মুফতী মাসউদুর রহমান ওবাইদী

শিখোবাংলায়.কম: ঘরে যেইদিন মেহমানদের দাওয়াত দেওয়া হয়, সেইদিন মেজবানের অনেক কষ্ট করতে হয়। অনেক আইটেমের রান্না করতে হয়, রান্নাঘরের গরমেই তার কেটে যায় ৬/৭ ঘন্টা। এছাড়াও থাকে বাচ্চা সামলানো, ঘর গুছানো ইত্যাদি।

মেহমানের উচিৎ অল্প সময় মেজবানের বাসায় থাকা। খাবারের অল্প আগে যাবে, গল্প করবে ও খাবার পরিবেশনে সাহায্য করবে, খাবারের পরে জলদি করে ঘরটা গুছিয়ে দিয়ে থালাবাসন ধুইতে সাহায্য করে এরপর খুব জলদি চলে যাবে। এর জন্য অবশ্য মেহমানদের সকলের থাকার প্রয়োজন নেই। দুই একজন থাকলেই হবে। বাকিরা খাওয়ার পর বেশি দেরি না করে চলে যাবে। এতে মেজবানের আরাম হয়, সে দ্রুত বিছানায় ক্লান্ত শরীরটা ছেড়ে দিতে পারে।

কথিত আছে নোয়াখালীর মানুষ নাকি খেয়েই দৌড় দেয়। কথাটা খোঁটা দিতে বলা হয় আরকি। মানে খেতেই আসছিল, খাওয়া শেষ তাই চলে গেলো। কিন্তু আমি জানি এমনটাই উচিৎ, অর্থাৎ খেয়ে বেশি সময় পর্যন্ত থেকে মেজবানকে কষ্ট না দেওয়া। আমি সব সময় কোনো দাওয়াতে গেলে অস্থির থাকি বাসায় ফেরার জন্য। এবং প্রায়শই এই বাক্য আমার শোনা লাগে। শেষ কিছুদিন আগে এক দাওয়াতে যাই। সেখানে ডিনার শেষে জলদি ফিরতে চাইলে এইকথাটা শোনা লাগে। তখন আমি বললাম, দেখুন, আমরা টিটকারির ছলেও আল্লাহর আদেশ অমান্য করছি, বা আল্লাহর আদেশের বিরোধীতা করছি। কুরআনেই সাহাবীদেরকে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা বলেছেন তারা যেন খাওয়ার পর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের বাসায় বেশিক্ষণ না থাকেন। 

বিশ্বাস করুন, উপস্থিত সবাই প্রচণ্ড অবাক হয়েছিলেন যে এমন একটা বিষয়েও আয়াত আছে! 

আসুন আয়াতটা জেনে নেই ও নোয়াখালীদের মত আমল করি। মানে আয়াতুল্লাহে আমল করি।

يَٰٓأَيُّهَا ٱلَّذِينَ ءَامَنُوا۟ لَا تَدْخُلُوا۟ بُيُوتَ ٱلنَّبِىِّ إِلَّآ أَن يُؤْذَنَ لَكُمْ إِلَىٰ طَعَامٍ غَيْرَ نَٰظِرِينَ إِنَىٰهُ وَلَٰكِنْ إِذَا دُعِيتُمْ فَٱدْخُلُوا۟ فَإِذَا طَعِمْتُمْ فَٱنتَشِرُوا۟ وَلَا مُسْتَـْٔنِسِينَ لِحَدِيثٍۚ إِنَّ ذَٰلِكُمْ كَانَ يُؤْذِى ٱلنَّبِىَّ فَيَسْتَحْىِۦ مِنكُمْۖ وَٱللَّهُ لَا يَسْتَحْىِۦ مِنَ ٱلْحَقِّۚ 

অর্থ- হে মুমিনগণ! তোমাদেরকে অনুমতি দেয়া না হলে তোমরা খাদ্য প্রস্তুত হওয়ার আগেই আহারের জন্য নাবী-গৃহে প্রবেশ করনা। তবে তোমাদেরকে আহবান করলে তোমরা প্রবেশ কর এবং আহার শেষে তোমরা চলে যেও; তোমরা কথাবার্তায় মশগুল হয়ে পড়না। কারণ তোমাদের এই আচরণ নাবীকে পীড়া দেয়, সে তোমাদেরকে উঠিয়ে দিতে সংকোচ বোধ করে। কিন্তু আল্লাহ সত্য বলতে সংকোচ বোধ করেননা। 

-[আল আহযাব- ৫৩] 

রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কক্ষে এসে কেউ কেউ এমন আচরণ করতেন, অর্থাৎ গল্প জুড়ে দিতেন ও ওঠার নাম নিতেন না। এমন আচরণের মাধ্যমে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কষ্ট পেতেন এবং তিনি নিজের ভদ্র ও উদার স্বভাবের কারণে চুপ থাকতেন, কিন্তু যাইনাব রাদিয়াল্লাহু তায়ালা আনহার ওয়ালিমার দিন এ কষ্টদায়ক আচরণ সীমা ছাড়িয়ে যাচ্ছিল। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের খাদেম হযরত আনাস রাদিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু বর্ণনা করেছেন- 

“রাতের বেলা ছিল ওয়ালিমার দাওয়াত ৷ সাধারণ লোকেরা খাওয়া শেষ করে বিদায় নিয়েছিল। কিন্তু দু-তিনজন লোক বসে কথাবার্তায় মশগুল হয়ে গিয়েছিলেন। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বিরক্ত হয়ে উঠলেন এবং পবিত্ৰ স্ত্রীদের ওখান থেকে এক চক্কর দিয়ে এলেন। ফিরে এসে দেখলেন তারা যথারীতি বসেই আছেন। তিনি আবার ফিরে গেলেন এবং আয়েশার কামরায় বসলেন। অনেকটা রাত অতিবাহিত হয়ে যাবার পর যখন তিনি জানলেন তারা চলে গেছেন। তখন তিনি যাইনাবের কক্ষে গেলেন। এরপর এ বদ অভ্যাসগুলো সম্পর্কে লোকদেরকে সতর্ক করে দেয়ার ব্যাপারটি স্বয়ং আল্লাহ নিজেই গ্ৰহণ করলেন। ” 

– [বুখারী: ৫১৬৩, মুসলিম: ১৪২৮] 

আনাস রাদিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুর বর্ণনা অনুযায়ী এ আয়াত সে সময়ই নাযিল হয় ৷ 

সৌজন্যতা আসলে মেজবানের বাসায় অনেক সময় ধরে বসে থাকা নয়, বরং মেজবানের কাজ গুছিয়ে যত দ্রুত সম্ভব সেখান থেকে চলে যাওয়া।