ইমাম আবু হানিফা (রহঃ) এর গুরুত্বপূর্ণ ৭০টি ওসিয়তনামা

42

ইমাম আবু হানিফা (রহঃ) এর ওসিয়তনামা 

শিখো বাংলায়: (1) সাধারণ লোকজনের সামনে একমাত্র এমন সব ব্যাপারে কথা বলবে, যে ব্যাপারে তোমাকে প্রশ্ন করা হয়েছে ৷

 (2) তুমি পাবলিকের সাথে জাগতিক লেনদেন ও ব্যবসা-বাণিজ্য নিয়ে অতিরিক্ত কথা বলবেনা ৷ একমাত্র সেটাই আলোচনা করবে যার সাথে এলেমের সম্পর্ক রয়েছে ৷ যাতে তারা এটা অনুভব না করে যে, সম্পদের প্রতি তোমার আকর্ষণ ও লোক আছে ৷ এতে তারা তোমার প্রতি খারাপ ধারণা করা আরম্ভ করবে ৷ তারা ধারণা করবে যে তুমি ঘুষ ও উৎকোচ গ্রহণের প্রতি লালায়িত এবং তুমি সে দিকে হাত বাড়াতে প্রস্তুত আছো ৷

(3) সাধারণ মানুষদের সামনে অট্টহাসি দিবে না ৷

(4) তুমি অধিক পরিমাণে বাজারে গমন করবে না ৷

(5) সাবালক হওয়ার নিকটবর্তী ছেলেদের সাথে অন্তরঙ্গ ভাবে কথা বলবে না ৷ কেননা তারা ফেতনার কারণ হতে পারে ৷ তবে শিশুদের সাথে কথা বলা এবং তাদের মাথায় হাত বুলিয়ে দেওয়ার মধ্যে কোন সমস্যা নাই ৷

(6) সাধারণ মানুষদের মধ্য হতে বয়স্কদের সাথে রাস্তায় হাঁটা চলা করবেনা ৷ কেননা যদি তুমি তাদেরকে সামনে দাও , ইলমের মর্যাদা কমে যাবে  ৷ আর যদি তাদেরকে পিছনে দাও , তখন তার কাছে তোমার মর্যাদা কমে যাবে ৷

(7) তুমি রাস্তায় বসবে না যদি তোমার সে ধরনের প্রয়োজন দেখা দেয় ( ঘরে না বসে অন্যত্র বসতে হয় ) তবে তুমি মসজিদে গিয়ে বসবে ৷

(8) বাজারে এবং মসজিদে খাবার খাবে না ৷

(9) তুমি ঘরে বিছানায় গিয়ে তোমার স্ত্রীর সাথে অধিক কথাবার্তা বলবে না ৷ শুধু প্রয়োজন অনুসারে কথা বলবে ৷

(10) স্ত্রীকে বেশি পরিমাণ স্পর্শ ও হাত লাগাবে না ৷

(11) আল্লাহর স্মরন ছাড়া তার নিকটবর্তী হবে না ৷

(12) অন্যের স্ত্রী ও দাসীদের আলোচনা তার সামনে করবে না ৷

(13) আর যতটুকু সম্ভব তোমার স্ত্রী পিতা -মাতার ঘরে প্রবেশ করবে না ৷

(14) পূর্ব স্বামী থেকে সন্তান-সন্ততির অধিকারিণী মহিলাকে বিয়ে করা থেকে বিরত থাকবে ৷ কারণ সে তাদের জন্যে সমস্ত সম্পদ জমা করবে এবং সম্পদ চুরি করে তাদের জন্য ব্যয়  করবে ৷ কারণ তার কাছে তুমি অপেক্ষা সন্তান মূল্যবান ৷

(15) দুই স্ত্রীকে একই ঘরে একত্রিত করবে না ৷

(16) প্রথমে ইলম অর্জন করো৷ তারপর হালাল সম্পদ জমা করো  অতঃপর বিয়ে করো  ৷ কেননা ইলম অর্জনের সময় যদি তুমি সম্পদ উপার্জনে নিয়োজিত হও, তবে তুমি ইলম  থেকে বঞ্চিত হয়ে যাবে ৷ আর ইলম অর্জনের পূর্বে বিয়ে করলে  স্ত্রীর প্রতি ঝুঁকে পড়া থেকে বিরত থাকবে ৷ এরকম করলে তোমার সময় অপচয় হবে  এবং সন্তানাদির অনেক দায়িত্ব তোমার উপর চেপে বসবে আত্মীয়-স্বজন অনেক হয়ে যাবে ৷ এতে তুমি তাদের প্রয়োজন পূরণের কাজে লেগে যাবে এবং এলেম থেকে বঞ্চিত রয়ে যাবে ৷

