কুরআনের কাব্যানুবাদ: একটি শরীয়াহ পর্যালোচনা

21

মুফতি মামুন আব্দুল্লাহ কাসেমী।।

সুন্দর, শালীন, মার্জিত এবং ইসলামী চিন্তা-দর্শন ও জীবন বিধান সমর্থিত কাব্যচর্চার সীমিত পরিসরে অনুমতি থাকলেও সামগ্রিক বিবেচনায় শরীয়তে কাব্য চর্চার প্রতি খুব উৎসাহিত করা হয়নি। কুরআনের অপার্থিব ছন্দময়তার কারনে কুরআনুল কারীমকে কাব্যগ্রন্থ আর হুজুর সাল্লাল্লাহু আলাই ওয়া সাল্লামকে কবি মনে করতে লাগলে আল্লাহা তা’আলা দ্ব্যর্থহীন ভাষায় ঘোষণা করেন وما هو بقول شاعر আর এটা কবির কাব্যসমগ্র নয় (সূরা আল হাক্কাহ)। আরও বলেন- وما علمناه الشعر وما ينبغي له ان هو الا ذكر و قرآن مبين আর আমি নবীজিকে কব্যরচনা শিখাইনি,আর তা তার জন্য শোভনীয়ও নয়,বরং এ হচ্ছে উপদেশ বানি এবং সুস্পষ্ট পঠিতব্য গ্রন্থ আল কুরআন (সূরা ইয়াসিন:৬৭)।

এজন্যই হুজুরে পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সাধারানত কাব্য রচনা বা আবৃতি করতেন না।

عن عائشه رضي الله عنها سئلت هل كان رسول الله صلى الله عليه وسلم يتمثل بشئ من الشعر قالت كان ابغض الحديث اليه غر انه كان يتمثل ببيت اخي بني قيس فيجعل اوله اخره واخره اوله فقال ابو بكر ليس هكذا يا رسول الله فقال رسول الله اني والله ما انا بشاعر وما ينبغي لي

হযরত আয়েশা রাদিয়াল্লাহু তা’আলা আনহা কে জিজ্ঞাসা করা হল রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কি কখনো কবিতা রচনা করতেন?

তিনি জবাব দিলেন কবিতা রচনা করা তার নিকট সর্বাপেক্ষা অপছন্দনীয় ছিল। কিন্তু কোনো কোনো সময় তিনি বনি কায়েস গোত্রের জনৈক ব্যক্তির কবিতা আবৃত্তি করতেন। তবে তাতে তিনি উলটপালট করে ফেলতেন এবং হযরত আবু বকর রাদিয়াল্লাহু তা’আলা আনহু তা সংশোধন করে দিতেন- যে, এটা এমন নয় বরং এমন। তখন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলতেন- اني والله ما انا بشاعر وما ينبغي لي আল্লাহর কসম আমি কবি নই এবং কবিতা রচনা আমার জন্য শোভনীয় নয়। বিস্তারিত দেখুন তাফসীরে ইবনে কাসীর:২৯৯/৩,তাওকীফিয়্যাহ,কায়রো,মিসর।

কাব্যচর্চা সম্পর্কে একদা তিনি বলেন- لأن يمتلا جوف احدكم قيحا خير له من أن يمتلا شعرا কবিতা দ্বারা তোমাদের কারো পেট ভর্তি হওয়ার পরিবর্তে পুঁজ দ্বারা ভর্তি হওয়া উত্তম-মুসলিম:২২৫৭)।

তিনি আরো বলেন- من قرض بيت شعر بعد العشاء الاخرة لم تقبل له صلاته تلك الليلة যে ব্যক্তি এশার নামাজের পরে কবিতা রচনা করবে তার সেই রাত্রের নামাজ আল্লাহ তায়ালার দরবারে কবুল হবে না-(মুসনাদে আহমাদ ইবনে হাম্বাল)।

কুরআন কাব্যগ্রন্থ নয়, বরং কুরআনে কারীম হচ্ছে হিদায়াতের বানি সম্বলিত ঐশীগ্রন্থ। আর কবিতো কখনো কখনো তার পদ্য ও পঙ্কতির ছন্দ রক্ষায় উপযুক্ত শব্দ চয়ন ও বাক্য গঠনে নিয়ন্ত্রনহীনতা ও উদ্ভ্রান্তির শিকার হয়ে যায়। পক্ষান্তরে কুরআনে কারীম কিতাবে হিদায়াত হিসেবে এর প্রতিটি শব্দ ও অর্থ উভয়টাই সীমাহীন তাৎপর্যপূর্ন।

