ইসলামে রাগ ও তার প্রতিকার

20

শিখো বাংলায়: রাগ বা ক্রোধ মানবিক চরিত্রের অন্যতম অনুষঙ্গ। রাগ নেই এমন মানুষ খুঁজে পাওয়া কঠিন। স্থান বিশেষে রাগের প্রয়োজনীয়তা থাকলেও সামগ্রিক দৃষ্টিতে রাগ কোনো ভালো গুণ নয়। দীর্ঘ দিনের তিলে তিলে করা অর্জন রাগের অপরিনামদর্শী অভিশাপে নিমিষেই মুখ থুবড়ে পড়ে। রাগ মানুষকে বেসামাল করে তোলে। জ্ঞান, বিবেক ও ধর্মের পথ থেকে বিচ্যুত করে মানুষকে বিপথে নিয়ে যায়।

আমাদের সামাজিক জীবনে নানা সংকটের মূলে রয়েছে অনিয়ন্ত্রিত রাগের প্রকাশ। দীর্ঘ দিনের সাজানো সংসার রাগের এক বিস্ফোরণে ভেঙ্গে খান খান হয়ে যায়।আপন হয়ে যায় পর, বন্ধু পরিণত হয় চির শত্রুতে। রাগের আতিশয্যে বিবেক লোপ পেয়ে মানুষ হত্যার ন্যায় মহাপাপেও লিপ্ত হয়ে যায়। তাই ইসলাম রাগকে মানবিক ত্রুটি আখ্যা দিয়ে রাগ নিয়ন্ত্রণের নির্দেশ দিয়েছে। মহান আল্লাহ আল কোরআনে ইরশাদ করেছেন, সুখে-দুঃখে আল্লাহর রাস্তায় দানকারীগণ, রাগ দমনকারীগণ এবং মানুষকে ক্ষমাকারীগণ (সৎকর্মশীল) আর আল্লাহ সৎকর্মশীলদের ভালোবাসেন। (সুরা আলে ইমরান : ১৩৪)

হযরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, এক ব্যক্তি নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নিকট এসে বলল, ‘আমাকে উপদেশ দিন।’ তিনি বললেন, ‘রাগ কোরো না।’ সে ব্যক্তি কয়েকবার এ কথা বলল, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম প্রত্যেকবার বললেন, ‘রাগ কোরো না।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস : ৬১১৬)

অন্য হাদিসে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন— ‘সে ব্যক্তি শক্তিশালী নয়, যে ব্যক্তি কুস্তি লড়ে অপরকে ধরাশায়ী করে, বরং প্রকৃতপক্ষে সে ব্যক্তিই শক্তিশালী, যে রাগের সময় নিজেকে সংবরণ করতে পারে।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস : ৬৮০৯) সুপ্রসিদ্ধ ইমাম ইবনুল কায়্যিম রহ. রাগকে এক ধরণের আত্মীক রোগ বলে আখ্যায়িত করেছেন।

রাগ দমনে ইসলামের নির্দেশিকা

রাগান্বিত না হওয়ার শত চেষ্টার পরেও রাগ উঠে গেলে সেক্ষেত্রে রাগ কে সংবরণ করার জন্য ইসলাম কিছু কার্যকরী নির্দেশনা দিয়েছে। সে নির্দেশনাগুলোকে পরিপূর্ণভাবে ফলো করলে অযাচিত রাগের বহিঃপ্রকাশ থেকে নিজেকে আটকে রাখা সহজ হবে।

এক. আঊযুবিল্লাহি মিনাশ শাইতানির রজীম পাঠ করা। কেউ রাগান্বিত হলে রাগ দমনের জন্য নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আঊযুবিল্লাহি মিনাশ শাইতানির রজীম” পড়তে বলেছেন, এতে তার রাগ দূর হয়ে যাবে।