 (17) মানুষের সাথে এমন পন্থা অবলম্বন করবে না যার দ্বারা তাদের অসম্মানী হয় ৷ মানুষদের সম্মান করবে ৷ মানুষের সাথে অধিক পরিমাণে মেলামেশা করবে না , যতক্ষণ না তারা তোমার সাথে মেলামেশা কে ভালোবাসে ৷ তুমি তাদের সাক্ষাতে মাসআলা-মাসায়েল আলোচনা করবে ৷

(18) যে ব্যক্তি তোমার কাছে মাসআলা জানার জন্য ফতোয়া তালাশ করবে তাকে শুধু তার প্রশ্নের জবাব দিবে ৷ উত্তরের সাথে অন্য কোনো কথা যুক্ত করবে না ৷ এরকম করার দ্বারা প্রশ্নের উত্তর বুঝে নিতে তার পেরেশানি সৃষ্টি করবে ৷

(19) যদি তুমি দশ  বছরও কোন রোজগার ও খাবার থেকে বঞ্চিত থাকো  তারপরেও এলেম অর্জন থেকে নিজের চেহারা ফিরিয়ে নিবে না ৷ কারণ তুমি এই পথ থেকে ফিরে গেলে তোমার জীবন যাত্রার মান আরো সংকীর্ণ হয়ে পড়বে ৷

(20) সাধারণ মানুষ ও বাজারের মানুষদের মধ্যে থেকে যারা তোমার সাথে ঝগড়া করতে চাই, তুমি তার সাথে ঝগড়া করবে না৷ এরকম করলে সে তোমার সম্মান ছিনিয়ে নেবে৷

(21) সত্য কথা বলার সময় কারো সম্মান ও প্রভাবের কোন পরোয়া করবে না ৷ যদিও সে বাদশা হয় ৷

(22) জ্ঞানী-গুণীদের উপস্থিতিতে তুমি কোন ফতোয়া দিবে না ৷ যদি মানুষজন তোমার কাছে ফতোয়া তালাশ করে ৷ জ্ঞানীদের সাথে তর্ক -বিতর্ক আলোচনা -সমালোচনা ও জ্ঞানগত মুকাবিলায় অবতীর্ণ হবে না ৷

(23) তাদের সামনে স্পষ্ট দলিল ব্যতীত কোনো আলোচনা করতে যাবে না ৷

(24) মানুষজন থেকে  পূর্ণ সতর্ক থাকবে ৷ ( তোমার সাথে চলাফেরা কারী লোকজন থেকে সতর্ক থাকবে৷ যাতে তারা তোমায় ধোঁকা দিতে এবং ক্ষতি সাধন করতে না পারে৷)

(25) তুমি প্রকাশ্যে সবার সামনে আল্লাহর সাথে যেরকম সম্পর্ক রাখো, গোপনেও আল্লাহর সাথে সেরকম সম্পর্ক রাখবে ৷

(26) আর( শরীয়ত স্বীকৃত ) বিতর্কের অনুষ্ঠানে ভয় এবং প্রভাবিত হয়ে কথা বলবে না৷  কেননা এতে  অন্তরের কথা প্রকাশ করার ক্ষেত্রে বাধা সৃষ্টি হয় ৷ এবং তা মুখে উচ্চারণ বাধাগ্রস্ত হয় ৷

(27) তুমি অধিক পরিমাণে হাসি থেকে বিরত থাকবে কেননা তা মানুষের অন্তরকে মৃত করে দেয় ৷

(28) আর তুমি মহিলাদের সাথে অধিক পরিমাণে কথোকপথনে লিপ্ত হবে না কেউ না তা মানুষের অন্তরে মৃত করে ফেলে ৷

(29) তুমি নিজের চলাফেরার মধ্যে প্রশান্ত এবং কাজের মধ্যে হঠকারী হয়ে পড়ো না ৷

(30) পিছন থেকে আহবানকারীর ডাকে সাড়া দিবে না৷ কারণ পশুরাও পিছন থেকে আহবান করেন ৷

(31) কথা বলার সময় চিৎকার করো না এবং তোমার স্বর উচ্চ করো না ৷

(32) মানুষের মাঝে বেশি পরিমাণে আল্লাহর জিকির করো৷ যাতে মানুষরা শিখতে পারে ৷( এবং তোমার জিকিরের আধিক্য দেখে তারাও যাতে বেশি জিকির করতে উৎসাহিত হয় ৷)