ইমাম কুরতুবী রহ সূরায়ে ইয়াসিনের উপরোক্ত আয়াতের তাফসীর প্রসঙ্গে বলেন- وكذالك كان رسول الله صلى الله عليه وسلم لا يقول الشعر ولا يزنه وكان اذا حاول انشاد بيت قديم متمثلا كسر وزنه وانما كان يحرز المعاني فقط

কাব্যচর্চা শানে নবুয়াতের জন্য সঙ্গতিপূর্ণ না হওয়ায় নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কখনোই কাবিতাবৃতি বা কাব্যচর্চা করতেননা,প্রাচীন কোন পদ্যের উপমা পেশ করতে হলে ছন্দ ভেঙ্গে মূল বক্তব্যটুকুন কেবল উপস্থাপন করতেন-(তাফসীরে কুরতুবী)।

কব্যচর্চা কারীদের স্বভাবজাত আগেব প্রবন হওয়ায় এবং প্রকৃতি ও পরিবেশের বাহ্যিকতায় খুববেশি প্রভাবগ্রস্থ হওয়ায় তাদের অনুসরন একজন পরকাল বিশ্বাসী মানুষের জন্য অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। তাই কুরআনে ইরশাদ হয়েছে- والشعراء يتبعهم الغاوون আর উদ্ভ্রান্তরাই কেবল কবিদের অনুগামি হয়(সূরা শু’আরা)।

তবে ইসলামী চিন্তা-দর্শন ও আকিদা-বিশ্বাস এবং জীবনাচার প্রতি পূর্ণ সঙ্গতি রেখে কাব্যচর্চার বিষয়টি ভিন্ন। আল্লাহ তা’আলা পরের আয়াতে বলেন- الا الذين امنوا وعملوا الصلحات و ذكرواالله كثيرا তবে যারা ঈমান আনয়ন করে সৎকর্ম সম্পাদন করেছে এবং আল্লাহর স্মরনে খুববেশি বিভোর-তাদের বিষয়টি ভিন্ন(সূরা শু’আরা)।

হুজুরে পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন- ان من البيان لسحرا وان من الشعر حكمة নিশ্চয় কিছু বক্তব্য যাদুময় আর কিছু কবিতা প্রজ্ঞাময়-(আল আদাবুল মুফরাদ:৬৬৯)

এরই ধারাবাহিকতায় মক্কার কাফের মুশরিকদের বিরুদ্ধচারন মূলক কবিতার সমুচিত ভাষায় জবাব দেওয়ার জন্য ক্ষেত্রবিশেষ বিশিষ্ট সাহাবী হযরত কা’ব ইবনে মালেক,আব্দুল্লাহ ইবনে রাওয়াহ,হাসসান ইবনে সাবিতসহ কতিপয় সাহাবীকে কাব্যচর্চার অনুমতি দিয়েছেন,বরং উৎসাহিত করেছেন।

গযওয়ায়ে আহযাব(যুক্তফ্রন্টের যুদ্ধ) এবং গযওয়ায়ে হুনাইনের যুদ্ধ কালীন হুজুরে পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কবিতাবৃতি কাব্যচর্চার উদ্দেশ্যে ছিলো না,বরং অনিচ্ছাকৃতভাবে মুখে উচ্চারিত হয়ে ছন্দময় বাক্য হয়েছে।

ইবনে কাসীরের(৩০০/৩) বক্তব্য লক্ষ করুন- لكن قالوا هذا وقع اتفاقا من غير قصد لوزن شعر بل جرى على اللسان من غير قصد اليه

উপরোক্ত উভয়বিধ বক্তব্যের দ্বারা স্পষ্ট প্রতিভাত হয় যে,ইসলামী চিন্তা-দর্শন,আকিদা-বিশ্বাস এবং জীবনাচারের আবেদন অক্ষুণ্ণ রেখে কাব্য রচনা ও কবিতাবৃতি করার অনুমতি থাকলেও বিষয়টি শরীয়তের দৃষ্টিতে বিশেষ কাম্য ও প্রশংসনীয় নয়।