সুলাইমান ইবনে সারদ রা. থেকে বর্ণিত, দুই ব্যক্তি পরস্পর গালাগাল করছিল। তাদের একজনের চোখ লাল হয়ে উঠল ও গলার শিরা ফুলে গেল। তখন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, ‘আমি একটি বাক্য জানি, যদি সে তা পড়ে তাহলে তার এ অবস্থা কেটে যাবে। সে বাক্যটি হলো, আঊযুবিল্লাহি মিনাশ শাইতানির রজীম (আমি আল্লাহর কাছে অভিশপ্ত শয়তান থেকে আশ্রয় প্রার্থনা করছি।’) (বুখারী: ৩১০৮, মুসলিম: ৬৮১২)

দুই. নিজের শারিরীক অবস্থার পরিবর্তন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম রাগান্বিত ব্যক্তিকে রাগ দমনের জন্য শারিরীক অবস্থা পরিবর্তনের নির্দেশ দিয়েছেন।

আবু যর গিফারী রা. থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, ‘যখন তোমাদের কারো রাগ হয় তখন সে যদি দাঁড়ানো থাকে, তবে যেন বসে পড়ে। যদি তাতে রাগ চলে যায় ভালো। আর যদি না যায়, তবে সে যেন শুয়ে পড়ে।’ (সুনানে আবি দাউদ, হাদিস : ৪৭৮৪)

তিন. চুপ হয়ে যাওয়া। হাদিস শরিফে রাগ সংবরণে রাগান্বিত ব্যক্তিকে নিশ্চুপ হয়ে যাওয়ার আদেশ করা হয়েছে। হযরত ইবনে আব্বাস রা. থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, তোমরা (মানুষকে) শিক্ষা দাও, সুসংবাদ দাও, কঠিন করো না। তোমাদের কেউ যখন রাগান্বিত হয়, তখন সে যেন চুপ হয়ে যায়। (বুখারী ফিল আদব: ২৪৫, মুসনাদে আহমদ : ৩/ ২৩৯)

শাদীস শাস্ত্রের বরিত ইমাম ইবনে রজব হাম্বলী রহ. বলেন, এটাও (চুপ থাকা) রাগ সংবরণের অন্যতম কার্যকরী উপায়। রাগের সময় মানুষ অনেক অনুচিত কথা বলে ফেলে যার ফলে সে পরবর্তীতে অনুতপ্ত হয় নানা অনিষ্টতার শিকার হয়। যদি সে রাগের সময় চুপ থাকে, তাহলে সে বহু অনিষ্টতা থেকে বেঁচে যাবে। (জামিউল উলূমি ওয়াল হিকাম: ১/ ১৪৬)

রাগের আতিশয্যে মানুষ অশালীন কথা-বার্তা ও তালাকের মতো জঘন্য বিষয়ে লিপ্ত হয়ে যায়। এমনকি কখনো কুফূরি বাক্য পর্যন্ত উচ্চারণ করে বসে।
প্রখ্যাত বুজূর্গ ইমাম মুআররিক আল ইজলী রহ. বলেছেন, আমি জীবনে কখনো মাত্রাতিরিক্ত রাগান্বিত হইনি এবং রাগের বশে কখনো এমন কোনো কথা বলিনি, যাতে পরবর্তীতে আমার লজ্জিত হতে হয়েছে। ( আয যুহদ: ৩০৫)

চার. ওযু করা। ওযু করার মাধ্যমে রাগ অনবদমিত হওয়ার কথা হাদিসে উল্লেখ রয়েছে। হযরত আতিয়্যাহ আস সাদী রা. থেকে বর্ণিত, প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, নিশ্চয় রাগ শয়তানের পক্ষ থেকে আসে। আর শয়তান আগুনের তৈরি। নিশ্চয় পানির দ্বারা আগুন নির্বাপিত হয়। সুতরাং তোমাদের কেউ যখন রাগান্বিত হয় সে যেন অজু করে।’ (সুনানে আবি দাউদ, হাদিস : ৪৭৮৬)

