আমার জীবন গড়ার পথে আমার স্ত্রীর অবদান ৯০ ভাগ: ড. মুশতাক আহমদ

28

ড. মাওলানা মুশতাক আহমদ। দেশসেরা ইসলামী স্কলারদের অন্যতম। ইসলামিক ফাউণ্ডেশন এর উপ-পরিচালক। রাজধানীর তেজগাঁওসহ বেশ কয়েকটি মাদরাসার শায়খুল হাদিস। অসংখ্য মাদরাসার মুতাওয়াল্লী। সম্প্রতি গত ২৫ আগস্ট-২০২০ তারিখে তাঁর প্রিয়তমা স্ত্রী ‘নাজমুন নাহার’ বিদায় নেন দুনিয়া হতে। তাঁর বিয়োগ যাতনা ও তাঁর সাথে জীবন সায়াহ্নে কাটানো সময়গুলো নিয়ে এক আবেঘঘন ভিডিও বার্তা ফেসবুকে পোস্ট করেছেন তিনি। তাঁর নিজের পেজে করা ভিডিও পোস্ট থেকে কথাগুলো পাঠকদের জন্য তুলে ধরছি আমরা।

‘তার সাথে আমার পরিচয় হলো, বিয়ে করলাম। তারপর এম এ পাশ করলাম। এমফিল করলাম। পিএইচডি করলাম। চাকরি করলাম। হজ করলাম। মুহাদ্দিস হলাম। শায়খুল হাদিস হলাম। বড় আলেম হলাম। সারাদেশে ওয়াজ কালাম করি। পীর-মুরীদি করি। মাদরাসায় পড়লাম। কাচকুড়া মাদরাসায়। পাইটি মাদরাসা। সবগুলোর পেছনে তার যে কী ছায়া? আমি কিছুই করতে পারতাম না। আমার এ সকল সফলতার পেছনে নব্বই ভাগ ছায়া ছিলো আমার স্ত্রী নাজমুন নাহার এর। ঘর কিভাবেন চলবে? বাজার কিভাবে হবে? ছেলে-মেয়েদের কিভাবে কী লেখাপড়া? তাদের চিকিৎসা খাবার-দাবার। নিন্দ্রা-জাগ্রত হওয়া আমি তো কিছুই খবর রাখতাম না কখনো।

যে লোকটি বিন্দুবিন্দু সব খবর রাখতেন। আমার এ সংসার যে গুছিয়ে দিলো। আমার এ জীবনকে যে সাজিয়ে দিলো। সে মানুষটি আমার থেকে বিদায় নিয়ে গেলেন গত পঁচিশ আগস্ট। তাঁর বিদায়ে আমি বড় বেদনাক্লিষ্ট। বেদনাক্লান্ত। আমার চোখে শুধু অন্ধকার। সব পাখি ঘরে আসে। ফুরায় এ জীবনের সব লেনদেন। থাকে শুধু অন্ধকার। মুখোমুখি বসিবার।

আমার স্ত্রী বড় ভালো মানুষ। তাহাজ্জুদগুজার। তেলাওয়াতওয়ালা। তাসবিহওয়ালা। জিকিরওয়ালা। নামাজ রোজার পাবন্দশীল। দানশীল ও পরোপকারকারীনি। আত্মীয়-স্বজনের জন্য দূর দূর পর্যন্ত খবর নিতো। আত্মীয়-স্বজনের কার কী চিকিৎসা লাগবে? টাকা-পয়সা, জামাকাপড় লাগবে সব খবর নিতো। সবকিছু নিজের দায়িত্বে রাখতো।

একত্রিশ বছর আমার সাথে সংসার করেছে। কখনো তাঁকে কোনো গুনাহের চিন্তা করতে দেখিনি। রাত্রটা মুসাল্লায় কাটাতো। শেষ বেলায়ও (বিদায়বেলা) হাতের মাঝে ছিলো তাসবিহ। জবানে জিকরুল্লাহ। শেষ কথাটা আমার সন্তানকে বলে গেলো। ‘তোমার আব্বুকে সময় মতো ঔষধ খাওয়াইয়ো।’

সে আত্মভোলা মানুষ। আমি তাঁকে ভুলতে পারিনা । কত দোয়া করেছি তাঁর জন্য। দুই মাস আগে থেকেই তাঁর জন্য দোয়া করতাম। নামাজের মধ্যে। রুকুর মধ্যে। সেজদার মধ্যে। শেষ রাতে। তাহাজ্জুদের সময়। জিকরুল্লার ক্ষেত্রে। মুরাকাবার হালতে। সব সময় দোয়া করতাম। তাঁর বড় সেক্রিফাইস ছিলো আমার প্রতি। তাঁর সেক্রিফাইসের কারণে আমার কাঁচকুড়া মাদরাসা প্রতিষ্ঠিত হয়। আমার পাইটিতে জমি কেনা হয়। যা খানকার জন্য প্রতিষ্ঠিত হয়। আল্লাহ তাঁকে জান্নাত নসীব করেন।

তাঁকে হারিয়ে আমি বড় বেদনাগ্রস্থ। আমার সবকিছু যেনো অন্ধকার হয়ে আসছে। ভেতরে একরাশ আফসোস। এই ভালো মানুষটি আমি হারিয়ে ফেললাম। তাঁকে আমি খেদমাত করতে পারিনি। বিবেকের বড় দংশনবোধ করি। সে চলে গেলো। আমি যেনো পাগল হয়ে গেলাম। ভেতর থেকে শুধু ঢুকরে ঢুকরে কান্না আসে। আর এ কান্নাগুলো অধৈর্য নয়। এগুলোকে দোয়ার শেকলে চোখের পানির মাধ্যমে আল্লাহপাকের দরবারে পাঠিয়ে দিচ্ছি। হে আল্লাহ! আমার নাজমুন নাহারকে তুমি আর কষ্ট দিওনা । তাঁকে তুমি জান্নাতুল ফেরদাউসের জন্য কবুল করে নাও।

হাদিসে পাকে এসেছে, যদি কোনো নারী ইন্তেকাল করে আর তাঁর স্বামী তাঁর উপর সন্তুষ্ট থাকে। তাহলে আল্লাহ তাঁকে জান্নাতের জন্য কবুল করে নেন। আমি বারবার ফরিয়াদ করি মাবুদ, তাঁর উপর আমার কোনো অভিযোগ নেই। আমি শতভাগ তাঁর উপর সন্তুষ্ট। আমি তাঁকে দেখেছি। সে অত্যান্ত পরহেজগার। অত্যান্ত ভালো মানুষ। আমার চেয়ে ঘনিষ্ট কেউ তাঁকে দেখেনি। মাবুদ তাঁকে জান্নাতের জন্য কবুল করো। আমিন।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here