এতো ছিলো সাধারাণ কাব্যরচনা ও কাবিতাবৃতির কথা। কিন্তু কুরআনে কারীমের কাব্যানুবাদের প্রসঙ্গটি সম্পূর্ণই ভিন্ন। কুরআন ঐশী গ্রন্থ। এর ধারা-ব্যাঞ্জনা ও বর্ণনাশৈলীর অলঙ্করণ স্পর্শ করা মানুষের সাধ্যের বাইরে। আরবি ভাষার গভীর বুৎপ্যাত্তি ছাড়া যা সঠিকভাবে অনুধাবন করা অসম্ভব। তাই ইসলামী ইতিহাসের সূচনাকাল থেকেই ভিন্ন ভাষায় কুরআনে কারীমের অনুবাদ করা যাবে কিনা, তা নিয়ে যথেষ্ট মতভিন্নতা ছিলো।

তবে ভিন্ন ভাষাভাষীদের বোঝার স্বার্থে কালামে পাক থেকে যথাযথ যোগ্যতা সম্পন্ন মুফাসসির যে অর্থ ও মর্ম অনুধাবন করেন, তা অনারবী ভাষায় ব্যাক্ত করা ও লেখার অনুমতি প্রদান করা হয়েছে। এজন্য এটাকে “তরজমাতুল কুরআন” না বলে মুহাক্কিকগন “তরজমাতু মাআনিল কুরআন” বলাকেই সঙ্গত মনে করেন। এখন সেই মর্মবাণীর কাব্যিক রূপ প্রদানের ক্ষেত্রে অন্তমিল, ছন্দ ইত্যাদির প্রয়োজনে সঠিক মর্মের প্রকাশ ব্যাহত হওয়াটা খুবই স্বাভাবিক। অথবা প্রকাশ সঠিক হলেও শ্রোতা বা পাঠক বিভ্রান্ত হতে পারে। এই আশংকার প্রতি লক্ষ্য করে ফুকাহায়ে কেরাম কুরআনের কাব্যানুবাদের প্রতি কঠোরভাবে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছেন।

ফিকহে হানাফির প্রশিদ্ধ আকর গ্রন্থ মাজমাউল আনহুরে আছে— من استعمل كلام الله تعالى فى بدل كلامه هازلا كفر، و كذا لو نظم القرآن بالفارسية. যে ব্যক্তি আল্লাহর কালামকে তার নিজের কথায় ঠাট্টার ছলে ব্যবহার করে, তাকে কাফের সাব্যস্ত করা হবে। অনুরূপ যে ব্যাক্তি ফার্সি ভাষায় কুরআনের কাব্যানুবাদ করে, তাকেও-(৬৯৩/১)

বিখ্যাত ফতোয়াগ্রন্থ আলমগীরীতে এসেছে— رجل نظم القرآن بالفارسية يقتل، لأنه كافر كذا في التاتارخانية. যে ব্যক্তি ফার্সি ভাষায় কুরআনের কাব্যিক অনুবাদ করেছে, তাকে হত্যা করা হবে। কেননা সে কাফের-(২৬৭/২)। কত ভয়ঙ্কর ব্যাপার!

এজন্য হাকীমুল উম্মত, মুজাদ্দিদে মিল্লাত হযরত মাওলানা আশরাফ আলী থানবী রহ. এর কাছে কুরআনে কারীমের কাব্যানুবাদের ব্যাপারে প্রশ্ন করলে, তিনি কঠোরভাবে নিষেধ করেন। ইমদাদুল ফাতাওয়া এর উদ্ধৃতিটি দেখুন- প্রশ্ন: কুরআন শরীফের উর্দুতে কাব্যানুবাদ করার বিধান কী?