পাঁচ. রাগের অপূরনীয় ক্ষতি ও কোরআন-সুন্নাহয় ঘোষিত রাগ নিয়ন্ত্রণের পুরস্কারের কথা স্মরণ করা।

রাগ দমনের পুরস্কার

ইসলাম রাগ দমনের নির্দেশ দানের পাশাপাশি রাগ দমনকারীর জন্য বহু পুরস্কারের কথাও ঘোষণা করেছে। এক. মহান আল্লাহর ভালোবাসা মহান আল্লাহ আল কোরআনে ঘোষণা করেন, যারা সুখে-দুঃখে (আল্লাহর রাস্তায়) দান করে, যারা রাগ দমন করে এবং যারা মানুষকে ক্ষমা করে (তারা সৎকর্মশীল) আর আল্লাহ সৎকর্মশীলদের ভালোবাসেন। (সুরা আলে ইমরান : ১৩৪)

দুই. জান্নাতের সুসংবাদ। হযরত আবু দারদা রা. একবার প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কে বললেন, হে আল্লাহর রসূল! আমাকে এমন একটি আমলের কথা বলে দিন যা আমাকে জান্নাতে নিয়ে যাবে। রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, তুমি রাগ করবে না, তাহলে তোমার জন্য জান্নাত। (তবারানী: ২৩৫৩)

তিন. হাশরের মাঠে সকলের সামনে বিশেষ সম্মান দান। হযরত আনাস রা. থেকে বর্ণিত, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, যে ব্যক্তি প্রতিশোধ গ্রহণের সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও নিজের রাগকে সংবরণ করবে, আল্লাহ তাকে কিয়ামত দিবসে সকল মাখলুকের সামনে ডেকে এনে সে যে হুরকে চায় তাকে নিয়ে নেওয়ার ইচ্ছাধিকার দান করবেন। (আবু দাউদ: ৪৭৭৭, তিরমিযি : ২৪৯৩)

চার. আল্লাহর ক্রোধ থেকে মুক্তি। আব্দুল্লাহ ইবনে আমর রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি বলললাম, হে আল্লাহর রসূল! কোন জিনিস আমাকে আল্লাহর ক্রোধ থেকে রক্ষা করতে পারে? তিনি বললেন, তুমি রাগ করো না। (সহীহ ইবনে হিব্বান: ২৯৬)অ র্থাৎ, তুমি রাগ করা থেকে বিরত থাকলে আল্লাহর ক্রোধ থেকে রেহাই পাবে।

পাঁচ. ঈমান বৃদ্ধি। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, আমার নিকট হজম করার জিনিসের মধ্যে সর্বোত্তম হলো, কোনো ব্যক্তির তার রাগকে হজম করে নেওয়া। যে ব্যক্তি আল্লাহর জন্য তার রাগকে হজম করে নিল, আল্লাহ তাকে ঈমান দ্বারা পরিপূর্ণ করে দিবেন।
(মুসনাদে আহমদ : ১/ ৩২৭)

ছয়. বিপুল সওয়াবের সুসংবাদ। ইবনে উমর রা. থেকে বর্ণিত, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, আল্লাহর সন্তুষ্টির আশায় বান্দার রাগ হজম করে নেওয়া আল্লাহর নিকট বিশাল প্রতিদান লাভের মাধ্যম হয়। (মুসনাদে আহমদ: ২/১২৮)

রাগ উঠবেই, কিন্তু রাগ দমন করতে হবে।রাগকে জয় করতে হবে, হেরে যাওয়া যাবে না। এভাবে রাগ দমনের মাধ্যমে আমরা ইহজাগতিক ও পরলৌকিক নানা ধরণের সংকট ও সমস্যায় জর্জরিত হওয়া থেকে নিজেকে রক্ষা করতে পারি। আল্লাহ আমাদের ভালো কাজ করবার তউফিক দিন এবং আমাদের নেক আমলগুলো কবুল করুন। আমীন।

লেখক: শিক্ষার্থী, ফতোয়া বিভাগ, জামিয়া রাহমানিয়া আরাবিয়া

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here