(33) নিজের ব্যাপারে খেয়াল রাখ এবং অন্যের অধিকারের প্রতি যত্নশীল হও ৷ যাতে তারা তোমার দুনিয়া ও আখিরাত ( এর আমল ও ব্যস্ততা দেখে তোমার ইলিম দ্বারা উপকৃত হতে পারে )

(34) আর তুমি নিজেকে সাধারণ মানুষদের মধ্যে থেকে গণ্য করবে৷  তবে হ্যাঁ নিজের শাস্ত্র তথা এলেমের বিষয়ে ভিন্ন মনে করবে ৷( এই ক্ষেত্রে তোমার ইলমি আমলি বিশেষ দায়িত্ব থাকার বিষয়টি অনুধাবন  করার চেষ্টা করবে ৷

(35) পাপ কাজের মধ্যে মানুষের অনুসরণ করো না৷ বরং ভালো কাজে মানুষের আনুগত্য করো ৷

(36) মৃত্যুকে স্মরণ করো এবং তোমার শিক্ষক সহ ও যাদের থেকে ইলম হাসিল করেছো তাদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করো ৷

(37) এবং সর্বদা কোরআনে কারিম তেলাওয়াতের মগ্ন থাকো ৷

(38) বেশি বেশি কবর জিয়ারত করো ৷ ওলামা-মাশায়েখের সাথে সাক্ষাৎ করো এবং বরকত পূর্ণ স্থান সমূহ পরিদর্শন করো ৷

(39) তুমি অভিসম্পাত ও গালমন্দের ব্যবহার করো না ৷

(40) আযান দেওয়ার পর মসজিদে প্রবেশ করার জন্য প্রস্তুত হয়ে যাও ৷ যাতে সাধারণ লোকজন তোমার আগে মসজিদে প্রবেশ করতে না পারে ৷

(41) তোমার প্রতিবেশীর গোপনীয় কোন বিষয়ে দেখলে, তা গোপন রাখবে কেননা এটা তোমার কাছে আমানত ৷ মানুষের ( অপ্রকাশ যোগ্য গোপন ভেদ প্রকাশ করবে না )

(42) কোন ব্যক্তি তোমার কাছে কোন বিষয়ে পরামর্শ চাইলে, তাকে ওই বিষয়ে পরামর্শ দাও যে বিষয়টি তোমাকে আল্লাহর নিকটবর্তী করে দেওয়ার নিশ্চয়তা আছে ৷ এটা আমার ওসিয়ত তুমি এটা গ্রহণ করলে ইনশাআল্লাহ দুনিয়া ও আখিরাতের তোমার উপকার আসবে৷

(43) তুমি কৃপণ হয়ে যেও না ৷ কেননা কৃপণকে মানুষ ঘৃণা করে ৷(এতে মানুষ লাঞ্চিত হয়)

 (44) প্রত্যেক অবস্থায় সাদা পোশাক পরিধান করবে ৷

(45) তুমি সাহস লালন করো৷( ভীরু হয়ে যাবে না ৷) কেননা যার সাহস দুর্বল হয়ে ,যায় তার মর্যাদা ও দুর্বল হয়ে পড়ে ৷

(46) রাস্তায় চলার সময় ডানে-বামে তাকাবে না  সর্বাবস্থায় নিজের দৃষ্টিকে জমিনের দিকে রাখবে ৷

(47) সামান্য খাদ্যদ্রব্য ও পয়সা কড়ি নিয়ে দরকষাকষি করবে না ৷

(48) বড়দের কোন অনুষ্ঠানে গমন করার পর তারা তোমাকে যতক্ষন উচ্চ আসন না দেয়,   ততক্ষণ নিজ থেকে উচ্চ আসন গ্রহণ করবে না ৷ যাতে তাদের পক্ষ থেকে তোমাকে কোন ক্ষতির সম্মুখীন হতে না হয় ৷

 (49)  দুপুরবেলা অথবা সকাল বেলা ছাড়া গোসলখানায় প্রবেশ করবে না ৷

(50) আর জেনে রাখ যখন তুমি মানুষের সাথে অসৎ ব্যবহার করবে, তারা তোমার দুশমন হয়ে যাবে ৷ যদিও তারা ইতিপূর্বে তোমার পিতা)মাতার মত হয়ে গিয়েছিল৷ আর যখন তুমি ভাল ব্যবহার করবে, তার নিকটাত্মীয় না হলেও তোমার জন্য পিতামাতার মত হয়ে যাবে ৷

