন ৪০ বছর বয়সে। আমিও ৪০ প্লাসে গেলে শেষ করবো। আল্লাহ পুরো করলেন। বর্তমানে আমার বয়স ৪০ বছর কয়েক মাস। আলহামদুলিল্লাহ এ বয়সে এসে শেষ করতে পারলাম।

কাজটি শুরু করেছিলাম মিরপুর ৬ নম্বরের বাসা থেকে। আর শেষ করলাম বাগিচা প্লেস যাত্রাবাড়ীর নিজস্ব বাসায় বসে। তাহাজ্জুদের সময়ে। কুরআনের কাব্যানুবাদ করতে গিয়ে আমি আল্লাহর কুদরতের সাহায্য পেয়েছি। কারণ কুরআনের সরল অনুবাদ করতেই কত বছর লেগে যায়। সেখানে মাত্র চার মাসে ১৭ পারা কাব্যানুবাদ করে শেষ করা আল্লাহর কুদরতি সাহায্য ছাড়া সম্ভব না। এখানে আল্লাহর হুকুম ও সহযোগিতা ছিল বলেই এই কাব্যানুবাদ করতে পেরেছি।

আওয়ার ইসলাম: আল কুরআনের কাব্যানুবাদ সম্পর্কে আর কিছু বলবেন?
মুহিব খান: এখানে আমার লিল্লাহিয়াত ও খুলুসিয়াতই হলো আসল। আমি এই কাব্যনুবাদ করার জন্য কারো কাছে কোনো পুরস্কার বা বিনিময় চাই না। কাজটি যেন প্রকৃত অর্থে আমার নাজাতের উসিলা হয়। এ কাজের জন্য আমি আমার বাবাকে স্মরণ করছি। মাওলানা আতাউর রহমান খান রহ.।

যিনি বিজ্ঞ পার্লামেন্টারিয়ান, বেফাকের সাবেক মহাসচিব, ঢাকা শহরের অনেকগুলো মাদরাসার মুহতামিম, কিশোরগঞ্জ জামিয়া এমদাদিয়ার নায়েবে মুহতামিম, জামিয়া ফারুকিয়া ও জামিয়া মিল্লিয়ার প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন। আমার বড় ভাই মাওলানা উবায়দুর রহমান খান নদভীর কথাও আমি স্মরণ করছি।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here