উত্তর: সম্পূর্ণ না জায়েজ,বরং ফতোয়ায়ে আলমগীরীতে আছে যদি কোন ব্যক্তি ফার্সিতে কোরআনে কারিমের কাব্যানুবাদ করে তাহলে তাকে হত্যা করা হবে কারণ সে কাফের। وفي التخيير نظم القران بالفارسيه يقتل لانه كافر كافه طرق خابيه. বলাবাহুল্য ফার্সি কাব্যানুবাদ আর উর্দু কাব্যানুবাদ এর ক্ষেত্রে একই কথা প্রযোজ্য।

বাচ্চাদের কুফরীর কারণ হচ্ছে কোরআনের কাব্যানুবাদ করলে কুরআনে কারীমের অবমাননা হয়। সুতরাং যদি কারো কোরআন অবমাননার ইচ্ছা না থাকে তাহলে তাকে কাফের আখ্যায়িত করা হবে না। তবে কুরআনের কাব্যানুবাদ করতে তাকে বাধা দেওয়া হবে। বাধা দেওয়া সত্ত্বেও যদি সে বিরত না থাকে তাহলে সে ফাসেক এবং মারাত্মক গুনাগার হিসেবে বিবেচিত হবে।

এ ধরনের কাব্যানুবাদ করা এবং প্রকাশ ও প্রচার করা সম্পূর্ণ হারাম। সাম্প্রতিক বিশ্ব বিখ্যাত দ্বীনি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান জামিয়া ফারুকিয়া বিন্নোরী টাউন করাচি এর দারুল ইফতা থেকে প্রকাশিত একটি ফতোয়াতে কুরআনে কারীমের কাব্যানুবাদের প্রতি কঠোরনিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছে।

ফতয়াটি এখানে তুলে ধরছি- প্রশ্ন: কোরআনে কারিমের কাব্যানুবাদের কী বিধান? এটা কি জায়েজ?
অনুগ্রহপূর্বক দলিলসহ বিস্তারিত জানাবেন। উত্তর: কোরআনে কারিমের কাব্যানুবাদ করা জায়েজ নেই। এর থেকে সম্পূর্ণ বিরত থাকা জরুরী।

এতে অসুবিধে সমস্যা ও অসুবিধা রয়েছে, যা হাকীমুল উম্মত মুজাদ্দিদে মিল্লাত হযরত মাওলানা শাহ আশরাফ আলী থানভী রহ সবিস্তার আলোচনা করেছেন। দেখুন দারুল উলূম করাচী হতে প্রকাশিত ইমদাদুল ফাতাওয়া ৫১/৪।

একটি সংশয় নিরসন: সাম্প্রতিক দারুল উলূম দেওবন্দ হতে প্রকাশিত একটি ফতোয়াতে শর্তসাপেক্ষে কুরআনে কারীমের কাব্যানুবাদ জায়েজ হওয়ার যে প্রচারনা চালানো হচ্ছে এব্যাপারে সঠিক কথা হচ্ছে- আলোচ্য ফতোয়াটিতে কুরআনে কারীমের কাব্যানুবাদের ব্যাপক অনুমতি দেওয়া হয়নি,বরং শর্তসাপেক্ষে জায়েজ আখ্যায়িত করা হয়েছে। এখানে লক্ষণীয় বিষয় হচ্ছে যে সকল শর্তের ভিত্তিতে জায়েজ বলা হয়েছে সেগুলো খুব সহজলভ্য নয়।

সুতরাং اذا فات الشرط فات المشروط এর ভিত্তিতে এটা নিয়ে সংশয় সৃষ্টি করার কোন সুযোগ নেই। এছাড়া হযরত হাকীমুল উম্মত,মুজাদ্দিদে মিল্লাত হযরত মাওলানা শাহ আশরাফ আলী থানভী রহ এর ফতোয়ার সাংঘর্ষিক হওয়ায় উভয় ফতোয়া راجح مرجوح এর মূলনীতি অনুযায়ী হাকীমুল উম্মত হযরত থানভী রহ এর ফতোয়াটি অগ্রগণ্য ও কার্যকর বলে বিবেচিত হবে।

কুরআনের কাব্যানুবাদে তাহরীফে কুরআন বা কুরআন বিকৃত হওয়ার শুধু সম্ভাবনাই নেই,বরং অবশসম্ভাবী। তাই যেকোন ভাষায় কুরআনের কাব্যানুবাদ সসম্পূর্ণ নাজায়েজ ও হারাম। বরং এধরনের কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তোলা সমগ্র মুসলিম উম্মাহর ঈমানী দায়িত্ব।

লেখক: প্রধান মুফতি ও মুহতামিম, মারকাযুদ্ দিরাসাহ আল ইসলামিয়্যাহ্ ঢাকা। মুফতি ও মুহাদ্দিস, জামি’আ ইসলামিয়া লালমাটিয়া, মোহাম্মাদপুর ঢাকা।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here