(51) ইলমি  আসরে রাগ ও গোস্বা থেকে নিবৃত্ত থাকবে ৷

(52) বিয়ের খুতবা পড়ার দায়িত্ব সেই এলাকার খতিবের উপর ছেড়ে দাও ৷

(53) যে তোমার সাথে খারাপ ব্যবহার করে তার সাথেও সম্পর্ক রাখবে ৷ তোমার কাছে আগমনকারীদের সম্মান করবে ৷ যে তোমার সাথে অন্যায় করে, তাকে ক্ষমা করে দিবে ৷ যে তোমার নিন্দা করে এবং সমালোচনা করে তুমি তার সুনাম করবে ৷ যে তোমার কাছে হোক পাবে মৃত্যুবরণ করলেও তার হক আদায় করে দিবে৷ ( অর্থাৎ ওয়ারিশদের কে দিয়ে দিবে ) ৷ কারো কোন আনন্দ দেখলে তাকে অভিনন্দন জানাবে ৷ কোন লোকের বিপদ দেখলে , তাকে সান্তনা দিবে ৷ কোন লোক আপদ গ্রস্ত হলে সমাবেদনা যাপন করবে ৷

(54) বিশ্বাসঘাতকতা থেকে দূরে থাকবে ৷ যদিও তারা তোমার সাথে বিশ্বাস ভঙ্গ করে ৷আমানত আদায় করে দাও  ৷ যদিও তারা আমানতের খেয়ানত করে ৷ বন্ধুত্ব ও অঙ্গীকারের বিশ্বস্ততা রক্ষা করবে ৷ তাকওয়া বা আল্লাহ ভীতিকে মজবুত ভাবে আঁকড়ে ধরবে ৷

(55) যে বিষয়ে জ্ঞান থাকা জরুরি সে বিষয়ে অজ্ঞ থেকে যাবে না ৷

(56) কোন মুসলমান অথবা কোন জিম্মির সাথে শত্রুতা করবে না ৷

(57) আল্লাহ তোমাকে যে সম্পদ এবং সম্মান দিয়েছেন, তার ওপর সন্তুষ্ট হয়ে যাবে ৷

(58) তোমার হাতে থাকা সম্পর্কে চিন্তা ফিকির করে পরিচালনা করবে ,যাতে মানুষ থেকে তুমি অমুখাপেক্ষী থাকতে পারো ৷

(59)  সাবধান মানুষের দৃষ্টিতে নিজেকে মূল্যহীন করে তুলবে না ৷

(60) অনর্থক কাজে নিজেকে লিপ্ত রাখবে না ৷

(61) মানুষের সাথে সাক্ষাৎ হলে নিজে সর্বপ্রথম সালাম করো এবং সুন্দরভাবে কথা বার্তা বল ৷

(62) সৎকর্মশীলদের সাথে ভালোবাসার ব্যবহার করবে এবং অসৎ লোকদের সাথে আত্মরক্ষামূলক তোষামোদ করবে ৷

(63) অধিক পরিমাণে আল্লাহর জিকির করবে এবং রীসূল ( সাঃ) এর প্রতি বেশি বেশি দরূদ পাঠ করবে ৷

(64) নিজস্ব রহস্য ,তোমার সম্পদ ,তোমার পছন্দ ও তোমার যতায়াত কে গোপন রাখবে

(65) প্রতিবেশীদের সাথে ভাল ব্যবহার করবে ৷এবং প্রতিবেশীর পক্ষ থেকে পৌঁছা কষ্টের ওপর ধৈর্য ধারণ করবে ৷

(66) আহলে সুন্নাত ওয়াল জামা’আতের মতামত গ্রহণ করবে ৷ অজ্ঞ পথভ্রষ্টদের থেকে দূরে থাকবে ৷

(68) স্ত্রীর সাথে শ্বশুরালয়ে থেকে যাওয়ার উপর তুমি কখনো রাজি হবে না ৷ কেননা এতে তারা তোমার সম্পদ নিয়ে যাবে ৷ এবং তোমার সম্পদ ব্যয় করার প্রতি অনেক বেশি লালসা করবে  ৷ আর পিতা মাতার ঘরে থাকার কারণে স্ত্রী তোমার স্বভাব চরিত্রের ওপর গড়ে উঠবে না ৷ ( এতে পারিবারিক অশান্তি হবে ৷)

(68) সাধারণ লোকজনের সামনে একমাত্র এমন সব ব্যাপারে কথা বলবে যে ব্যাপারে তোমাকে প্রশ্ন করা হয়েছে ৷

(69) স্বয়ং নিজে বাজারে গিয়ে বেচাকেনা করবে না৷

(70) আল্লাহ তা’য়ালা আমাদেরকে এই ওসিয়ত গুলোর ওপর আমল করার তাওফীক দান করুন আমিন ৷

লেখক: মুফতী  মুহাম্মাদ মাসউদুর রহমান ওবাইদী

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here